‘কৃষক খুঁজে পাওয়াই কঠিন হবে’: শ্রীলঙ্কায় সার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার

বিদেশ ডেস্ক
২০ এপ্রিল ২০২২, ১৯:৫৮আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২২, ১৯:৫৮

শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ জনপদ রাজাঙ্গানায়া দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় সবুজ ধান ও আম গাছ আগাম ফসলের ভারে নুয়ে পড়তে দেখা যাবে। এই দৃশ্য দেখে স্থানীয় সম্প্রদায় সংকটে রয়েছে বলে ধারণা করা মুশকিল। অথচ ১৯৬০ এর দশকের পর এখান জমিতে যেসব কৃষক ধান ও কলা চাষ করে আসছিলেন গত কয়েকটি বছর ছিল তাদের জীবনের কঠিনতম।

৩৪ বছর বয়সী ধান চাষি নিলুকা দিলরুকশি বলেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে শ্রীলঙ্কায় কোনও কৃষক খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে।’

১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে শ্রীলঙ্কা। রেকর্ড মাত্রায় কমে এসেছে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ। অনেকেই মনে করেন সরকারের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার ফল এই পরিস্থিতি। গত কয়েক সপ্তাহে বিপর্যয়কর মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধ ঘাটতির কারণে ভুক্তভোগী হননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না।

শ্রীলঙ্কার কৃষকদের জন্য এই সমস্যার শুরু হয়েছিল গত বছর এপ্রিল মাসে। ওই সময় হুট করে রাসায়নিক সার ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসা। এখন দেশটির অর্থনীতিকে খাদের কিনারায় নেওয়ার জন্য তাকেই দায়ী করা হচ্ছে।

সার নিষেধাজ্ঞার প্রকৃত প্রভাব মাত্র টের পেতে শুরু করেছে শ্রীলঙ্কা। যদিও এখন তা বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু এর প্রভাবে শ্রীলঙ্কার কৃষকদের জীবিক হুমকিতে পড়ে। দেশটির আধুনিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো খাদ্য সংকটে পড়তে পারে। সাধারণত দেশটির কৃষকরা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ধান ও সবজি চাষ করেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার খাদ্য আমদানিতে অত্যাধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু ফসল উৎপাদন কমে যাওয়া এবং সরকার খাদ্য আমদানি করতে ব্যর্থ হওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে।  

২০২১-২২ অর্থবছরে চালের ফলন কমে এসেছে ২.৯২ মেট্রিক টনে। আগের বছর যা ছিল ৩.৩৯ মেট্রিক টন। গত সপ্তাহে পার্লামেন্টের স্পিকার সতর্ক করে বলেছেন, দ্বীপের ২২ মিলিয়ন মানুষ অনাহারের ঝুঁকিতে রয়েছে।

দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশের সাবেক গভর্নর রাজিত কীর্তি তেনাকুন বলেন, আমাদের জমি ধান ও কলাগাছে পূর্ণ থাকে। কিন্তু এই সার নিষেধাজ্ঞার কারণে এখন নিজেদের ক্ষুধা মেটানোর খবর খাবার নেই আমাদের। অতীতেও আমাদের অর্থনৈতিক সংকট ছিল, নিরাপত্তা সংকট ছিল। কিন্তু শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে কখনও খাদ্য সংকট ছিল না।

রাসায়নিক সার ব্যবহারের উদ্বেগের কারণে অর্গানিক চাষে গুরুত্বারোপ সাধুবাদ পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হুট করে এবং অস্পষ্টভাবে এই নিষেধাজ্ঞা কোনও সতর্কতা ও প্রশিক্ষণ ছাড়া রাতারাতি জারি করা হয়েছে। এর ফলে এই সিদ্ধান্তের পেছনে অন্য কোনও উদ্দেশ্য রয়েছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি অর্গানিক চাষের পক্ষে ওকালতি করা মানুষেরাও এমন সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়েছেন।

এই নিষেধাজ্ঞা জারির আগে ক্ষমতা থাকা সরকারগুলো দেশটির কৃষকদের রাসায়নিক সার ব্যবহার ও এতে অতি নির্ভরশীল হতে উৎসাহ দিয়েছে। এজন্য দেওয়া হয়েছে ভর্তুকি। যার আওতায় হাজার হাজার কেজি সার পেয়েছেন কৃষকরা। অল্প কয়েকজন কৃষক ছাড়া সফলভাবে অর্গানিক চাষের ধারণাই নেই অনেকের। একসঙ্গে অর্গানিক চাষে অস্বীকৃতিও জানিয়েছেন কৃষকরা। কিছু কৃষক মনে করেন, এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে মূল্যবান বিদেশি ডলার সঞ্চয়। অন্যরা মনে করেন চাষীদের জীবনে সরকারের ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপ বৃদ্ধির ষড়যন্ত্রের অংশ।

