দিল্লি জামিয়ার সমর্থনে ভারতে ছাত্র বিক্ষোভে উত্তাল এক রাত

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১০:৫৮, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:১৯, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৯

দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের হামলার প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে ভারতের ছাত্র সমাজ। শুধু ছাত্ররাই নয়, রবিবার রাতে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন ভারতের বিভিন্ন স্থানের নানা স্তর ও ধর্মের লোকজন। বিতর্কিত নতুন নাগরিকত্ব আইনবিরোধী বিক্ষোভ রূপ নিয়েছে গণআন্দোলনে। আর এতে অগ্রণী ভূমিকায় রয়েছে ছাত্ররাই। জামিয়ায় শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার খবর ছড়িয়ে পড়তেই সন্ধ্যা বিক্ষোভ শুরু হয় দিল্লির জওহরলাল নেহরু  থেকে শুরু করে কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। মধ্যরাতেই গর্জে ওঠেন হায়দ্রাবাদের মৌলানা আজাদ উর্দু বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও।

বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকে নিপীড়নের মুখে ভারতে পালিয়ে যাওয়া হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টানদের নাগরিকত্ব নিশ্চিতে সম্প্রতি আইন সংশোধন করেছে ভারত। ১২ ডিসেম্বর রাতে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পরেই আইনে পরিণত হয়েছে বিতর্কিত বিলটি। তারপর থেকেই সহিংসতা বেড়েছে সমগ্র ভারতে। আসামসহ ত্রিপুরা ও মেঘালয়ে অবৈধ অবৈধ অভিবাসীদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি বাতিল ও এই অঞ্চলকে ওই আইনের আওতামুক্ত করার দাবিতে বিক্ষোভ করছে তারা। এসব অঞ্চলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কারফিউ জারিসহ বিভিন্ন স্থানে মোবাইল ইন্টারনেট ও এসএমএস সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলাতে সংঘর্ষের পর এবার দিল্লিতে তা ছড়িয়ে পড়ল।

রবিবার নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল ঘিরে উত্তাল হয়ে ওঠে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেখানে পুলিশ গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ শুরু হয়। সন্ধ্যায় শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে যন্তর মন্তর যেতে চেয়েছিল। কিন্তু পুলিশির বাধায় তা সহিংস রূপ নেয়। ছাত্র-জনতার সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের জেরে পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। বাস ও মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছাড়াও আহত হন বেশ কিছু পুলিশ সদস্য। 

পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি না দিয়েই ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়ে পুলিশ। জামিয়ার ক্যাম্পাসের মধ্যে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হয়। সে সময় বহু ছাত্রছাত্রী সেখানে পড়াশোনা করছিলেন। তাদের অনেকেই পুলিশের লাঠি ও কাঁদানে গ্যাসে আহত হন। অভিযোগ, শৌচাগারে ঢুকেও শিক্ষার্থীদের যথেচ্ছ পিটিয়েছে পুলিশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীদেরও বেধড়ক লাঠিপেটা করা হয়। লাইব্রেরির বাইরের ছাত্রছাত্রীদের মাথার উপরে হাত তুলে লাইন দিয়ে হাঁটিয়ে ক্যাম্পাস থেকে বার করে দেওয়া হয়। জামিয়ার বেশ কয়েক জন ছাত্রছাত্রীকে পুলিশ আটক করে বলে অভিযোগ।

জামিয়ার এক ছাত্রকে টেনে এনে মাটিতে ফেলে লাঠি দিয়ে পেটানোর ভিডিও-ও ভাইরাল হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। জামিয়া মিলিয়াতে গুলিও চলেছে বলে খবর এসেছে। এক ছাত্রের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও, রাত পর্যন্ত তা নিশ্চিত করা যায়নি।

এই ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে ফুঁসে উঠেন ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ছাত্রদের ওপর পুলিশি হামলার প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসেন তারা। জেএনইউসহ দিল্লির বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ভিড় করতে থাকেন দিল্লি পুলিশের সদর দফতরের সামনে। শীতের রাতেও রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে চলে ঘেরাও কর্মসূচী। দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, ভোর সাড়ে তিনটে নাগাদ আটক করা সব শিক্ষার্থীদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এরপরেই দিল্লি পুলিশের সদর দফতরের বাইরের বিক্ষোভকারী জনতাও ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় ।

শুধু দিল্লি নয়। রাত যত বেড়েছে, সোশ্যাল মিডিয়া ছেয়ে গিয়েছে বিভিন্ন রাজ্যের ছবি-ভিডিওতে। পথে নেমেছে হায়দ্রাবাদের মৌলানা আজাদ উর্দু ইউনিভার্সিটি, বেনারসের হিন্দু ইউনিভার্সিটি, বম্বে আইআইটি। পথে নেমেছে কেরালার ছাত্র সংগঠন। বাদ ছিল না কলকাতাও। আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজপথ ভরিয়েছে মশাল জ্বেলে।

দেশজুড়ে পথে নামা এই বিপুল ছাত্রছাত্রীর কণ্ঠে শোনা গিয়েছে একটাই দাবি। জামিয়া মিলিয়ায় যে বর্বরোচিত আক্রমণ চলেছে ছাত্রছাত্রীদের উপর, তার বিচার চাই। আটক করা শিক্ষার্থীদের নিঃশর্ত মুক্তি।  

এ সবের মধ্যে জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হয়েছে বলে রাত পর্যন্ত ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। ক্যাম্পাসে পুলিশ ঢুকে একাধিক শিক্ষার্থীকে নির্যাতন করেছে। এমনকি মেয়েদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে ছাত্রদের একাংশ।

এই সহিংস বিক্ষোভের নিন্দা করেছেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। একটি টুইটে তিনি লিখেছেন, ‘মাননীয় লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাহেবের সঙ্গে কথা বলেছি এবং তাকে স্বাভাবিকতা ও শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য সবরকম পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেছি। আমরা যথাসাধ্য চেষ্টাও করছি। সহিংসতার পিছনে থাকা আসল দোষীদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়া হবে।

নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে দিল্লি, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে চলছে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ। আইনটির বিরুদ্ধে প্রথমে আসামে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হলেও পরে তা ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসে। রবিবার ঝাড়খণ্ডের একটি নির্বাচনি সমাবেশ থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আসামের মানুষকে ‘সহিংসতা থেকে দূরে থাকার’ জন্য শুভেচ্ছা জানান। সূত্র: এনডিটিভি, দ্য ওয়াল

বিদেশ

লাইভ

টপ
X