কাবুলের হাসপাতালে পাকিস্তানের হামলা

ঈদের দিনেও নিখোঁজ প্রিয়জনদের খুঁজছে আফগানরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২১ মার্চ ২০২৬, ১৮:০৫আপডেট : ২১ মার্চ ২০২৬, ১৮:০৯

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের বাসিন্দা শোহরাব ফাকিরি। ঈদের দিন নিজের ভাইয়ের কবর খুঁজতে কাটিয়েছেন এ যুবক। চলতি সপ্তাহে কাবুলের হাসপাতালে পাকিস্তানের বিমান হামলায় প্রাণ হারান শোহরাবের ভাই।

প্রতিবেশী আফগানিস্তানের সন্ত্রাসী ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে বলে দাবি করেছে পাকিস্তান। হাসপাতালে বোমাবর্ষণটি ভয়াবহভাবে ভুল পথে গেছে বলে মনে হচ্ছে। গত সোমবার রাতে মাদকাসক্তদের একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে এ হামলা চালায় পাকিস্তান। জাতিসংঘের প্রাথমিক হিসাবে নিহতের সংখ্যা ১৪৩ জন। আর তালেবান প্রশাসনের মতে, মৃতের সংখ্যা ৪০০ এরও বেশি।

শোহরাবের ভাই কায়েস একজন দর্জি। তার ১০ বছরের একটি ছেলেও রয়েছে। সবশেষ তিন মাস ধরে পুনর্বাসনটিতে ভর্তি ছিলেন কায়েস। পরিবারের আশা ছিল, পুনর্বাসনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন কায়েস। পুনর্বাসন কেন্দ্রতে  বিমান হামলার পরেই সেখানে ছুটে যান শোহরাব। তবে, নিজের ভাইকে এখনও খুঁজে পাননি তিনি। টানা দু’দিন কাবুলের বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়েছেন শোহরাব। কিন্তু, কায়েসের কোনও চিহ্ন তিনি পাননি।

হামলায় অজ্ঞাত নিহতদের গণকবর দেয় আফগান কর্তৃপক্ষ। সে সময়ের একটি ভিডিও দেখতে পান শোহরাব, যেখানে তিনি ভাই কায়েসকে চিহ্নিত করতে পারেন তিনি।

79

গতকাল বৃহস্পতিবার আফগানিস্তানে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়। ঈদের নামাজ শেষেই কাবুলের প্রান্তে একটি পাহাড়ি কবরস্থানে যান শোহরাব। ওই কবরস্থানেই অজ্ঞাতদের দাফন করা হয়েছিল। সেখানে তিনি উল্টে রাখা মাটির সারির পাশে সারিবদ্ধভাবে বসানো পাথরের সারি দেখতে পান। কিন্তু কোনও মরদেহ শনাক্ত করার জন্য সেখানে কোনও নাম লেখা ছিল না।

কবরস্থানে দাঁড়িয়ে ফাকিরি কান্নায় ভেঙে পড়েন শোহরাব। বলেন, “সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, আমরা তার কবরের অবস্থান জানি না। ঈদের দিনে একজন মানুষের জন্য তার ভাইয়ের দেহ খুঁজে বেড়ানোই সবচেয়ে দুঃখজনক মুহূর্ত।” ভাইয়ের মৃত্যুর বিষয়টি এখনও মাকে সাহস পাননি এ আফগানি।

পাকিস্তানের বিমান হামলাটি ঘটেছিল ঠিক তখনই, যখন রোগীরা তারাবীহ নামাজ শেষ করে তাদের ডরমিটরিতে ফিরে যাচ্ছিলেন।

80

হামলার সময় পুনর্বাসন কেন্দ্রে ছিলেন ২৩ বছর বয়সী ওয়ালি নাজির মোহাম্মদ। সৌভাগ্যবশত তিনি বেঁচে যান। নামাজের পর ক্লান্ত হয়ে একটি ছোট ভবনের নিজের কক্ষে যান তিনি। ওই কক্ষে প্রায় ২০ জন রোগী থাকতেন। বিস্ফোরণের শব্দে তার ঘুম ভাঙলে তিনি দেখেন, ঘরটি এবং তার কিছু সহরোগী আগুনে পুড়ে যাচ্ছে। কক্ষে অনেকেই তখন মৃত ছিলেন, আর অন্যরা সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিলেন। ওই সময় কোমর ও পায়ে তীব্র ব্যথা অনুভব করেন নাজির।

