জম্মু-কাশ্মিরে মোদির উন্নয়ন পরিকল্পনা কি সফল হবে?

Send
আশীষ বিশ্বাস, কলকাতা
প্রকাশিত : ২২:০০, আগস্ট ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:০৬, আগস্ট ১৯, ২০১৯

৫ আগস্টে ৩৭০ ধারা বাতিলের পরপরই ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) নতুন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা হাজির করে।  সহিংসতাপূর্ণ অঞ্চল থেকে কাশ্মিরকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে বিশাল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয় মোদি সরকার। তবে উন্নয়নের এই প্রতিশ্রুতিকে কাশ্মিরবাসীকে খুশি করার প্রচারণা কৌশল বলে মনে করা হচ্ছে। তাছাড়া এই পরিকল্পনা সফল হবে কিনা, তা নিয়েও বিপুল সংশয় রয়েছে। 

বর্তমানে কাশ্মির থেকে বানিহাল পর্যন্ত শুধু দীর্ঘ সড়কপথ রয়েছে যা ১৯৫২-১৯৫৬ সালে নির্মিত হয়েছিলো।  ভারতের রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে জম্মু ও কাশ্মিরের রেল যোগাযোগ আরও উন্নত করা হবে। ২০২০ সালের মধ্যে নবনির্মিত কাত্রা স্টেশন থেকে জম্মুর বানিহাল পর্যন্ত ১১১ কিলোমিটার রেল সংযোগ করা হবে। এদিকে কাত্রা থেকে বানিহাল পর্যন্ত ৩৫৬ কিলোমটার দীর্ঘ সংযোগ সড়কে জম্মু-শ্রীনগর ও বারামুলা যুক্ত রয়েছে। কয়েকবছর আগে ৬০০ কোটি ডলার ব্যয়ে এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। অন্যান্য প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। বারামুল থেকে কাশ্মিরের অন্যান্য অঞ্চলে এই যোগাযোগব্যবস্থা বর্ধিত করা যেতে পারে। কাত্রা-বানিহালের এই যোগাযোগের এই বিলম্ব হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে পাহাড়ি উঁচু-নিচু এলাকা। এই প্রকল্পের ১০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রায় সবজায়গাতেই টানেল রয়েছে। আরও রয়েছে ২৭টি বড় ও ১০টি ছোট সেতু। সবচেয়ে উঁচু এলাকায় যেই সেতু থাকবে তার উচ্চতা আইফেল টাওয়ারের চেয়েও ৩৫ ফিট বেশি। বিরোধীরা বলছেন, এই প্রকল্পগুলো শুধু মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে কাশ্মিরকে কাছে আনতেই করা হয়নি। তিব্বত ও অন্যান্য নিকটবর্তী এলাকায় চীনের বিশাল অবকাঠামো প্রকল্প থাকায় কাশ্মিরের ভৌগলিক নিরাপত্তা প্রশ্নেই মূলত ভারত এমন অর্থায়নে বাধ্য হয়েছে।
 
এই উদ্যোগগুলো শুধুমাত্র সরকারি খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। রিয়ালান্স গ্রুপের কর্ণধার মুকেশ আম্বানিও খুব শিগগিরই কাশ্মিরে একটি অনুসন্ধানী দল পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন। সেখানে বিনিয়োগ করে চাকরির নতুন ক্ষেত্র তৈরির কথা বলেছেন এই ‍ধনকুবের। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অনুরোধেই কাশ্মিরে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন মুকেশ আম্বানি। এদিকে ট্রাইডেন্ট গ্রুপের প্রধান রাজিন্দর গুপ্তা আরও নির্দিষ্ট করে বিনিয়োগের অংকের কথা বলেছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে অন্তত এক হাজার কোটি রুপি বিনিয়োগের ঘোষণা দেন তিনি। এই প্রকল্পে নারীদের ক্ষমতায়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বিশেষ করে তাদের দক্ষ করে গড়ে তোলার প্রশিক্ষণের ওপর। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রাথমিক অবস্থায় অন্তত ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য তার। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, বর্তমানে প্রচলিত বিধিনিষেধ অনেকটাই শিথিল করা হবে। কারণ এখন কাশ্মির ভারতেরই অংশ, সেখানে বিনিয়োগ ও ভ্রমণ বাড়বে। ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে  কাশ্মিরিদের যোগাযোগ আরও সহজ করতেই এমন পরিকল্পনা।  
 
