কীভাবে কাশ্মিরে ‘স্বাভাবিকতা’ ফিরিয়ে আনছে ভারত?

Send
রঞ্জন বসু, দিল্লি প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১২:২৮, নভেম্বর ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:১৬, নভেম্বর ২২, ২০১৯

ভারত-শাসিত কাশ্মির থেকে ৩৭০ ধারা বাতিলের ১০০ দিন পার করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পার্লামেন্টে দাবি করেছেন, সেখানকার পরিস্থিতি এখন ‘পুরোপুরি স্বাভাবিক’। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বাস্তবতা হলো, বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর কাশ্মিরে যে ধরনের প্রতিরোধ আর বিক্ষোভের আশঙ্কা করা হচ্ছিল, তেমন কিছু ঘটেনি। এর কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে দুই বিশ্লেষক বাংলা ট্রিবিউনকে ২ লাখ অতিরিক্ত সেনা-মোতায়েনের প্রভাবের কথা বলেছেন। তবে এটাকেই তারা পরিস্থিতির স্বাভাবিকতা বজায় থাকার একমাত্র কারণ মনে করছেন না।

বিশ্লেষকরা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ৩৭০ ধারা বিলোপের বিষয়টির প্রভাব নিয়ে কাশ্মিরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধারণা স্বচ্ছ নয়। এদিকে বিজেপি সরকার তাদের প্রচারণার মধ্য দিয়ে কাশ্মিরবাসীকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে, বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর টাটা-বিড়লার মতো বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কাশ্মিরে বিনিয়োগ করলে স্থানীয়রাও তার সুফল ভোগ করতে পারবে। রাজ্যে সরকারি বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। এরসঙ্গে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দুই মুসলিম সংগঠনের সমর্থন। তাছাড়া কাশ্মিরের স্থানীয় রাজনীতিকদের প্রতি জনতার আস্থার অভাবও কাজ করছে পরিস্থিতিকে স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার ক্ষেত্রে।

চলতি বছরের ৫ আগস্ট ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মধ্য দিয়ে কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার ও বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেয় বিজেপি নেতৃত্বাধীন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। এরপর কারফিউ জারি করে সেখানে বিপুল পরিমাণে সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি সীমিত করা হয় ইন্টারনেট ও টেলিফোন সেবা। রুদ্ধ করা হয় সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার। আটক করা হয় শত শত নেতাকর্মীকে। এ ঘটনায় কাশ্মিরবাসীর দিক থেকে বিক্ষোভ-প্রতিরোধ শুরু হলেও আস্তে আস্তে তা থিতু হয়ে আসতে শুরু করে। ঘটনার ১০০ দিন পর বুধবার পার্লামেন্টে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কাশ্মির পরিস্থিতিকে ‘পুরোপুরি স্বাভাবিক’ দাবি করে অচিরেই সেখানে পুনরায় ইন্টারনেট পরিষেবা চালুর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।

স্বভাবতই অমিত শাহ-র এই মন্তব্য নিয়ে ভারতে ও বাইরে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। আচমকা বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার পর কাশ্মির ‘ক্ষোভে ফুঁসছে’ বলে বহু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রিপোর্ট করেছিল, সেখানে এতো তাড়াতাড়ি কীভাবে ‘স্বাভাবিকতা’ ফিরে আসতে পারে এটা অনেকের কাছেই একটা বড় প্রশ্ন। আশঙ্কা করা হচ্ছিলো, দশ মিনিটের জন্য কারফিউ তুলে নেওয়া হলেই পুরো কাশ্মির পথে নেমে আসবে। অথচ কারফিউ প্রত্যাহারের প্রায় দুই মাস পরেও সেখানে বড় আকারের তেমন কোনও বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ সমাবেশ হয়নি। বরং সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান সাক্ষ্য দিচ্ছে, অনেক দিক থেকেই ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের পরিবেশ এ বছর অনেক বেশি ‘শান্তিপূর্ণ’।

