রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ফেরাতে চীনের ‘মানবিক উদ্যোগ’ ব্যর্থ

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ২১:২৫, জানুয়ারি ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:২৭, জানুয়ারি ২০, ২০২০

মিয়ানমারের পশ্চিমে এক কর্দমাক্ত পথে হেঁটে যাওয়ার সময় শত শত চীনা কন্টেইনার চোখে পড়ে। বছর দুয়েক আগে এই কন্টেইনারগুলো রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য পাঠিয়েছিল চীন। প্রত্যাবাসন চুক্তির পর বাংলাদেশ থেকে ফিরে এসে রোহিঙ্গাদের থাকার জন্য এই ব্যবস্থা। কিন্তু এতদিনেও কোনও রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয়নি সেখানে। বাংলাদেশ থেকে রাখাইনে ফিরে যেতে রাজি হয়নি কোনও রোহিঙ্গা। তবে ‘মানবিক দায়িত্ব’ থেকে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছে চীন। বেইজিং এমন দাবি করলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন আসলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মাঝে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে। যদিও এখন পর্যন্ত তাদের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে কোনও রোহিঙ্গা ফিরে না যাওয়ায়। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।   

 

জাতিগত নিধন ও গণহত্যার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়। একই বছরের জুনে নেপিদোতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মধ্যেও সমঝোতা চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী দুই দফায় রোহিঙ্গা প্রত্যর্পণের তারিখ নির্ধারিত হলেও এখনও ওই চুক্তির আওতায় একজন রোহিঙ্গাও দেশে ফিরে যায়নি।  

রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, রাখাইনের মংডু শহরের কাছেই কন্টেইনারগুলো পড়ে আছে। চীনের প্রচেষ্টা থাকলেও মিয়ানমারে এখনও কোনও রোহিঙ্গা ফিরে যায়নি। এই সংকট সমাধানে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে চীন। কিন্তু ইন্দোনেশিয়া কিংবা জাতিসংঘের মতো ভূমিকা রাখছে না তারা। কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে চীন। আর এতে করে সংকট সমাধানের কোনও আলো দেখা যাচ্ছে না।

প্রত্যাবাসন আটকে যাওয়ার মূল কারণ হচ্ছে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। মিয়ানমারের দাবি, তারা রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করেছে। তবে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের মতে, এখনও সেখানে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। আর রোহিঙ্গারাও নাগরিকত্ব অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সেখানে যেতে চায় না।

বিগত দুই বছরে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে তিনটি বৈঠকে মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছে চীন। বাংলাদেশে একাধিকবার রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেছেন দেশটির কর্মকর্তারা। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। চীন যদিও দাবি করছে, তাদের আালোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনও রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরে যায়নি।

তবে শুক্রবার চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মিয়ানমার সফর নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম হয়েছে। দুইদিনের এই সফরে রোহিঙ্গা নিয়ে আলাপ হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। তবে সফরে এই বিষয়ে নিয়ে তেমন কোনও আলোচনা হয়নি। চীনও বারবার নিজেদের মধ্যস্থতার আগ্রহের কথা জানিয়ে আসছে। তবে মিয়ানমার সফরে শি জিনপিংয়ের মূল উদ্দেশ্য ছিল সেখানকার অবকাঠামোতে বিনিয়োগ। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে মিয়ানমার। বাণিজ্য ও অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে তাদের একাধিতক দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

ভারত ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মাঝামাঝি হওয়ায় মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চল চীনের জন্য ভৌগলিক ও কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকে ভারত সাগর ও বঙ্গোপসাগরের মাধ্যমে বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে পারবে তারা। চীনের উপ পররাষ্ট্র্রমন্ত্রী লু জাউতি বলেন, ‘আমরা চীন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রত্যাবাসন নিয়ে তিনটি বৈঠক করেছি। আমাদের চেষ্টা সফল হয়েছে’।

তবে বাংলাদেশি কর্মকর্তা, মিয়ানমারের কূটনীতিক ও নিরপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীন আসলে রাখাইনে তাদের  নিজের স্বার্থ নিয়েই বেশি ব্যস্ত। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলাপকালে চীনা কর্মকর্তারা মানবিক সংকট সমাধানের চেয়ে কীভাবে রাখাইনের উন্নয়ন করা যায় সেই বিষয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন।

বাংলাদেশি এক কর্মকর্তা বলেন, ‘চীন সংকটের সমাধান চায়। অন্তত তারা চায় যেনও প্রত্যাবাসন দ্রুত শুরু হয়। কিন্তু তারা মিয়ানমারকে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ নিশ্চিত করার ব্যাপারে কিছু বলছে না।

