সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অর্থায়নের ঘাটতির প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থীরা। তারা দেশটির বহু হাইস্কুলের প্রবেশপথ অবরোধ করে রেখেছেন। কিছু জায়গায় আন্দোলন সহিংস রূপ নিয়েছে। শত শত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। বহিরাগত অজ্ঞাত সংখ্যকসহ হাজার হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
বিক্ষোভকারীরা ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের স্কুল ‘লিসে’তে শিক্ষকস্বল্পতা ও জরাজীর্ণ অবকাঠামো নিয়ে অভিযোগ করছেন। মঙ্গলবার সারা ফ্রান্সে কয়েক লাখ মানুষ বিক্ষোভে নামে। প্যারিসের শিক্ষার্থী মাদালেনা বলেন, কখনও কখনও আমাদের শিক্ষকরা কয়েক সপ্তাহ অনুপস্থিত থাকেন, কিন্তু তাদের জায়গায় কাউকে দেওয়া হয় না। সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহে তার স্কুলের শ্রেণিকক্ষে অনেক গরম ছিলো বলেও জানান তিনি।
আরও নানা অভিযোগ রয়েছে। কেউ কেউ মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করা এবং সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত স্কুল চলার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ। এক লিসেঁ শিক্ষার্থী বলেন, বাসায় ফিরতে সন্ধ্যা ৭টা বেজে যায়, ঘুমানো বা পড়াশোনার সময় থাকে না।
উচ্চশিক্ষায় আসন বণ্টনের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পার্কুরসাপ নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে। এই ক্ষোভের শিকড় গভীর। প্রতিটি ব্যাচের প্রায় ৮০ শতাংশ এখন বাকালোরেয়া পাস করে, যা তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অধিকার দেয়, তবে পছন্দের বিষয়ে ভর্তির নিশ্চয়তা দেয় না। এতে আকর্ষণীয় কোর্সগুলোর জন্য হুড়োহুড়ি তৈরি হয় এবং অনেকের কাছে অস্বচ্ছ মনে হওয়া পার্কুরসাপ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে।
এসব অভিযোগ বাস্তব। কিন্তু শুধু এগুলো দিয়েই কি আন্দোলনের বর্তমান রূপ ব্যাখ্যা করা যায়? অন্য দেশের তুলনায় ফ্রান্সের অবস্থান কেমন?
উন্নত দেশগুলোর সংগঠন ওইসিডির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ফরাসি সরকার প্রতি লিসে শিক্ষার্থীর পেছনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড়ের চেয়ে বেশি ব্যয় করে। শিক্ষকস্বল্পতা তীব্র হলেও অন্য দেশের চেয়ে খারাপ নয়।
বিকেলের শেষ পর্যন্ত গড়ানো স্কুলদিবস ফরাসি শিক্ষার্থীদের জন্য সত্যিই সমস্যা। এর কারণ মূলত দীর্ঘ মধ্যাহ্নবিরতি ও জটিল সময়সূচি, ছুটির ঘাটতি পূরণ নয়; অন্য ইইউ দেশের তুলনায় সেখানে ছুটি বিশেষ দীর্ঘও নয়। দীর্ঘ স্কুলদিবস ফরাসি স্কুলজীবনের পুরোনো এক দুঃখজনক বাস্তবতা, যা বর্তমান বিস্ফোরণের ব্যাখ্যা হতে পারে না। অকার্যকর উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার চাপও তা পারে না। ইউরোপের বেশির ভাগ দেশে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ তরুণ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে এবং ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রতিযোগিতা অন্যত্রও চাপ তৈরি করে।
অর্থায়নের ঘাটতি, জরাজীর্ণ ভবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা শিক্ষার্থীদের অসন্তোষের পেছনে থাকলেও এসব অভিযোগ দিয়ে বোঝা যায় না, কেন আন্দোলনটি স্কুলের সংখ্যা, শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও সহিংসতার মাত্রায় নজিরবিহীন হয়ে উঠল। এ কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনিয়েজ।
আন্দোলনের পরিধি আরও উল্লেখযোগ্য, কারণ অংশগ্রহণকারীরা বড় ঝুঁকি নিচ্ছেন। হুমকি বা বলপ্রয়োগে স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয় অবরোধ করা অবৈধ। এতে পুলিশ আসে, আসে ভাঙচুরকারী ‘কাসুর’রাও। প্রায়ই কঠোর পুলিশি ভিড় নিয়ন্ত্রণ অভিযানে জড়িয়ে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ঁ লেকর্নু সর্বশেষ বার্তায় জোর দিয়ে বলেছেন, নিরাপত্তা বাহিনীকে হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের মোকাবিলা করার নির্দেশ দেওয়া হয়নি, শুধু আইন প্রয়োগ করতে বলা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের কৌশল বুঝতে হলে ব্যারিকেডে ঘেরা স্কুলের ফটকের বাইরে একটি রাজনৈতিক ঐতিহ্যের দিকে তাকাতে হবে। ফ্রান্সে ক্ষমতা প্রায়ই নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের মতোই রাজপথেও থেকেছে। শিক্ষার্থীরা এটি অন্য যেকোনও মানুষের মতোই জানে।
একাধিকবার শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সরকারি সংস্কার ব্যর্থ হয়েছে, যেমন ১৯৮৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কার এবং ১৯৯৪ সালে তরুণদের জন্য কম ন্যূনতম মজুরি। সম্ভবত শিক্ষার্থীদের ক্ষমতার সবচেয়ে চমকপ্রদ প্রদর্শনী দেখা গেছে ২০০৬ সালে। তরুণ বেকারত্ব মোকাবিলায় ২৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য নিয়োগ-ছাঁটাইয়ের নিয়ম শিথিল করতে আনা একটি আইন প্রত্যাহার করা হয়। পার্লামেন্টে পাস হওয়া এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জাক শিরাকের সই করা এ আইন কয়েক সপ্তাহের অবরোধের পর বাতিল হয়। অবরোধে প্রায়ই সহিংসতা ঘটেছিল।
বিএফএমটিভির জন্য করা এক জরিপে দেখা গেছে, ৭২ শতাংশ ফরাসি তাদের দাবিকে বৈধ মনে করেন এবং ৫৫ শতাংশ আন্দোলনকে সমর্থন করেন। অনেক শিক্ষক, শ্রমিক ইউনিয়ন ও বামপন্থী রাজনীতিকের সমর্থন নিয়ে বিক্ষোভকারীরা এখন এগিয়ে। বৃহস্পতিবার বিকেলে আরও একটি সমাবেশের পরিকল্পনা রয়েছে।
সূত্র: বিবিসি
পর্দার ‘মিনিস্টার ফাটাকেষ্ট’ এবার সরকারে পেলেন বড় পদ