গত মাস থেকে আবারও কাশ্মিরের দরজা পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। শ্রীনগর-সহ বিভিন্ন স্থানে এখন সকাল-বিকাল দোকানপাট খুলছে, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের রুটিনও অনেকটাই ফিরে এসেছে। স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম হলেও সেগুলো খুলে গেছে বেশ কিছুদিন আগেই। কাশ্মির বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরে শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেটও ব্যবহার করতে পারছেন। এমনকী কাশ্মিরের অর্চার্ডগুলো থেকে অবশেষে আপেল আসাও শুরু হয়ে গেছে বাকি দেশের বাজারে।

৩৭০ ধারা বিলোপের পর কাশ্মিরে যে ‘অগ্ন্যুৎপাত’ ঘটবে বলে ভাবা হয়েছিল তা এতো তাড়াতাড়ি কীভাবে প্রশমিত করা গেল? নাকি এটাকেও এক ধরনের ‘ঝড়ের আগের স্তব্ধতা’ বলে ধরে নেওয়া যায়? বাংলা ট্রিবিউনকে এ ব্যাপারে বলেছেন ভারতের দুজন শীর্ষস্থানীয় স্ট্র্যাটেজিক অ্যানালিস্ট। সাবেক মেজর জেনারেল গগনদীপ বক্সি আর ‘কে ফাইলস’ বইটির লেখক ও কাশ্মিরি গবেষক বশির আসাদ যে বক্তব্য তুলে ধরছেন তা এরকম:

(ক) আসলে ৩৭০ ধারা বিলুপ্ত হলে কাশ্মিরের লাভক্ষতি কী হবে, তা নিয়ে অনেকেরই পরিষ্কার কোনও ধারণা ছিল না বা এখনও নেই। কাশ্মিরের ওই মর্যাদা কেড়ে নেওয়া হলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের সেতু আরও নড়বড়ে হয়ে যাবে কিংবা এটা এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা – এই ধরনের কথা তারা অনেকে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন ঠিকই, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেছে খুব বেশি কোনও পরিবর্তন এতে হয়নি। যেমন, কাশ্মিরের বাইরে বিহার-উত্তরপ্রদেশ-বাংলা থেকে অভিবাসী শ্রমিকরা আগেও সেখানে যেতেন – এখনও সেখানে যেতে পারবেন। আর ভারতে টাটা-বিড়লা-আম্বানি-আদানির মতো বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী কাশ্মিরে গিয়ে বিনিয়োগ করলে তাতে যে সেখানকার বাসিন্দাদের লাভও কম নয়, এই ন্যারেটিভটাও সরকার ধীরে ধীরে বোঝাতে সক্ষম হচ্ছে।

(খ) ভারতের অন্তত দুটি প্রভাবশালী মুসলিম সংগঠন প্রকাশ্যেই কাশ্মিরে ভারত সরকারের সিদ্ধান্তকে জোরালো সমর্থন জানিয়েছে। জমিয়ত উলেমা-ই-হিন্দের মতো ঐতিহ্যবাহী সংগঠনের জেনারেল কাউন্সিল সেপ্টেম্বরেই সর্বসম্মত প্রস্তাব নিয়ে বলেছে, কাশ্মির ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং সেখানকার অধিবাসীরাও ভারতীয়দেরই সহ-নাগরিক। আজমির শরিফ দরগার আধ্যাত্মিক নেতা সৈয়দ সালমান চিস্তিও সেপ্টেম্বরে জেনেভাতে এক জনসভায় ভারতের এই পদক্ষেপকে ‘বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত’ বলে বর্ণনা করেছেন এবং এর ফলে কাশ্মিরের মুসলিমদের জন্য নতুন আর্থসামাজিক দিগন্ত খুলে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন। ভারতে মুসলিম সমাজের বিশিষ্ট নেতারা অনেকেই যেহেতু এর সমর্থনে এগিয়ে আসছে, তাই ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে (জম্মু ও কাশ্মির) তার একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ছেই।

