প্রবেশ ও বের হওয়ার সংকীর্ণ পথ, মুষলধারে বৃষ্টি এবং ছুটির দিন হওয়ায় হঠাৎ জমে যাওয়া অতিরিক্ত ভিড়- এই তিনের মারাত্মক সংযোগেই শনিবার সন্ধ্যায় উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গা পূজা মণ্ডপে ঘটে গেল মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। মর্মান্তিক এই পদপিষ্টের ঘটনায় অন্তত ১৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
চোখের সামনে মাকে হারানোর স্মৃতি মনে করে এখনও স্তব্ধ ২৫ বছর বয়সী সোনু পাল। কুমোরটুলির এই বাসিন্দা তার মায়ের সঙ্গে পূজা দেখতে এসেছিলেন। বার্তা সংস্থা পিটিআইকে সোনু বলেন, ‘আমার মা আমার চোখের সামনেই মারা গেছেন। আমিও হয়তো বাঁচতাম না’।
তিনি জানান, বাইরে বৃষ্টি হওয়ায় কেউ মণ্ডপ থেকে বের হতে চাইছিলেন না। প্রবেশপথে বৃষ্টি থেকে বাঁচতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন ভেতরে ঢোকার জন্য ধাক্কাধাক্কি করছিলেন। একপর্যায়ে মানুষের চাপ অসহনীয় হয়ে ওঠে এবং সবাই একে অপরের ওপর পড়ে যান।
সোনু বলেন, তিনিও ওই ভিড়ের মধ্যে আটকা পড়েছিলেন। কোনোভাবে নিজেকে সামলে মায়ের কাছে গিয়ে দেখেন, মা আর সেখানে নেই।
আইএএনএস-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্থানীয় এক ব্যক্তি জানান, তার মেয়ে ও নাতনিও এতে আহত হয়েছেন। তিনি বলেন, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ দুটিই খুব সংকীর্ণ ছিল। ওই এলাকায় কোনও আলোর ব্যবস্থা ছিল না। অন্ধকারের কারণে দুজন ছোট শিশু পড়ে যায়, আমিও পড়ে গিয়েছিলাম। তাদের ওপর বহু মানুষ গড়িয়ে পড়ে। সেই মুহূর্তে সেখানে কোনও পুলিশ বা স্বেচ্ছাসেবক ছিল না।”
অন্য এক প্রত্যক্ষদর্শী সংবাদ সংস্থা এএনআই-কে জানান, পদপিষ্টের ঘটনায় অনেকে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। দ্রুত তাদের মোটরসাইকেলে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া অতিরিক্ত ভিড় ও হুড়োহুড়ির মুখে মণ্ডপের একটি অংশ ভেঙে পড়লে সরু গলির মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, বৃষ্টি শুরু হতেই বাইরে অপেক্ষমাণ ভিড় হঠাৎ সামনের দিকে ধেয়ে আসে। সে সময়ই রাস্তায় কয়েকজন পড়ে গেলে পদদলিতের ঘটনা ঘটে।
স্থানটির সুরক্ষার পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে পুলিশের এক বিবৃতিতে বলা হয়, সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিট নাগাদ গিরিশ পার্ক থানা এলাকার সারদা পার্ক (চোরবাগান) পূজা মণ্ডপের বের হওয়ার গেটে বৃষ্টির সময় দর্শনার্থীদের অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটে। আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার পর পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে হাসপাতালে পৌঁছান পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও মুখ্য সচিব মনোজ আগরওয়াল। অন্যদিকে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করে লেখেন, আমি মা দুর্গার কাছে আহতদের দ্রুত আরোগ্য এবং এই কঠিন সময়ে তাদের পরিবারের ধৈর্য ও শক্তির জন্য প্রার্থনা করছি।
উল্লেখ্য উত্তর কলকাতার হাতিবাগান ও বিডন স্ট্রিট এলাকার কাছে অবস্থিত চোরবাগান সর্বজনীন হলো অন্যতম প্রাচীন একটি পাড়ার পূজা। মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের রাম মন্দিরের কাছে অবস্থিত এই ঐতিহ্যবাহী পূজাটি দীর্ঘ ৯০ বছরেরও বেশি সময় ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
সূত্র: এনডিটিভি
কলকাতায় পূজামণ্ডপে পদদলনে ১৭ জনের মৃত্যু: নিহতদের পরিবারকে ২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ
কলকাতায় পূজার প্যান্ডেলে পদদলিত হয়ে ১৭ জন নিহত