ছাত্রদের আন্দোলনে টিকলো না মোদির অজেয় ভাবমূর্তি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৬ জুলাই ২০২৬, ১৬:২৩ আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৬, ১৬:২৩

মে মাসে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ার জেরে তরুণদের জোরদার আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেছেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। এই পদত্যাগের পর দিল্লির রাজপথে উদযাপনে ফেটে পড়েন আন্দোলনকারীরা। কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শিক্ষামন্ত্রীর এই বিদায় কেবল একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ নয়, বরং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা ‘অজেয়’ ও ‘আপসহীন’ ভাবমূর্তিতে এক বিরল ও চরম আঘাত।

তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে প্রধানমন্ত্রী নিজের সিদ্ধান্ত ও নিয়ন্ত্রণের ওপর ভিত্তি করে দৃঢ় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং যার রাজনৈতিক ব্র্যান্ডের মূল ভিত্তি ছিল যে, রাস্তার আন্দোলন দিয়ে তাকে নড়ানো যায় না; সেই মোদি সরকারের এই নতিস্বীকারকে বিশ্লেষকরা এক বিরল ও অপমানজনক পরাজয় হিসেবেই দেখছেন।

ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে মোদির দল বিজেপিকে কটাক্ষ করে শনিবার বলেন, আমরা সবাই মিলে এটা সম্ভব করেছি। এই লোকগুলো আগে কী বলত? বলত যে এই সরকারের অধীনে কোনও পদত্যাগ হয় না। তারা কী বলেছিল? এই সরকারের আমলে পদত্যাগ হয় না।

গত সপ্তাহে দিল্লির যন্তর মন্তরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী যখন অবস্থান নিয়েছিলেন, পার্লামেন্ট অভিমুখে পদযাত্রার সময় পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করেছিল এবং চারদিকে ‘মোদি হটাও’ স্লোগান উঠছিল, তখনও কয়েক দশকের মধ্যে ভারতের ‘সবচেয়ে শক্তিশালী’ প্রধানমন্ত্রী নীরব ভূমিকা পালন করেছিলেন।

ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ অভিযোগ করে বলেন, দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে গত ২৩ জুলাই রাতে মোদি একটি ভিডিও বার্তা দিলেও তিনি সেখানে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বা তাদের ওপর পুলিশের নির্মম নির্যাতনের বিষয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক আদিত্য মেননের মতে, আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ও ক্ষোভ ইতোমধ্যে ধর্মেন্দ্র প্রধান থেকে সরে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী মোদির দিকে ঘুরে গিয়েছিল। সরকার সাধারণত কখনোই নিজেদের দোষ স্বীকার না করার নীতি মেনে চলে, ফলে প্রধানকে পদচ্যুত করা তাদের সেই অবস্থান থেকে বড় ধরনের বিচ্যুতি।

এর আগে ২০২০ সালে দীর্ঘ ১৮ মাসের কৃষক আন্দোলনের পর কৃষি আইন প্রত্যাহার করে ইউ-টার্ন নিতে বাধ্য হয়েছিল মোদি সরকার। তবে এবার সরকার বেশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে, যা রাজনৈতিকভাবে আরও গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী মোদির নীরবতা নিজেই একটি কৌশল ছিল, যা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট উল্লেখ করেছে, মোদি সরকার আন্দোলনের বিষয়টি স্বীকার করতেই অস্বীকার করেছিল। তাদের হিসাব ছিল, রাস্তার আন্দোলন সরকারকে পরিচালনা করার সুযোগ দেওয়া যাবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি ‘প্রধানমন্ত্রী মোদির ভাবমূর্তিতে বড় ফাটল’ তৈরি করেছে।

এমনকি বিজেপির আদর্শিক সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) ঘনিষ্ঠ রতন সারদা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ নিজের দলের মিডিয়া ও যোগাযোগ টিমের প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন। আন্দোলনকারীদের গড়ে তোলা বয়ান মোকাবিলা করতে না পারাকে তিনি তাদের ‘চরম ব্যর্থতা’ এবং ‘সম্পূর্ণ অক্ষমতা’ বলে অভিহিত করেন।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দীর্ঘ ১২ বছর ১ মাস ২৪ দিন আগে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর এই প্রথম দিল্লির রাজপথে, ক্যামেরা ও সাক্ষীদের সামনে মানুষ কোনও ভয় ছাড়া পূর্ণ শক্তিতে ‘মোদির পদত্যাগ চাই’ স্লোগান তুলেছেন।

সংবাদমাধ্যমটির মতে, ভয়ের রাজনৈতিক সমীকরণ এখন উল্টে গেছে। ভয় এখন আর আন্দোলনকারীদের মনে নেই, বরং সরকার নিজেই আন্দোলনকারীদের ভয় পেতে শুরু করেছে।

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন। তিনি গত সপ্তাহে মোদির বাসভবন অভিমুখে পদযাত্রার সময় সাময়িকভাবে আটক হয়েছিলেন। রাহুল বলেন, যারা শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার নির্দেশ দিয়েছিল, তাদের জবাবদিহি করতে হবে এবং মোদিকে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চাইতে হবে।

এখনও মোদির পক্ষ থেকে কোনও ক্ষমা চাওয়া হয়নি। মন্ত্রী পদত্যাগ করে চলে গেছেন, কিন্তু ভারতের রাজনৈতিক আবহে এমন এক পরিবর্তন এসে গেছে, যা সহজে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। যে প্রজন্মটি মোদি কখনও নতিস্বীকার করেন না শুনে বড় হয়েছে, তারা এখন নিজের চোখে মোদিকে নতিস্বীকার করতে দেখলো।

/এএ/
সম্পর্কিত
মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরানে তীব্র হামলার হুঁশিয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির কাতারি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলো ইরান
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
সর্বশেষ খবর
বিশ্ববাজারে পণ্যের দামে বড় ধাক্কার আশঙ্কা, সতর্ক করলো বিশ্বব্যাংক
বিশ্ববাজারে পণ্যের দামে বড় ধাক্কার আশঙ্কা, সতর্ক করলো বিশ্বব্যাংক
গাজার শিশুদের জন্য এক লাখ পাউন্ডের বেশি সংগ্রহ হামজার
গাজার শিশুদের জন্য এক লাখ পাউন্ডের বেশি সংগ্রহ হামজার
মর্গে মরদেহের সঙ্গে ‘বিকৃত যৌনাচার’ নিয়ে প্রতিবেদন, সাংবাদিককে হুমকির অভিযোগ
মর্গে মরদেহের সঙ্গে ‘বিকৃত যৌনাচার’ নিয়ে প্রতিবেদন, সাংবাদিককে হুমকির অভিযোগ
ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাচনের আগের দিন ৯ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা প্রত্যাহার
ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাচনের আগের দিন ৯ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা প্রত্যাহার
সর্বাধিক পঠিত
নভেম্বর থেকে কর্মী যাবে মালয়েশিয়ায়, খরচ জানালেন প্রতিমন্ত্রী
নভেম্বর থেকে কর্মী যাবে মালয়েশিয়ায়, খরচ জানালেন প্রতিমন্ত্রী
আমজনতার তারেককে সফরসঙ্গী করায় সমালোচনা নিয়ে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী
আমজনতার তারেককে সফরসঙ্গী করায় সমালোচনা নিয়ে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী
ইউরোপের ট্রেনের সঙ্গে বন্দে ভারতের তুলনা করে যা জানালেন পোল্যান্ডের পর্যটক
ইউরোপের ট্রেনের সঙ্গে বন্দে ভারতের তুলনা করে যা জানালেন পোল্যান্ডের পর্যটক
পরিবার নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন সেই এমপি, আপত্তিকর ভিডিও নিয়ে যা বললেন
পরিবার নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন সেই এমপি, আপত্তিকর ভিডিও নিয়ে যা বললেন
ইসরায়েলের নির্বাচন: কোন দল কত আসন পেলো
ইসরায়েলের নির্বাচন: কোন দল কত আসন পেলো