এনআরসি’র আওতায় ‘বিদেশি’ শনাক্তকরণ নিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে উত্তেজনা

Send
আশীষ বিশ্বাস, কলকাতা
প্রকাশিত : ২০:৫১, জুন ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৫৫, জুন ২২, ২০১৯

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নাগরিক নিবন্ধনের (এনআরসি) সময় ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের প্রতি কাঠামোগত বৈষম্যের অবসান ঘটাতে সেদেশের সরকারের কাছে আবারও আবেদন জানিয়েছে বড় রাজনৈতিক দল ও নাগরিক অধিকার আদায়ের সংগঠনগুলো। আসামে ৩২ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ৪০ লাখ মানুষ সংশোধিত ভারতীয় নাগরিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন কার্যক্রম হালনাগাদকরণের অংশ হিসেবে নাগরিকত্বের তথ্যগুলো পরীক্ষা করছে আসাম ও এনআরসি কর্তৃপক্ষ। যারা তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন তাদের বেশিরভাগই বাঙালি মুসলিম ও হিন্দু। ‘বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহে তাদেরকে তালিকা থেকে বাদ রেখেছে আসাম কর্তৃপক্ষ। এদের অনেকেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আসামে বসবাস করছে।

এনআরসি (প্রতীকী ছবি-১)
এনআরসি বা নাগরিক নিবন্ধন তালিকাকে কেন্দ্র করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন আসামের তিন বাঙালি অধ্যুষিত জেলা কাচার, করিমগঞ্জ ও হালিয়াকান্দিতে উত্তেজনা ঘনীভূত হচ্ছে। তালিকা থেকে বাদ পড়াদের বেশিরভাগই এসব এলাকার মানুষ। শুরু থেকেই এ তিন জেলায় বিক্ষোভের ঝড় চলছে। অনেক জনকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ায় তা নিয়ে মানুষ সন্দেহ প্রকাশ করেছে। যাদেরকে ‘অনাগরিক’ কিংবা ‘সন্দেহজনক নাগরিক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে তাদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন ধর্মীয় কিংবা ভাষাগত জায়গা থেকে তাদেরকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। অনেকে আবার অভিযোগ করেছেন, নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য তারা এনআরসি কর্মকর্তাদের কাছে আনুষ্ঠানিক যে নথিপত্র জমা দিয়েছেন তা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। কারও কারও অভিযোগ, দরিদ্র ও কম শিক্ষিত মানুষ সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হয়েছেন। তবে এসব অভিযোগ অভিযোগ অস্বীকার করেছে এনআরসি।

আসামে ভারতীয় নাগরিকদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে ৩১ জুলাই। তীব্র জন বিক্ষোভের মুখে এনআরসি প্রকাশের নতুন সময়সীমা ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। তালিকা হালনাগাদকরণের আদেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। কতিপয় স্থানীয় কর্মকর্তার কাছে উপেক্ষিত হওয়া নাগরিকত্বের বিশুদ্ধ প্রমাণ ও অভিযোগগুলো আমলে নিতে থাকে আদালত। সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তি যদি তালিকা থেকে তার বাদ পড়াকে চ্যালেঞ্জ করেন তবে তিনি তার দাবির পক্ষে অতিরিক্ত নথি জমা দিতে পারবেন। আদালতের এ আদেশ ভুক্তভোগীদের মধ্যে খানিক স্বস্তি নিয়ে আসে।

সময়সীমা এগিয়ে আসায় আসামের বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ও আতঙ্ক ভর করেছে। তাদের এ আতঙ্ক অমূলক নয়। ‘বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অবৈধ বিদেশি’ হিসেবে শনাক্ত হওয়াদের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত কী করা হবে সে ব্যাপারে রাজ্য সরকার কিংবা কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে কিছু উল্লেখ না করায় আতঙ্ক বেড়েছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ‘বিদেশি’ হিসেবে শনাক্ত হওয়া এমন কয়েক লাখ মানুষকে কখনও বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে কিনা তা নিশ্চিত করার মতো কোনও পদ্ধতি নির্ধারিত হয়নি। প্রভাবশালী রাজনীতি বিশ্লেষক সুবির ভৌমিক মনে করেন, যথাযথভাবে পরিস্থিতি সামলানো না হলে তা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে তিক্ত করবে।

দ্য কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মাক্সিস্ট) আসাম ইউনিট কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছে, যেন বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত হওয়া মানুষদের পরিণাম কী হবে তা স্পষ্ট করা হয়। এ ধরনের স্পর্শকাতর ইস্যু ঝুলিয়ে না রাখার অনুরোধ করা হয়েছে।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল ঘোষণা করেছেন, কোনও বিশুদ্ধ নাগরিককে কোনোভাবে হয়রানি করা হবে না। তবে বাঙালি হিন্দু কিংবা মুসলিমদের কেউই এতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি।

