ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির প্রাণকেন্দ্রে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের ঠিক বিপরীত পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী এক ঐতিহাসিক মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়ার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন দেশটির প্রবীণ ও তরুণ মুসলিমরা। ‘রেস কোর্স মসজিদ’ নামে পরিচিত প্রাচীন এই মসজিদটি ভারতের স্বাধীনতার চেয়েও পুরনো।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের আশেপাশের এলাকা পরিষ্কারের চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে মসজিদটি যেকোনও সময় ভেঙে ফেলা হতে পারে বলে আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে। ইতোধ্যেই কাছেই বুলডোজার দিয়ে বিভিন্ন স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার কাজ চলছে।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের ঐতিহাসিক স্থাপনা ‘দিল্লি রেস ক্লাব’ ইতোমধ্যেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছে। পাশাপাশি একই এলাকার একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দিরও ধ্বংসের হুমকিতে রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রাজধানীর কেন্দ্রে এমন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংসের প্রতিবাদে স্থানীয় বাসিন্দা ও অধিকারকর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
গত আগস্ট মাস থেকে শুরু হওয়া এই উচ্ছেদ অভিযানে চলতি মাসের শুরুর দিকে প্রায় ৭০০ ঘরবাড়ি ও বস্তি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। সেই সব ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে এখন একা ও জনমানবহীন অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে মসজিদ ও মন্দিরটি।
গত ১৬ অক্টোবর থেকে কোনও মুসলমানকে এই রেস কোর্স মসজিদে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনও লিখিত নির্দেশনা ছাড়াই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেরিকেড দিয়ে প্রবেশ পথ বন্ধ করে রেখেছে এবং বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।
বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ কেটে দেওয়ার পর প্রায় ৩৬ বছর ধরে মসজিদের দায়িত্বে থাকা ইমাম মোহাম্মদ হারুন এক ভিডিও বার্তায় আকুতি জানিয়ে বলেন, ‘এটি একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। এর জমি ওয়াকফ বোর্ডের গেজেটে নিবন্ধিত এবং এটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকাভুক্ত’। তিনি জানান, গত ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে এখানে অনুমোদিত বিদ্যুৎ মিটার এবং ২০০৮ সাল থেকে পানির সংযোগ রয়েছে। নিয়মিত বিল পরিশোধ করা সত্ত্বেও কোনও লিখিত নোটিশ ছাড়া তাকে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে জায়গা খালি করার মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয়।
মসজিদটির অবস্থান ১.২৪ একর জমিতে, যেখানে প্রায় ৮০০ মুসল্লি একসাথে নামাজ আদায় করতে পারতেন। এটি নয়াদিল্লি মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিল কর্তৃক তালিকাভুক্ত ১৪১টি সংরক্ষিত ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার একটি, যা আইনত সুরক্ষা পাওয়ার কথা। এছাড়া ১৯৭৭ সাল থেকে এটি ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে নিবন্ধিত। তবে কেন্দ্রীয় গৃহায়ন ও নগর বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘ল্যান্ড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস’ বেরিকেডের বাইরে একটি নোটিশ টাঙিয়ে দাবি করেছে, এই জমি সরকারের এবং এতে অননুমোদিত উপস্থিতি দণ্ডনীয় অপরাধ।
এদিকে মসজিদের পাশে অবস্থিত মন্দিরটির পুরোহিত কেশব রাজ শাস্ত্রী জানান, কোনও লিখিত নির্দেশ না থাকলেও ভক্তদের মন্দিরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না এবং তাদের বিদ্যুৎ-পানি সংযোগও কেটে দেওয়া হয়েছে।
মসজিদ ও মন্দির গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তাবিত পরিকল্পনাটি মূলত প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরবর্তী এলাকাটি ফাঁকা করার বহুধাপ বিশিষ্ট অভিযানের অংশ। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিরা এই পদক্ষেপের পেছনে জাতীয় নিরাপত্তা ও সংবেদনশীল এলাকার নিরাপত্তা সুসংহত করার অজুহাত দাঁড় করিয়েছেন।
অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের প্রধান ও সংসদ সদস্য আসাদউদ্দিন ওয়াইসি এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ওয়াকফ সংশোধন আইনের মাধ্যমে কীভাবে মুসলিমদের ধর্মীয় সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া যায় বা ধ্বংস করা যায়- এই ঘটনা তারই একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।
অন্যদিকে উচ্ছেদ হওয়া প্রায় ৭০০ পরিবারের শত শত মানুষকে তাদের বাসস্থান থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে হরিয়ানা সীমান্তের কাছে পুনর্বাসন ফ্ল্যাট দেওয়া হয়েছে। হঠাৎ এই স্থানান্তরের ফলে তারা জীবিকা ও কর্মসংস্থান হারিয়ে চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন এবং তীব্র শীতে মাথার ওপর ছাদ হারিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
সম্প্রতি ভারতের বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে পর্যাপ্ত আইনি ভিত্তি ছাড়াই মুসলিমদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও মসজিদে বুলডোজার চালানোর যে ধারা তৈরি হয়েছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তার কঠোর নিন্দা জানিয়ে একে ‘বুলডোজার জাস্টিস’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। সেই একই কৌশলে এবার দিল্লির কেন্দ্রস্থলে ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদটি ধ্বংসের চক্রান্ত চলছে বলে আশঙ্কা করছেন ভুক্তভোগীরা।
সূত্র: দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট
‘রাজীব ছিলেন খুব সুদর্শন’, প্রথম সাক্ষাতের স্মৃতি জানালেন সোনিয়া
আবারও প্রেসিডেন্ট হওয়ার ‘আকাশ কুসুম স্বপ্ন’ দেখছেন ট্রাম্প