রাজঙ্গানায়ার অর্গানিক চাষি বিমুক্তি ডি সিলভা বলেন, কোনও উপযুক্ত পরিকল্পনা ছিল না, ছিল না প্রশিক্ষণ বা শিক্ষা। তাই কৃষকরা নিশ্চিত এই সিদ্ধান্তের পেছনে অন্য কোনও কারণ রয়েছে। এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে সরকার কৃষি জমির বাণিজ্যিকীকরণে ব্যর্থ হয়েছে। দেশের বাণিজ্যিক সম্পদের সবচেয়ে বড় হলো চাষের জমি। ফলে আমাদের অনেকেই মনে করেন কৃষকদের জমি দখল ও তাদের তাড়িয়ে দেওয়া কিংবা অবস্থান দুর্বল করার জন্য সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

রাজাঙ্গানায়াতে বেশিরভাগ কৃষক ক্ষুদ্র জমিতে চাষ করেন। বেশিরভাগ কৃষক জানিয়েছেন তাদের শস্য উৎপাদন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে গেছে। গত সপ্তাহে তিন শতাধিক কৃষক রাজাপাকসার পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন।

ডি সিলভা বলেন, নিষেধাজ্ঞার আগে এটি ছিল দেশের বৃহত্তম বাজার। টন টন চাল ও সবজি উৎপাদন হত। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার পর তা শূন্যে নেমে এসেছে। রাইস মিলে কোনও মজুত নেই কারণ মানুষ উৎপাদন করেনি। চরম নিম্ন মাত্রায় নেমে এসেছে পুরো সম্প্রদায়ের মানুষের আয়।

৫৫ বছর বয়সী এইচপি সারাহ ধর্মসিরি এক হেক্টরের বেশি জমিতে কালো ছোলা ও ধান চাষ করে আসছেন। যা তার পরিবারের খাবার মিটিয়ে বাজারেও বিক্রি করতে পারতেন। কিন্তু রাসায়নিক সার ছাড়া তার ধান উৎপাদন এতটাই কমে গেছে যে, বিক্রি করার মতো কিছু থাকে না। এছাড়া ছোলা চাষের কীটনাশকের দামও বেড়েছে। ফলে এজন্য তাকে ঋণ করতে হচ্ছে। গত মৌসুমে তিনি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এখন দিনমজুর হিসেবে কাজ করছেন।

ধর্মসিরি বলেন, কৃষক হিসেবে চালিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে আর সম্ভব বলে মনে হয় না। বাগানে কিছু ফল ও সবজি রয়েছে। ফলে আপাতত হয়ত আমরা টিকে থাকব। কিন্তু ভবিষ্যতে কোনও একসময় আমাদের অভুক্ত থাকতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসা এই সপ্তাহে সার ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও সারে ভর্তুকি পুনরায় চালুর ঘোষণা দিয়েছেন। এই সিদ্ধান্ত নিয়েও অনেকে সন্দিহান। কেউ কেউ বলছেন, সার কেনার মতো বিদেশি মুদ্রা সরকারের নেই। তারা হয়ত ভাবছে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে কৃষকদের বোকা বানানো যাবে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

/এএ/
সম্পর্কিত
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
তৃণমূলের বিদ্রোহী নেতা কে এই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়
সর্বশেষ খবর
অধিনায়ক হিসেবে ফিরেই জয় দেখলেন কুশল মেন্ডিস
অধিনায়ক হিসেবে ফিরেই জয় দেখলেন কুশল মেন্ডিস
মার্কিন সেনা হত্যা করলে যুদ্ধবিরতি শেষ, উপদেষ্টাদের জানালেন ট্রাম্প
মার্কিন সেনা হত্যা করলে যুদ্ধবিরতি শেষ, উপদেষ্টাদের জানালেন ট্রাম্প
ময়মনসিংহ মেডিক্যালে হাম উপসর্গে আরও এক শিশুর মৃত্যু 
ময়মনসিংহ মেডিক্যালে হাম উপসর্গে আরও এক শিশুর মৃত্যু 
বিক্রির জন্য নিলামে উঠছে এই আধুনিক দুর্গটি
বিক্রির জন্য নিলামে উঠছে এই আধুনিক দুর্গটি
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম