পৃথিবীর কেন্দ্র এখনও ওপরের স্তরে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম ও টাংস্টেন বের হতে পারে, এমন নতুন প্রমাণ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এতে দীর্ঘদিনের সেই ধারণা প্রশ্নের মুখে পড়েছে, যে গ্রহটির গভীরতম অংশ সৃষ্টির পর থেকে মূলত বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অব চায়নার গবেষকদের এ গবেষণা সায়েন্স অ্যাডভান্সেস সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পৃথিবীর ৪৫০ কোটি বছরের ইতিহাসজুড়ে কোর ও ম্যান্টলের মধ্যে উপাদানগুলো চলাচল করছে।
প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে পৃথিবী যখন সৃষ্টি হয়, তখন এটি ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত ও মূলত গলিত একটি গ্রহ। ঠান্ডা হওয়ার সময় ভারী উপাদান নিচে ডুবে কোর তৈরি করে, আর হালকা উপাদান গড়ে তোলে ম্যান্টল ও ভূত্বক। পৃথিবীর গঠনের শুরুর দিকের কিছু উপাদান গ্রহটির গভীরে আটকা পড়ে। তবে সর্বশেষ গবেষণা বলছে, এসব প্রাচীন উপাদানের চিহ্ন এখনও ভূপৃষ্ঠের দিকে সরে আসতে পারে।
এ প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখতে গবেষকেরা মেশিন লার্নিংয়ের সহায়তায় উন্নত কম্পিউটার সিমুলেশন ব্যবহার করেন। পৃথিবীর ভেতরের চরম পরিস্থিতিতে হাইড্রোজেন কীভাবে আচরণ করে, তা তারা বিশ্লেষণ করেন। কোর ও ম্যান্টলের মধ্যে উপাদানটি কীভাবে চলাচল করে, তা বুঝতে তারা হাইড্রোজেনের আইসোটোপ, বিশেষ করে সাধারণ হাইড্রোজেন ও হাইড্রোজেনের ভারী রূপ ডিউটেরিয়ামের অনুপাত পরীক্ষা করেন।
গবেষকেরা বলেন, সব মিলিয়ে এসব ফল ইঙ্গিত দেয়, চাপ, তাপমাত্রা ও মডেলগত অনুমানে বড় ধরনের তারতম্য থাকলেও ম্যাগমা মহাসাগর কেলাসিত হয়ে এমন এক আদিম ম্যান্টল তৈরি করে, যার হাইড্রোজেন আইসোটোপ গঠন মূলত সমজাতীয়।
তাদের ফলাফল অনুযায়ী, পৃথিবীর গভীর অভ্যন্তরে পাওয়া আইসোটোপের নমুনাকে শুধু গ্রহটির শুরুর দিকের অবশিষ্টাংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। বরং কোর ও ম্যান্টলের মধ্যে উপাদানের ক্রমাগত আদান-প্রদানে এসব নমুনা বদলে যেতে পারে।
আগ্নেয় শিলা থেকে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র মেলে। পৃথিবীর গভীর থেকে উত্তপ্ত পদার্থ ওপরে উঠে এলে মহাসাগরীয় দ্বীপের ব্যাসল্ট তৈরি হয়, যেগুলোতে অস্বাভাবিক রাসায়নিক ও আইসোটোপিক বৈশিষ্ট্য থাকে। আইসল্যান্ড এবং কানাডার বাফিন দ্বীপসহ বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের শিলা পাওয়া যায়।
এসব আগ্নেয় শিলার কিছু কিছুতে হাইড্রোজেনের তুলনায় ডিউটেরিয়ামের অনুপাত অস্বাভাবিক কম, যা পৃথিবীর আদিকালের হাইড্রোজেনের উপস্থিতির ইঙ্গিত দিতে পারে। গবেষকদের ধারণা, কোর থেকে বেরিয়ে আসা হাইড্রোজেন এ নমুনা ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করতে পারে।
হিলিয়াম আরেকটি সূত্র দেয়। হিলিয়াম-৩ হলো সৌরজগৎ যে উপাদান থেকে তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি আদিম আইসোটোপ, আর হিলিয়াম-৪ তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের মাধ্যমে ক্রমাগত তৈরি হয়। আগ্নেয় শিলায় এ দুই আইসোটোপের অস্বাভাবিক অনুপাত ইঙ্গিত দিতে পারে, পৃথিবীর গভীর থেকে প্রাচীন হিলিয়ামও ম্যান্টলে পৌঁছাচ্ছে।
টাংস্টেনও উপাদানের সম্ভাব্য আদান-প্রদানের আরও প্রমাণ দেয়। পৃথিবীর গঠনের শুরুতে এই ভারী ধাতুর বড় অংশ কোরে জমা হয়েছিল। আগ্নেয় শিলায় পাওয়া কিছু টাংস্টেন আইসোটোপের বৈশিষ্ট্য কোর থেকে ভূপৃষ্ঠের দিকে উপাদানের চলাচল শনাক্ত করতে বিজ্ঞানীদের সহায়তা করতে পারে।
সব মিলিয়ে এসব ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, পৃথিবীর অভ্যন্তর আগের ধারণার চেয়ে বেশি গতিশীল। কোর ও ম্যান্টল আলাদা থাকার বদলে শত শত কোটি বছর ধরে রাসায়নিক উপাদানের আদান-প্রদান চালিয়ে যেতে পারে।
গবেষকেরা বলেন, ম্যান্টলের গভীরে সংরক্ষিত রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য শুধু পৃথিবীর একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের অবশিষ্টাংশ, এই ধারণাকে তাদের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করছে। বরং এগুলো এমন এক চলমান প্রক্রিয়ার প্রতিফলন হতে পারে, যা গ্রহটির বিবর্তনজুড়ে একে রূপ দিয়েছে। কোর থেকে কতটুকু উপাদান বেরিয়ে আসে এবং এ প্রক্রিয়া পৃথিবীর দীর্ঘমেয়াদি বিবর্তনে কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা নির্ণয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
সূত্র: এনডিটিভি
শরীর থেকেই এবার যেভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধ্বংস হবে চর্বির কোষ
শত বছর আগে চুরি হওয়া বিরল গোলাপি হীরা ফিরছে জনসমক্ষে