দিল্লিতে সংঘর্ষ: দায়মুক্ত উন্মত্ত হিন্দুত্ববাদীরা, নীরব দর্শক পুলিশ

দিল্লিতে সংঘর্ষ: দায়মুক্ত উন্মত্ত হিন্দুত্ববাদীরা, নীরব দর্শক পুলিশ

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ০০:৪৭, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:৫৪, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২০

মৌজপুর-বাবরপুর চকে হিন্দুত্ববাদী জনতা ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির নেতা জয় বাগবান গোয়ালের চারপাশে জড়ো হয়েছেন। মুসলিমদের বিরুদ্ধে চড়াও হওয়ার আগে তিনি শতাধিক মানুষের একটি মিছিলে নেতৃত্ব দেন। ৬০ বছর বয়সী গেরুয়া নেতা ঘোষণা দেন, 'তোমরা যদি এখানে থাকতে চাও,  তাহলে তোমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে'। যদিও কর্মীদের ‘জয় শ্রী রাম’ ও ‘হার হার মহাদেব’ স্লোগানে তার ঘোষণা স্পষ্ট শোনা যায়নি।

এক সমর্থক বলেন, 'আমাদের চারপাশে মুসলিমরা ঘিরে রয়েছে। আমাদের বাঁচতে হলে লড়াই করতে হবে'। গোয়াল নিজেও জড়ো হওয়া হিন্দুদের মুসলিমদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করার চেষ্টা করলেও তার সমর্থকরা ছিলেন আরও এগিয়ে।

সোমবার থেকে দিল্লির উত্তর-পূর্ব এলাকার বিভিন্ন অংশে বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার অঞ্চলটির পুরো জনতা ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। মুসলিমরা জড়ো হন তাদের অধ্যুষিত এলাকায়, রাজনৈতিক ছত্রছায়ার দাঙ্গাবাজরা ছাড়া হিন্দুরাও নিজেদের ঘরে আবদ্ধ করে রাখেন।

দাঙ্গা পোশাক পরিহিত ওই এলাকায় নিরাপত্তায় নিয়োজিত এক পুলিশ সদস্যদের এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেন, এখানে কি ১৪৪ ধারা জারি করা হয়নি?

তিনি জবাব দেন, হ্যাঁ।

সাংবাদিক আবার জিজ্ঞেস করেন, তাহলে বিজেপি নেতা কীভাবে মিছিল বের করলেন?

পুলিশ সদস্য জবাব দেন, আমি জানি না।

গোয়াল ও তার সমর্থকরা যে আতঙ্কজনক ডাক দিয়েছেন তাতে  কোনও বিশ্লেষক বিহ্বল হবেন। জাফরাবাদ ও মৌজপুর মেট্রো স্টেশনের দূরত্ব এক কিলোমিটারের চেয়ে কম। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া জাফরাবাদে রাজনৈতিক মেরুকরণ এমন চরম অবস্থায় পৌঁছেছে যা ভারতের রাজধানীতে এর আগে কখনও দেখা যায়নি।

জাফরাবাদ মেট্রো স্টেশনের আশেপাশের এলাকায় মুসলমানদের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। কিন্তু মঙ্গলবার বিক্ষোভকারী মুসলিমদের বেশিরভাগই ছিলেন চুপচাপ। এক বিক্ষোভকারী বলেন, 'আমাদের লক্ষ্য হলো সিএএ-র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা। হিন্দু ভাই ও বোনদের বিরুদ্ধে সংঘাতের কোনও ইচ্ছে আমাদের নেই'।

হিন্দুত্ববাদীদের কারণে পরিস্থিতি সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় রূপ নিতে পারে কিনা জানতে চাইলে ওই বিক্ষোভকারী বলেন, 'মিথ্যা বলব না। গতকাল যখন হিন্দু জনতা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে, আমাদের বিক্ষোভ থেকেও কয়েকজন তরুণ একইভাবে পাল্টা ইট-পাটকেল ছুড়ে। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। কিন্তু আজ আমরা যে কোনও ধরনের সহিংসতা এড়াতে বদ্ধ পরিকর।'

মাত্র কয়েক জন পুলিশের নিরাপত্তার মধ্যেও বিক্ষোভকারীরা সিএএবিরোধী স্লোগান দেন। অনেকগুলো মাইক থেকে বিক্ষোভকারীদের যে কোনও সহিংসতামূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকতে বলা হয়।

বিপরীত অবস্থা ছিল মৌজপুর স্টেশনে।  এলাকাটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে উন্মত্ত হিন্দুত্ববাদী জনতা। কেউ আসলে তাকে ‘জয় শ্রী রাম’ বড় একটি প্ল্যাকার্ড দিয়ে স্বাগত জানানো হচ্ছে। তরুণদের হাতে লাঠি, টিউবলাইট অথবা পিভিসি পাইপ। সেখানে মোতায়েন করা দিল্লি পুলিশের একটি ছোট ব্যাটালিয়নের সামনে তারা এগুলো নিয়ে শক্তি প্রদর্শন করছে। বিশৃঙ্খল জনতা উন্মত্ত হলেও পুলিশ সেখানে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। তারা বরং সন্দেহভরা দৃষ্টিতে খুঁজছিল সাংবাদিকদের। যখনই কেউ ছবি তুলতে বা ভিডিও ধারণ করতে যাচ্ছিল তারা ওই সাংবাদিকের ফোন কেড়ে নেয়, ছবিগুলো মুছে ফেলে এবং মারধরের হুমকি দেয়।