গ) একদিকে লাদাখ ও অন্য দিকে জম্মু ও কাশ্মির – এই দুটি নতুন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গঠিত হওয়ার পর সেখানে ভারতের আর্থিক সহায়তা বেড়ে গেছে বহুগুণ। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, কাশ্মিরে যেন ভারত এখন ‘স্রোতের মতো টাকা পাম্প করছে’। ২৬টি মূল সরকারি প্রকল্পের ক্ষেত্রে অন্য রাজ্যে কেন্দ্রীয় সরকার সচরাচর ৬০% অর্থ সহায়তা দেয় – কিন্তু এখানে দেওয়া হচ্ছে ৯০%। অন্যদিকে সপ্তম বেতন কমিশনের আওতায় কাশ্মিরে সরকারি কর্মচারীরা বর্ধিত হারে বেতন পেতেও শুরু করেছেন। নতুন রাস্তা বানানো, প্রত্যন্ত গ্রামেও বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া, কৃষিখাতে সহায়তা বাড়াতে জলের মতো টাকা খরচ করা হচ্ছে।

(ঘ) কাশ্মির নিয়ে দুনিয়াজুড়ে তর্কবিতর্কের মধ্যেই প্রায় নীরবে সেখানে গত মাসের ২৪ তারিখ ব্লক ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে, ভোট পড়েছে ৯৮ শতাংশ। স্থানীয় সরকার কাঠামোর কোনও পর্যায়ের নির্বাচনেই কাশ্মিরে এমন বিপুল ভোট পড়ার ঘটনা বিরল – আর সেখানে এই ৩৭০-পরবর্তী জমানাতেও এ জিনিস তো প্রায় অভাবনীয়। আসলে বাকি দেশের নির্বাচনি আইনকানুনও এতদিন কাশ্মিরে বলবৎ হত না, কিন্তু এখন সেটাও হবে। যেমন, বাকি ভারতের মতো এখন থেকে কাশ্মিরেও স্থানীয় সরকার কাঠামোয় ৩০ শতাংশ আসন নারীদের জন্য সংরিক্ষত হবে – এই নতুন বিধান কাশ্মিরের নারীদের মধ্যে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা সঞ্চার করেছে বলে অনেকেই মনে করছেন।

(ঙ) বশির আসাদ ও গগনদীপ বক্সি আরও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহ বা তার ছেলে ওমর আবদুল্লাহ, কিংবা মেহবুবা মুফতির মতো কাশ্মিরি নেতা-নেত্রীরা বন্দি থাকলেও তাদের মুক্তির জন্য কেউ কিন্তু সেখানে ‘একটা পাথর পর্যন্ত ছোড়েনি’! তারা বলছেন, ‘এটাই বুঝিয়ে দেয় কাশ্মিরে এতোদিন ধরে যারা নিজেদেরকে জনগণের প্রতিনিধি বলে দাবি করে এসেছেন তাদের জনভিত্তি আসলে কতটা দুর্বল’। ফলে এখন ‘নতুন কাশ্মিরে’ সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব উঠে আসবে বলেও পর্যবেক্ষকদের অনেকেরই ধারণা।

এসবের বাইরেও পুরো জম্মু ও কাশ্মির জুড়ে ভারত যে প্রায় দুই লাখ বাড়তি সেনা মোতায়েন করেছিল, তারও যে একটা প্রভাব পড়েছে সেটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন ওই দুই বিশ্লেষক। তবে কাশ্মিরের ইতিহাসকে সাক্ষী করে তারা বলেছেন, ‘কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে সেখানকার ক্ষোভ-বিক্ষোভকে কখনও চাপা দেওয়া যায়নি।’

‘তবে তারপরেও বলব গত সাড়ে তিন মাসে সেখানে যে অস্বাভাবিক শান্ত পরিবেশ দেখা গেছে তাতে মনে করা যেতেই পারে পোস্ট-থ্রি সেভেন্টি (৩৭০ পরবর্তী যুগে) সেখানে নতুন কোনও কেমিস্ট্রি হয়তো কাজ করছে!’, বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন বহু-প্রশংসিত ‘কে ফাইলস’ বইয়ের লেখক বশির আসাদ।

/এমএইচ/বিএ/

লাইভ

টপ