সংবাদ বিশ্লেষণরোহিঙ্গা নিপীড়নকে বৈধতা দিচ্ছে জাপান?

Send
আজিজুর রহমান অনীক
প্রকাশিত : ২১:১১, সেপ্টেম্বর ০৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:১৩, সেপ্টেম্বর ০৩, ২০১৯

গত ৬ আগস্ট  মিয়ানমারের অর্থনীতির সর্বশেষ অবস্থা জানার জন্য টোকিওতে জড়ো হয়েছিলেন শতাধিক জাপানি ব্যবসায়ী। তাদেরকে সেসময় দারুণ আকর্ষণীয় বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিলো। দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে সামনে এনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামোয় ব্যাপক বিনিয়োগ ও লাভের সম্ভাবনার কথা বলা হয় তাদের।  

সেই অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্থ উপস্থাপন করেন জাপানে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত থুরাইন থান্ত জিন। তাকে সেসময় জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের ১১১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলো সামরিক বাহিনীকে আর্থিক সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা বিয়ার প্রস্তুতকারী কিরিন হোল্ডিংস এবং মিয়ানমারের সামিরক বাহিনী কর্তৃক পরিচালিত প্রতিষ্ঠান মিয়ানমার ইকোনমিক কর্পোরেশনের সঙ্গে যৌথ বাণিজ্য করা তামাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান জাপান টোবাকো।  

যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল রাখাইন নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর ২০১৮ সালে কিরিন হোল্ডিংস প্রকাশ্যেই জানায় যে তারা ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্য সরকারকে ‘মানবিক সহায়তা’ হিসেবে ৬ হাজার মার্কিন ডলার দিয়েছিলো। ডিসেম্বরে এক তদন্তের পর তারা দাবি করে, ওই সহায়তা কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে সেটা যাচাই করতে পারেনি তারা। অন্যদিকে এমইসির সঙ্গে যৌথ বাণিজ্যের কথা অস্বীকার করেছে জাপান টোবাকো।

এই প্রতিবেদনটিকে ‘আবেগ’ এবং ‘অনুভুতি’ নির্ভর উল্লেখ করে সেটিকে প্রত্যাখান করেছেন  রাষ্ট্রদূত থুরাইন থান্ত জিন। তিনি দাবি করেন, এই প্রতিবেদনে কোনও প্রমাণ দেওয়া হয়নি। কিন্তু তিনি তার বক্তব্যের পক্ষে প্রমাণ হাজির করেছেন। ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের অভিযোগের ব্যাপারে কিছু বলেননি তিনি।

ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা ও ধর্ষণসহ ভয়ানক নিপীড়ন চালিয়েছে।  প্রতিবেদেনে একে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ বলে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে এটিকে ‘গণহত্যা’ও  বলা হয়েছে। 

২০১৭ সালের ২৫ আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালে করে সেনাবাহিনী। সহিংসতা থেকে বাঁচতে রাখাইন থেকে এখন পর্যন্ত ৭ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষ বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হয়েছে। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে সহিংসতা থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিলো প্রায় তিন লাখ। সবমিলে প্রায় ১০ লাখ মানুষ শরণার্থী শিবিরগুলোতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। 

সাম্প্রতিক প্রকাশিত প্রতিবেদটিতে আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সর্ম্পক ছিন্নের আহ্বান জানানো হয়।  কারণ সেনা সংশ্লিষ্ট যেকোনও বিদেশি ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং এমইএইচএল ও এমইসি এর মতো সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘনে ভুমিকা রাখতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।  কারণ অল্প হলেও এই প্রতিষ্ঠানগুলো সামরিক বাহিনীর আথিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে।

প্রতিবেদনটির রাষ্ট্রদূতের প্রত্যাখ্যান করার ব্যাপারটিতে অবাক হওয়ার কিছু নয়। মিয়ানমার সরকার যে বিশ্বকে পাশ কাটিয়ে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন অব্যাহত রাখবে এমনটাই স্বাভাবিক। জাতিসংঘের বিশেষ দূত কিংবা ফ্যাক্টফাইন্ডিং মিশন কাউকেই তারা রাখাইনে প্রবেশ করতে দেবে না।

বরং অবাক করার মতো বিষয়টি হল বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহতম মানবিক বিপর্যয় ও মানবাধিকার সংকটকে দূরে সরিয়ে জাপানের বেসরকারি খাত কীভাবে যথারীতি ব্যবসা করে চলেছে। জাপান সরকার মিয়ানমার সর্ম্পকিত জাতিসংঘের প্রস্তাবগুলি থেকে দূরেই থেকেছে। এমনকি ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটিও ব্যবহার করেনি তারা। 

টোকিওতে অনুষ্ঠিত ‘রাখাইন বিনিয়োগ মেলার’ ধারাবাহিকতায় গত ২৪শে জুলাই মিয়ানমারে এমন একটি সম্মেলনের আয়োজন করে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন।  গত ৬ আগষ্টের ইনভেস্টমেন্ট ফোরামের বৈঠকে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত থুরাইন থান্ট জিন জাপান এবং মিয়ানমারের মধ্যকার সর্ম্পককে ‘ভ্রাতৃত্ব’ বলে উল্লেখ করেন।  এরই মধ্যে গত ২৭ আগস্ট টোকিওর বাইরে মিয়ানমারে বিনিয়োগ করার বিষয়ে আবারো সম্মেলন ডাকে সংস্থাটি।  সেখানেও রোহিঙ্গা বিষয়টি নিয়ে আলোচ্য সূচিতে ছিলো না।  তাকে রোহিঙ্গা সংকটে ব্যাপারে জিজ্ঞাসা না করা পর্যন্ত এই বিষয়ে কিছু বলতে চাননি তিনি।

দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য ও মিয়ানমারে সাম্প্রতিক বিনিয়োগে নড়েচগে বসেছে জাপান। সেটিকে লক্ষ্য রেখে জাপানের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো বসে থাকতে চাচ্ছে না। চীনের মতোই রোহিঙ্গা সংকটকে অগ্রাহ্য করে সেখানে ব্যবসার সম্প্রসারন ও প্রভাব বিস্তারে আগ্রহী জাপান। কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দক্ষিণ পূর্ব এশীয় দেশগুলোতেও এমন মানবাধিকার পাশ কাটিয়ে চীনে সঙ্গে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই করতে দেখা গেছে জাপানকে।

তবে টোকিও পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা উচিত। দেশটির বেসরকারি খাতের উচিত জাতিসংঘের ব্যবসায়িক নীতি ও মানবাধিকার মেনে বাণিজ্য সম্প্রসারণ করা। জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী মানবাধিকারের প্রতি সম্মান জানানো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় এমন কোনও কাজের তারা সহায়তা করা থেকে বিরত থাকবেন এবং তাদের ব্যাবসায়িক সম্পর্কেও যেন তা ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেটা দেখবেন। এর মানে হচ্ছে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সংশ্লিষ্ট কোনও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তারা ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন না। দায়িত্বজ্ঞানহীন বিনিয়োগ শুধুমাত্র মিয়ানমার সরকারকে শক্তিশালী করবে এবং রোহিঙ্গা নিপীড়ন নিয়ে বিশ্বের চোখে ধুলা দেওয়ার চেষ্টা করবে।

একইসঙ্গে জাপানি সরকারের উচিত রোহিঙ্গা নিধনে জড়িত মিয়ানমারের সেনাসদস্যের বিচার নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সহায়তা করা। মিয়ানমারে আচরণ পরিবর্তনে জাতিসংঘের প্রস্তাবেও সমর্থন দেওয়া উচিত তাদের। রাখাইনে তদন্তের স্বার্থে জাতিসংঘের বিশেষ  দূতকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার জন্য মিয়ানমারকে চাপ দিতে হবে জাপানকে।  

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইট ওয়াচের জাপান দফতরের কর্মী তেপ্পাই কাসাই বলেন, টোকিও ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যদি মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সমর্থিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ব্যবসা সম্প্রসারণ করে সেটি হবে মানবতার জন্যে ক্ষতিকর। এসব ব্যবসা মিয়ানমারের সেনাকে সমর্থন করবে এবং রোহিঙ্গা নিপীড়নে সেই অর্থ খরচ করা হবে।  তিনি জাপানের কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে মিয়ানমারের সঙ্গে ব্যবসা করা থেকে বিরত থাকতে বলেন। বরং জাপান সরকার আর্ন্তজাতিক মহলকে সঙ্গে নিয়ে মিয়ানমার সরকারকে চাপ প্রয়োগ করা উচিত রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধ করতে চাপ প্রয়োগ করা উচিত।

/এমএইচ/

লাইভ

টপ