তিনি বলেন, “আমাদের ভবনটি সরাসরি আঘাতপ্রাপ্ত হয়নি। তবে, দেয়াল ভেদ করে আসা শার্পনেল আমার শরীরে ঢুকে যায়। প্রায় আধা ঘণ্টা পরে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে ওয়াজির আকবর খান হাসপাতালে নেওয়া হয় আমাকে।”

হাসপাতালের বিছানায় চিকিৎসাধীন নাজির বলেন, “সরকারের কাছে আমার একটাই বার্তা, দয়া করে প্রতিশোধ নিন। যদি সরকার প্রতিশোধ নিতে না পারে, তাহলে আমি তাদের কাছে আমাদের অস্ত্র দেওয়ার অনুরোধ করছি।”

আফগানিস্তান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির জুমা খান নায়েল বলেন, “অনেক রোগী তাদের চিকিৎসা শেষ করেছিলেন। পরের দিন তাদের ছাড়পত্র পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, এর আগেই পাকিস্তান হামলা চালাল।” বোমা হামলায় সৃষ্ট আগুন মাইলের পর মাইল দূর থেকেও দেখা যাচ্ছিলও বলে জানান তিনি। বলেন, “ওই আগুন ছিল অকল্পনীয়, সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল না। এর জন্য আটকে পড়া মানুষদের কেউই সাহায্য করতে পারেনি।”

হামলার পরদিন সকালে ঘটনাস্থলে পৌঁছান নায়েল। ওই সময় উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ গর্ত করছিলেন। ওই সময় তারা হাত, পা, রক্তসহ মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পান তারা। তবে, গোটা একটি দেহ খুঁজে পাননি উদ্ধারকারীরা। গোটা এলাকার বাতাসে পোড়া মাংস ও রক্তের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।  

নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের একটি সহায়তা সংস্থার সদস্য মাইসাম শাফিয়েই বলেন, “আমি পরের দিন যখন সেখানে যায় তখনও সেখান থেকে ধোঁয়া উঠছিল। পুনর্বাসন কেন্দ্রের একটি অংশে কিছু রোগী তখনও রয়ে গিয়েছিলেন।” শাফিয়েই’র বিশ্বাস, অনেক ভুক্তভোগী একটি বড় ভবনের ভেতরে একসঙ্গে ছিলেন। তিনি বলেন, “একটি বড় ভবনে আঘাত হানা হয়েছিল। এখন সেখানে কিছুই নেই। ছাদ ধসে পড়েছিল। সবকিছুই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।”

আফগান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পাকিস্তানের এ হামলায় ৪০৮ জন নিহত এবং ২৬৫ জন আহত হয়েছে। আর ইসলামাবাদের দাবি, তারা একটি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং বলেছে, পাকিস্তানে হামলা চালানো সন্ত্রাসীদের তালেবান আশ্রয় দিচ্ছে।

জাতিসংঘের আফগানিস্তান মিশনের উপপ্রধান জর্জেট গ্যাগননের ধারণা, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তিনি বলেন, “কয়েক শত মানুষ নিহত ও আহত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।” জর্জেট বলেন, “মাদক চিকিৎসা কেন্দ্রটি আফগান ডি ফ্যাক্টো প্রশাসনের পরিচালিত একটি স্থাপনার ভেতরে ছিল। ২০১৫ সালের আগে এ স্থানটি একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ছিল।”

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

/এবিএম/
সম্পর্কিত
আদ দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ নাকি ত্রুটি সংশোধন, কী ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার
দুই দল গ্রামবাসীর সংঘর্ষে ৬২ জন আহত
বহু কাজ এখনও বাকি, কীভাবে চালু হবে শিশু হাসপাতাল
সর্বশেষ খবর
প্রতিনিধি পরিষদের ইরান যুদ্ধ-বিরোধী ভোটের প্রতিক্রিয়ায় মুখ খুললেন ট্রাম্প
প্রতিনিধি পরিষদের ইরান যুদ্ধ-বিরোধী ভোটের প্রতিক্রিয়ায় মুখ খুললেন ট্রাম্প
জনগণের আস্থা অর্জনে কাজ করছে জাতীয় সংসদ: স্পিকার
জনগণের আস্থা অর্জনে কাজ করছে জাতীয় সংসদ: স্পিকার
এই অর্জন বাংলাদেশের শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরে: খলিলুর রহমান  
এই অর্জন বাংলাদেশের শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরে: খলিলুর রহমান  
‘মুখ খোলো মমতা, জানতে চায় জনতা’ স্লোগানে ইনকিলাব মঞ্চের মশাল মিছিল
‘মুখ খোলো মমতা, জানতে চায় জনতা’ স্লোগানে ইনকিলাব মঞ্চের মশাল মিছিল
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী