ফাঁস হওয়া চীনা নথিতে উইঘুর নিপীড়নের আলামত

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১১:৪৯, নভেম্বর ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২৮, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

চীনের জিনজিয়াং রাজ্যে উইঘুর মুসলিমদের ওপর চীনের রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন নতুন নয়। সম্প্রতি এক সরকারি নথি ফাঁসের পর দেখা যায়, সেখানেও উঠে এসেছে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে উইঘুর মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের দলিল। শুধু নৃতাত্ত্বিক উইঘুর সম্প্রদায়ের মুসলমানরাই নয়; বরং একই অবস্থা অঞ্চলটির অন্য মুসলিমদেরও। শনিবার এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসসুইজারল্যান্ডের জেনেভায় উইঘুর মুসলিমদের বন্দিশিবিরে আটকে রাখার প্রতিবাদে বিক্ষোভ
চীনে প্রায় দেড় কোটি উইঘুর মুসলমানের বাস। জিনজিয়াং প্রদেশের জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশই উইঘুর মুসলিম। এই প্রদেশটি তিব্বতের মতো স্বশাসিত একটি অঞ্চল। বিদেশি মিডিয়ার সেখানে প্রবেশের ব্যাপারে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। কিন্তু গত বেশ কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন সূত্রে খবর আসছে, সেখানে বসবাসরত উইঘুরসহ ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের ওপর ব্যাপক ধরপাকড় চালাচ্ছে বেইজিং। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও অ্যাক্টিভিস্টরা দীর্ঘদিন থেকেই বলে আসছেন, জিনজিয়াং-এর বিভিন্ন বন্দিশিবিরে অন্তত ১০ লাখ মুসলিমকে আটক করে রেখেছে চীন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলোও জাতিসংঘের কাছে এ ব্যাপারে উদ্বেগ জানিয়েছে। তবে চীন বরাবরই মুসলিমদের গণগ্রেফতারের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমের হাতে আসা নথিটি ফাঁস হয়েছে চীনের একজন ঊর্ধ্বতন রাজনীতিকের কাছ থেকে। এতে দেখা গেছে, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কিভাবে ২০১৪ সালে অঞ্চলটি সফরকালে এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে অঞ্চলটির মুসলিমদের ব্যাপারে বেইজিং-এর অবস্থান পরিষ্কার করেছেন।

একটি ট্রেন স্টেশনে চুরি হামলার পর অঞ্চলটি সফর করেন শি জিনপিং। ওই হামলার জন্য উইঘুরদের দায়ী করা হয়ে থাকে। এরপর দেওয়া সিরিজ ভাষণে একনায়কতন্ত্রের উপাদানগুলো ব্যবহার করে ‘সন্ত্রাসবাদ, অনুপ্রবেশ ও বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে’ লড়াইয়ের নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে উইঘুর মুসলিমদের ব্যাপারে কোনওভাবেই অনুকম্পা না দেখানোর নির্দেশ দেন তিনি। চীনা প্রেসিডেন্টের এমন নির্দেশের ব্যাপারে রয়টার্সের পক্ষ থেকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি ফ্যাক্স করা হয়েছে। এর কোনও জবাব মেলেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, চীনের লড়াই কথিত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে নয়; বরং জিনজিয়াং থেকে উইঘুর মুসলমানদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে বেইজিং।

লন্ডনের চীনা দূতাবাসের সামনে উইঘুর হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ। ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

নথিতে দেখা যায়, অন্যান্য দেশে সন্ত্রাসী হামলা এবং আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের ফলে চীনা নেতৃত্বের ভয় আরও বেড়েছে। বন্দিশিবিরে নিয়ে যাওয়া মুসলিম পরিবারের কোনও সন্তান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফিরলে কর্মকর্তারা তাদের জানাতেন, তার পরিবারের সদস্যদের প্রশিক্ষণের জন্য নেওয়া হয়েছে। চীনা কর্মকর্তারা মুসলিম বন্দিশিবিরগুলোকে ‘ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ২০১৬ সালের পর থেকে এই বন্দিশিবিরগুলোর আকার আগের চেয়ে অনেক দ্রুত বেড়েছে। এখনও বন্দিশিবিরের বাইরে থাকা মুসলিমদের ব্যাপক সরকারি নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে।

ইসলামকে চীনের সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে বেইজিং। ইতোমধ্যেই আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশটিতে ইসলামের ‘চাইনিজ ভার্সন' বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। এর মাধ্যমে তারা চীনের মুসলিম জনসংখ্যাকে ‘চিনিসাইজ’ বা চীনা ধারার সমাজতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলতে চাইছে। এর আওতায় মসজিদগুলোকে গম্বুজের বদলে চীনা স্টাইলের প্যাগোডার আকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। রাজধানী বেইজিংয়ে হালাল পণ্য বিক্রি করে এমন ১১টি রেস্টুরেন্ট ও দোকানপাটের কর্মীরা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, কর্মকর্তারা তাদের ইসলামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছবিগুলো সরিয়ে নিতে বলেছে। এরমধ্যে ক্রিসেন্ট মুন বা অর্ধচন্দ্র এবং আরবিতে লেখা ‘হালাল’ শব্দটিও রয়েছে।

দুই কোটি মুসলিমের আবাসস্থল চীন প্রকাশ্যে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলে থাকে। দাফতরিকভাবে তারা এর নিশ্চয়তাও দেয়। কিন্তু সরকার চাইছে ধর্মবিশ্বাসীদের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলার জন্য। এজন্য তারা ব্যাপক ধরপাকড় ও সংখ্যালঘুদের ওপর বিভিন্ন ধারার নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশটিতে বিভিন্ন ‘মতবাদে বিশ্বাসী জনগোষ্ঠী’র ওপর চাপ আরও বাড়তে শুরু করে। বিভিন্ন স্থানে মুসলমানদের ধর্ম পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। দেশটির একাংশে ইসলামের চর্চা নিষিদ্ধ। নামাজ-রোজার পাশাপাশি দাড়ি রাখা বা হিজাব পরার মতো কারণেও ধরপাকড়ের হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে অনেককে। বিভিন্ন মসজিদ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে গম্বুজ ও চাঁদ-তারার প্রতিকৃতি। মাদ্রাসা ও আরবি শিক্ষার ক্লাস নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে শিশুদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একেই তারা বলছে চীনা ধারার সমাজতন্ত্রের সঙ্গে ইসলামের সামঞ্জস্য তৈরি করা। যারা এটি মানতে চাইবে না, তাদের বিচারের আওতায় নিতে প্রণীত হয়েছে নতুন আইন।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, ১০ লাখেরও বেশি উইঘুর মুসলিমকে আটক রেখে তাদের ধর্ম পালনে বাধা দেওয়া হচ্ছে। বলপূর্বক তাদের কমিউনিস্ট পার্টির মতাদর্শে বিশ্বাস স্থাপন করানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকাশ্যে নিজ ধর্মের সমালোচনা করতে তাদের ওপর বলপ্রয়োগ করা হচ্ছে। আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের শপথ করতে হচ্ছে বস্তুবাদে বিশ্বাসী ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি আনুগত্যের, যা ইসলামের বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সেই ধারাবাহিকতায় সরকার ইসলামকে তাদের কথিত সমাজতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে উদ্যোগী হয়েছে। এর অংশ হিসেবেই মুসলিমদের ওপর ধরপাকড়ের পাশাপাশি চীন থেকে আরবি ভাষা ও ইসলামি প্রতীক মুছে দিতে উদ্যোগ নিয়েছে বেইজিং।

/এমপি/

লাইভ

টপ