এনআরসি (প্রতীকী ছবি)
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কারগিল যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ সানাউল্লাহ। অবসরপ্রাপ্ত এ সেনা কর্মকর্তা ‘নাগরিকত্ব না থাকা’র অভিযোগে কিছুদিন আগে গ্রেফতার হন এবং তার জেল হয়। কারণ তার কিছু কাগজপত্র ঠিক ছিল না। তার বাবাও আসামের স্থায়ী বাসিন্দা। এ মামলাটি বেশ শোরগোল তুলেছিলো। ধরে ধীরে জানা গেলো, যে কর্মকর্তা এ মামলার দায়িত্বে ছিলেন তিনি বেশ কয়েকটি বড় ভুল করেছেন।

আসামের আরেকটি ঘটনায় দেখা গেছে, দুই/তিন বছর আগে উত্তর বিহার থেকে আসা হিন্দি ভাষাভাষী এক ব্যক্তি এনআরসি’র কর্মকর্তাদের হাতে হয়রানির শিকার হয়েছেন। এনআরসি কর্মকর্তারা দাবি করছিলেন ওই ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক নন। কারণ তিনি অসমীয়া ভাষায় কথা বলতে পারছিলেন না। এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে ওই ব্যক্তি বলেন, তিনি হিন্দি জানেন, বাংলা ও ইংরেজি ভাষা বোঝেন এবং এসব ভাষায় সামান্য কথাবার্তা বলতে পারেন। তবে তিনি অসমীয়া জানেন না। এনআরসি কর্মকর্তাদের দাবি ছিল, আসামে থাকতে হলে অসমীয়া ভাষা জানতে হয়।

এ ব্যাপারে মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর-এর মুখপাত্র বলেন, ‘আমি বিস্মিত হচ্ছি যে এ ধরনের কর্মকাণ্ড আমাদের সংবিধান অনুযায়ী যৌক্তিক কিনা। কেন অন্য রাজ্য থেকে আসাম সফরে যাওয়া এবং কিছু সময়ের জন্য সেখানে থাকা মানুষদেরকে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সবাই তো আর একজন সেনা কর্মকর্তার মতো প্রভাবশালী আর স্বনামধন্য নন। হালিয়াকান্দি কিংবা কাচারে থাকা গ্রামবাসীদের কী হবে? এমনকি এনআরসি অফিসে একবার যেতেও তাদেরকে অনেক টাকা ও সময় ব্যয় করতে হয়। বছরের পর বছর ধরে বন্যা প্রবণ এলাকাগুলোতে বসবাস করে আসা এসব মানুষ কোথায় পুরনো কাগজপত্র খুঁজে পাবে? আপিল করার জন্য আইনি সহযোগিতার খরচ কিভাবে মেটাবে তারা? মুক্তি চাইলে আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জামিনের মুচলেকা বাবদ দুই লাখ রুপি দিতে পারবে কয়জন?’

আসামের বিভিন্ন জায়গায় দশটি আটক কেন্দ্র তৈরি করা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে ইঙ্গিত মিলছে যে বিপুল সংখ্যক মানুষকে অ-নাগরিক ঘোষণা করা হতে পারে। অ-নাগরিক ঘোষিত মানুষ যারা এনআরসি’র সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেন, তাদের সামলাতে আরও বেশ কিছু ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে। তবে এনআরসি কর্তৃপক্ষের প্রাপ্ত ফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে ফেলার পর আদালত তা নিয়ে রায় দিতে পারবে কিনা সে ব্যাপারে জানা যায়নি।

এরইমধ্যে গোয়ালপাড়া আটক কেন্দ্রে থাকাদের শোচনীয় অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে। দিল্লিভিত্তিক মানবাধিকারকর্মী হার্শ মান্দের এ কাজ করতে সক্ষম হয়েছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন, জাতিসংঘের সংস্থাগুলো ও অন্যান্যদের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় সরকারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চূড়ান্তভাবে ‘আসামে অবৈধ বাংলাদেশি’ হিসেবে শনাক্ত হওয়াদের ব্যাপারে দিল্লি ও গোহাটির পক্ষ থেকে যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে তাতে আলোকপাত করার অনুরোধ জানিয়েছে তারা। উল্লেখ্য, আসামে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের পর বৈধ কাগজপত্র ছাড়া প্রবেশকারী ব্যক্তিদেরকে ‘বিদেশি’ হিসেবে শনাক্ত করা হবে।

/এফইউ/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