বিরোধী দলীয় নেতারাও অবশ্য স্বীকার করছেন এনডিএ’র এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে কাশ্মিরের সাধারণ শান্তিপ্রিয় জনগণ খুশি হবে। মুসলিম কিংবা হিন্দু, তরুণ কাশ্মিরিরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হায়দ্রাবাদ, ব্যাঙ্গালুরুসহ অন্যান্য শহরে আইটি ও প্রকৌশলসহ বিভিন্ন খাতে কাজ করা শুরু করেছে। কাশ্মির উপত্যকায় তাদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ কম। সহিংসতা ও বিদ্রোহ লেগেই রয়েছে সেখানে। কলকাতার অর্থনীতিবিদ সৌনক মুখার্জি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, বিবাদপূর্ণ কাশ্মির উপত্যকায় সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগে নিশ্চিতভাবেই ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক একটি সংযোগ তৈরি হবে। মিজোরাম, আসাম ও নাগাল্যান্ডের দিকে তাকালেই আমরা দেখতে পাই কয়েক বছর আগেই সেখানে কয়েকটি সংগঠন বিচ্ছিন্ন হওয়ার দাবি জানিয়েছিলো। আর কেন্দ্রীয় সরকার সেখানে বিনিয়োগ বাড়ানোর পর চাকরির সুযোগ ও উন্নয়ন ঘটলে পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে শুরু করে।
 
কাশ্মিরের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে মোদি সরকারের এই আশা খুঁটির মতো কাজ করছে। পর্যটন থেকেও কাশ্মিরে অনেক আয় হলেও সেখানকার অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সালে এখন পর্যন্ত শ্রীনগরের অভ্যন্তরীণ ও কাছাকাছি অবস্থিত রুটির দোকানগুলো সহিংসতার কারণে ২৭০ কোটি রুপি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাশ্মির চেম্বার অব কমার্সের সূত্র জানায়, ‘আমাদের পণ্যগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারছি না।’ বিগত দুই পাশে কাশ্মির উপত্যকায় বিভিন্ন বুকিং বাতিল হওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ২০০ কোটি রুপির ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া শিকারাচালক (এক প্রকারের নৌ যান), ট্যাক্সিচালক, ট্যুর গাইডসহ অন্যান্য দিন আনে দিন খায় পেশাজীবীদের পরিস্থিতিও অবর্ণনীয়। তবে কাশ্মিরে মোদির অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। 

পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনগুলো উন্নয়নের পথে ভয়াবহ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন,  কাশ্মিরের নতুন প্রশাসন আসলে যে আইএসআই এবং জঙ্গি সংগঠনগুলো যে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেবে না তা নিশ্চিত। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে ঠিকেই তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে। তারা হয়তো একে ‘ভারতীয় আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করবে। এমন বাস্তবতায় কাশ্মিরে নতুন বিনিয়োগ আসলে কঠিনই হবে। এদিকে ভারতের অর্থনৈতিক বাস্তবতাও খুব আশাব্যাঞ্জক না। সরকারি খাতে এর প্রভাব বেশি। অর্থনীতিবিদরা জানান, বিগত অর্থবছরে কেন্দ্রীয় সরকার তাদের ব্যয় খাত থেকে ৩০ শতাংশ কমিয়েছে। এতে করে অর্থনৈতিক গতির হার কতটা কম তা স্পষ্ট হয়ে যায়। বিগত ছয় বছরে দেশটিতে ৯১ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। আর বিগত তিন মাসের হিসেবে চাকরিচ্যুত হয়েছেন ২ লাখেরও বেশি কর্মী।
 
 
/এমএইচ/বিএ/

লাইভ

টপ