ইয়াঙ্গুনের অবস্থানরত জাতিসংঘের কর্মকর্তা ও কূটনীতিকরাও বলছেন, চীনের চেষ্টায় আসলে মানবিক সংকট সমাধানের আভাস নেই। ইয়াঙ্গুনের এক কূটনীতিক বলেন, তাদের পদক্ষেপ খুবই সরল। আমরা শুনছি, চীন প্রত্যাবাসন সফল করার জন্য মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে চাপ দিচ্ছে। কিন্তু সেখানে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি ব্যাপারে কিছু বলছে না। 

এই অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলেও রয়টার্সের প্রশ্নে সাড়া দেয়নি চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে মিয়ানমার সরকার দাবি করেছে, চীন ইতিবাচক চেষ্টাই করছে। চীনের সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা কো কো নাইং বলেন, চীন তাদের সাহায্য অব্যাহত রেখেছে। সামাজিত পরিস্থিতির দিকে নজর দেওয়ার চেয়ে উন্নয়ন বেশি জরুরি। আমরা সেখোনে অনেক বিনিয়োগ করেছি। সেখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন আগের চেয়ে ভালো। 

অনিশ্চিত প্রত্যাবাসন

২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে আসলেও অনেকেই রাখাইনের শরণার্থী শিবিরে রয়েছেন। বন্দি শিবিরে আটক এই রোহিঙ্গারা চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত। সরকার ও সশস্ত্র গোষ্ঠী সংঘর্ষে প্রায়ই তাদের আতঙ্কে থাকতে হয়। রাখাইনে এমন পরিস্থিতির পরও চীন রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলছে। এছাড়া বাংলাদেশ ও মিয়ামারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে তারা জাতিসংঘের গুরুত্বকে এড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে অবিরত কাজ করে যাচ্ছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা।

চীন দাবি করছে, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সঙ্গে তারা মানবিক স্বার্থে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, তারা শুধু ভৌগলিকভাবে শক্তি বৃদ্ধি করতে চায়। ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা স্টিমসন সেন্টারর পূর্ব এশিয়া প্রকল্পের সহ-পরিচালক ইউন সান বলেন, ‘আমি বলতে চাই. চীন আসলে মানবিক কারণে রোহিঙ্গা সংকটে মধ্যস্থতা করছে না। বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থেই যুক্ত হয়েছে’। তিনি আরও বলেন, ‘চীন এই অঞ্চলের নতুন শান্তি মধ্যস্থতাকারী হতে চায়। যেখানে পশ্চিমা শক্তি ব্যর্থ হয়েছে সেখানেই এগিয়ে আসতে চায় তারা।

কুতুপালং শিবিরের রোহিঙ্গা নেতা নওখিম বলেন, সাধারণত রোহিঙ্গারা মনে করে চীন মিয়ানমারকে খুব চাপ দিচ্ছে না এবং তাদের দাবি মানতে সহায়তা করছে না।

শরণার্থী নেতা ও চীনা কূটনীতিকদের এক বৈঠকের ভিডিও বিশ্লেষণ করে রয়টার্স জানায়, চীনা কর্মকর্তারা রোহিঙ্গাদের চাপ দিচ্ছে যেন তারা মিয়ানমারের কাছে জাতিগোষ্ঠীর পরিচয়ের দাবি তুলে নেয়। নওখিম বলেন, ‘তারা সহজে আমাদের সমস্যার সমাধান করবে না। তারা শুধু দেখাতে চায় যে, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে তাদের কথা হচ্ছে।’

ব্যর্থ প্রচেষ্টা

গত বছর আগস্টে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর সর্বশেষ চেষ্টা করে চীন। ওই সময় ৩ হাজার রোহিঙ্গার একটি তালিকা দেয় মিয়ানমার। কিন্তু তালিকায় নাম দেখে শত শত রোহিঙ্গা আত্মগোপনে চলে যায়। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানায় তারা। ফলে আবারও ব্যর্থ হয়ে প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টা।

ওই সময় এক রোহিঙ্গা শিবিরের সামনে দাঁড়িয়ে চীনা কূটনীতিক বলেন, রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে কাউকে প্রথম ধাপ নিতে হবে। মিয়ানমার কর্মকর্তারা সীমান্তের ওপাশে অপেক্ষা করলেও এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাও স্বেচ্ছায় ফিরে যেত চায়নি। মিয়ানমারের দাবি, আলাদাভাবে এখন পর্যন্ত ৪০০ রোহিঙ্গা রাখাইনে গেছে।

চীন অবশ্য প্রস্তাব দিয়েছিল, রোহিঙ্গারা চাইলে যেন রাখাইনে গিয়ে পরিস্থিতি দেখে আসতে পারে। তবে সেটাতে রাজি হয়নি মিয়ানমার। চীনা কন্টেইনারগুলোর দায়িত্বে থাকা স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘এটাতে কোনও লাভ নেই। গত দুই বছরে এখানে কউ থাকতে আসেনি। আমি এই বছর থেকে কাজটি ছেড়ে দেব। পরিস্থিতি পাল্টায়নি।’

 

/এমএইচ/এএ/

লাইভ

টপ