কাতারে ইসরায়েলি হামলা: ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্কে যে প্রভাব ফেলবে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১৮:০০আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১৮:৩৩

চার মাসেরও কম সময় আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কাতারের আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তিনি মুগ্ধ হয়ে আমিরের জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদের প্রশংসা করেন এবং উপসাগরীয় এই রাজতন্ত্রের সঙ্গে একটি ব্যাপক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এছাড়া এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি অবস্থিত।

কিন্তু মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় হামাস নেতাদের ওপর আকস্মিক হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এই হামলা ট্রাম্প-আমির সম্পর্ককে নাড়িয়ে দিয়েছে। হামলায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন ট্রাম্প। দোহা ও পশ্চিমা মিত্ররা কঠোর নিন্দা জানিয়েছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নির্দেশে পরিচালিত এই হামলার লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনি জঙ্গি গোষ্ঠী হামাসের রাজনৈতিক কার্যালয়। হামলায় এক কাতারি নিরাপত্তা কর্মীসহ ছয় জন নিহত হলেও হামাস নেতারা বেঁচে যান। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি এই অভিযানের ‘প্রতিটি দিক নিয়ে খুবই অসন্তুষ্ট।’

তবে ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও এই হামলা ট্রাম্পের ইসরায়েল সম্পর্কিত মৌলিক নীতিতে পরিবর্তন আনবে বলে মনে করছেন না বিশ্লেষক ও মার্কিন কর্মকর্তারা। বরং এই হামলা ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্কের অন্তর্নিহিত শীতল হিসাবকেই সামনে এনেছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ইসরায়েল প্রমাণ করেছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে হলেও পদক্ষেপ নিতে ভয় পায় না। মঙ্গলবারের অভিযানের ব্যাপারে নেতানিয়াহুর প্রশাসন ওয়াশিংটনকে আনুষ্ঠানিকভাবে আগাম সতর্ক করেনি।

সতর্ক না করার এই আচরণ মনে করিয়ে দেয় ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের সেই ঘটনা। তখন ইসরায়েল হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে ফাঁদ পেতে রাখা পেজার ব্যবহার করে হাজার হাজার যোদ্ধাকে আহত করেছিল, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে না জানিয়ে।

ট্রাম্প মাঝে মাঝে নেতানিয়াহুর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করলেও তার প্রশাসন হামাসকে দুর্বল করার ইসরায়েলি প্রচেষ্টাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেছে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো মূল ইস্যুগুলোতে ইসরায়েলকে নেতৃত্ব নিতে দিয়েছে।

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক ও সাবেক মার্কিন শান্তি আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, “এই ঘটনায় ট্রাম্প নেতানিয়াহুর কৌশল নিয়ে বিরক্ত হয়েছেন। তবে ট্রাম্পের স্বভাবগত প্রবণতা হলো তিনি নেতানিয়াহুর এই মতের সঙ্গে একমত যে হামাসকে শুধু সামরিক সংগঠন হিসেবে দুর্বল করা যথেষ্ট নয়; একে মৌলিকভাবে দুর্বল করতে হবে।”

কিছু বিশ্লেষক অবশ্য মনে করছেন, নেতানিয়াহু যদি আরও অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপ নেন তবে ট্রাম্পের ধৈর্য ফুরিয়ে যেতে পারে। বাস্তবে এর মানে হতে পারে গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সমর্থন প্রত্যাহার, যা ইউরোপ ও আরব দেশগুলোর তীব্র ক্ষোভ ডেকে এনেছে। কারণ সেখানে দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি ছড়িয়ে পড়ছে।

সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ডেনিস রস বলেন, “যখন তার আরব মিত্ররা ইসরায়েলের কার্যকলাপ নিয়ে অভিযোগ করেন—যেমন তারা এখন করছেন—তখন তিনি হয়তো বলবেন, গাজায় ‘ডে আফটার’-এর জন্য আমাকে একটি গ্রহণযোগ্য পরিকল্পনা দিন, হামাসের বিকল্প শাসনের প্রস্তাব দিন, আমি তখন নেতানিয়াহুকে বলবো যে যথেষ্ট হয়েছে।”

তাই ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের সাবেক যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত মাইকেল ওরেন।

তবে হোয়াইট হাউজ কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্কের মধ্যে উত্থান-পতন রয়েছে।

একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, “প্রচারণার সময় থেকে এই সম্পর্ক কখনো গরম, কখনো ঠান্ডা।”

মে মাসে ট্রাম্প প্রথম বড় বিদেশ সফরে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যান, তবে ইসরায়েল এড়িয়ে যান। বিশ্লেষকরা এটিকে এক ধরনের অপমান হিসেবে দেখেছিলেন। জানুয়ারিতে রিপাবলিকান এই প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় ফিরে আসেন এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি নেতানিয়াহুর সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করবেন, যা তার ডেমোক্র্যাট পূর্বসূরির সময় অবনতি হয়েছিল।

সেই সফরে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের অনুরোধে ট্রাম্প নতুন সিরিয়ান সরকারের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে রাজি হন। এই সিদ্ধান্ত ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের উদ্বিগ্ন করে তোলে, কারণ তারা সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাকে (সাবেক আল-কায়েদা নেতা) সন্দেহের চোখে দেখেন।

কিন্তু মাত্র এক মাস পর ট্রাম্প-নেতানিয়াহু জোট আবার ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। জুনে ইসরায়েল যখন ইরানে বিমান হামলা চালায়, তখন বিদেশি যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেওয়া ট্রাম্প হঠাৎ বি-২ বোমারু বিমান পাঠান এবং ইরানের মূল পারমাণবিক স্থাপনাগুলো আংশিক ধ্বংস করেন।

জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র দামেস্কে ইসরায়েলি হামলার সমালোচনা করে, যেখানে সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি অংশ ধ্বংস হয়েছিল। আর মঙ্গলবার কাতারে হামলার আগে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে মাত্র কিছুক্ষণ আগে জানালেও কোনও সমন্বয় বা অনুমোদন নেয়নি, জানিয়েছেন দুই মার্কিন কর্মকর্তা।

সাবেক মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোনাথন প্যানিকফ বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত ও চাপ দিতে পারে। তবে নেতানিয়াহু এমনভাবেই কাজ করবেন, যেভাবে তিনি মনে করেন ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা হবে।”

সূত্র: রয়টার্স

/এস/এমওএফ/
সম্পর্কিত
শিক্ষার্থীদের সমাধান নয়, রাজনৈতিক শিরোনামই চেয়েছেন রাহুল: ভারতের শিক্ষামন্ত্রী
হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রণ হবে ‘বিপজ্জনক নজির’: রুবিও
শর্ত ছাড়াই সৌদির সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি, কংগ্রেসে পাঠাচ্ছেন ট্রাম্প
সর্বশেষ খবর
শিক্ষার্থীদের সমাধান নয়, রাজনৈতিক শিরোনামই চেয়েছেন রাহুল: ভারতের শিক্ষামন্ত্রী
শিক্ষার্থীদের সমাধান নয়, রাজনৈতিক শিরোনামই চেয়েছেন রাহুল: ভারতের শিক্ষামন্ত্রী
মোহনপুরের প্রবেশমুখে পানের প্রতীক, উদ্বোধন করলেন জেলা প্রশাসক
মোহনপুরের প্রবেশমুখে পানের প্রতীক, উদ্বোধন করলেন জেলা প্রশাসক
মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে বাড়িতে গিয়ে ধর্ষণের কথা জানালো ছাত্র, অধ্যক্ষ গ্রেফতার
মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে বাড়িতে গিয়ে ধর্ষণের কথা জানালো ছাত্র, অধ্যক্ষ গ্রেফতার
হাজারীবাগে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে যুবক নিহত
হাজারীবাগে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে যুবক নিহত
সর্বাধিক পঠিত
এমপির ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ নানান প্রশ্ন, দ্বিতীয় স্ত্রী ও শ্বশুরের বক্তব্যে অমিল
এমপির ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ নানান প্রশ্ন, দ্বিতীয় স্ত্রী ও শ্বশুরের বক্তব্যে অমিল
জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরাল, জানা গেলো আসল ঘটনা 
জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরাল, জানা গেলো আসল ঘটনা 
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় পরিবর্তনের পথে ইসি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় পরিবর্তনের পথে ইসি
আর্জেন্টিনার জার্সি পরে ভাইরাল, সেই রুনা ডিবির হাতে গ্রেফতার
আর্জেন্টিনার জার্সি পরে ভাইরাল, সেই রুনা ডিবির হাতে গ্রেফতার
গুজবে তেলের পাম্পে দীর্ঘ লাইন, ট্যাংকি ভর্তি করার হিড়িক, প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তি
গুজবে তেলের পাম্পে দীর্ঘ লাইন, ট্যাংকি ভর্তি করার হিড়িক, প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তি