পুলিশ সাংবাদিকদের উত্তেজিত জনতার কাছ থেকে দূরে থাকতে বলছিল। যদিও এই দূরত্ব মাত্র ২০ মিটারের মতো। কিন্তু ১৪৪ ধারা জারি থাকতে কীভাবে জনতা জড়ো হলো সেই প্রশ্নের কোনও জবাব দিচ্ছিল না পুলিশ।

জন্মসূত্রে নিজের হিন্দুত্ববাদের পরিচয় দেওয়ার পর ৩০ বছরের কাছাকাছি এক হিন্দু ব্যক্তি বলেন, ‘আমাদের চারপাশে জঙ্গিরা ঘিরে আছে। তারা শুধু লাঠির ভাষা বুঝে।’ একই সময়ে সেখানে দাঁড়ানো এক মুসলিম সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।

কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি আরও গরম হয়ে ওঠে বিভিন্ন অংশে জয় শ্রী রাম স্লোগানে প্রকম্পিত হলে। সম্প্রতি মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় এই স্লোগানটাই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। স্পষ্টতই মুসলমানদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক স্লোগান ধ্বনিত হতে থাকলে অল্প কয়েকজন পুলিশ জনতাদের ছত্রভঙ্গ করতে মাঝে মাঝে টিয়ার গ্যাস ছুঁড়ছিল।

আরেক দিকে গেরুয়া পোশাক পর মধ্যবয়সী এক বয়সী নারী বাবরপুরের সড়কে ছিলেন। এখানে হিন্দুদের বসবাস বেশি। তিনি সেখানে মুসলমানদের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের মধ্য থেকে আরও মানুষ সংগ্রহ করার চেষ্টা করছিলেন। সহিংসতায় অংশ নিতে জড়ো হওয়া কয়েকজনের মধ্যে এক ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর নামে স্লোগান দিতে চাইলে ওই নারী তাকে বলেন, ‘মনে রেখো, মোদি মোদি বলবে না। শুধু জয় শ্রী রাম’।

পুলিশের কাছে বারবার হামলার খবর দেওয়ার পরও উত্তেজিত জনতা মৌজপুর মেট্রো স্টেশন ছাড়িয়ে যায়। অনেকেই শুনেছেন হয়ত টিয়ার গ্যাস ছোড়ার শব্দ অথবা দূর থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডুলি দেখা গেছে। 

উত্তর-পূর্ব দিল্লির বেশিরভাগ দোকান মঙ্গলবার বন্ধ ছিল। জাফরাবাদ থেকে মৌজপুর মেট্রো স্টেশনের দূরত্ব স্পষ্ট দেখিয়ে দেয় সোমবার যে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। জাফরাবাদ এলাকার মুসলমানদের মালিকানাধীন বেশিরভাগ দোকান জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাস্তাগুলো ছেয়ে গেছে নিক্ষেপ করা পাথর, ইট ও কাঁচে।

প্রায় দুই মাস হলো মুসলিম নারী ও পুরুষদের একটি গোষ্ঠী জাফরাবাদে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করছেন। যদিও তিনদিন আগে এদের মধ্যে একটি গোষ্ঠী সিদ্ধান্ত নেয় ধর্ণা আর যথেষ্ট নয়। তারা জাফরাবাদ মেট্রো স্টেশনের আরেকটি সড়কে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে রাস্তা অবরোধ করে।

এরপরই সম্প্রতি নির্বাচনে হেরে যাওয়া বিজেপি নেতা কপিশ মিশরাসহ হিন্দুত্ববাদী নেতারা দিল্লি পুলিশ ও সরকারকে হুমকি দিতে শুরু করেন। তারা বলতে থাকেন, সিএএবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সড়ক থেকে সহিংস উপায়ে তুলে দিতে দ্বিধা করবে না।

সামাজিক আন্দোলনকারী ওভাইস সুলতান খান বলেন, বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার পর অনেক উদ্যোগের পর হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়কে শান্ত করা হয়েছিল। সিলামপুর ও আশেপাশের সড়ক ভারতের সমন্বিত সংস্কৃতির ধারক ছিল। সব শেষ। এমনকি আমাদের হিন্দু প্রতিবেশীও আমাদের সন্দেহের চোখে দেখেন।

দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে কয়েক বছর লাগতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

উল্লেখ্য, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) নিয়ে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) শুরু হওয়া সংঘাত মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) আরও সহিংস হয়েছে। গত দুই দিনে উত্তর-পূর্ব দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩ জনে দাঁড়িয়েছে। ৭০ জন গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন দেড়শতাধিক মানুষ। ভজনপুর, চান্দবাগ, কারায়াল নগরসহ বিভিন্ন এলাকায় লাঠি ও রড হাতে রাস্তায় টহল দিচ্ছে সশস্ত্র ব্যক্তিরা। জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন দোকানপাট ও যানবাহন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনা মোতায়েনে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাদের দাবি, মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। সূত্র: দ্য ওয়্যার।

 

/এএ/

লাইভ

টপ