দিল্লির দাঙ্গায় নিহতদের ধর্মীয় পরিচয় গোপনের চেষ্টা?

Send
রঞ্জন বসু, দিল্লি
প্রকাশিত : ০৭:৪৫, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪১, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২০

উত্তর প্রদেশের বুলন্দ শহরের মেয়ে শাজিয়া তাকিয়ে ছিল নির্নিমেষে, ফ্যালফ্যাল করে। মাত্র মাসকয়েক আগে দিল্লির অটোচালক শাহিদের সঙ্গে বিয়ের পরই তার এই শহরে পা রাখা, এখন শাজিয়ার গর্ভে শাহিদেরই তিন মাসের সন্তান। দিল্লিতে গুরু তেগবাহাদুর হাসপাতালের মর্গের সামনে সেই শাহিদের মরদেহ নেওয়ার জন্যই অপেক্ষা করছিল ওই তরুণী, যার বয়স খুব বেশি হলে সবেমাত্র কুড়ি হবে! ভারতের রাজধানীতে বহু বছরের মধ্যে বীভৎস ও নৃশংস সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় যাদের প্রাণ গেছে, শাহিদ তাদেরই একজন।এক আত্মীয়ার বাড়িতে সদ্যবিধবা শাজিয়া, গর্ভে যার তিন মাসের সন্তান

 

সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ সে যখন নিজের অটোরিকশা নিয়ে বেরিয়েছিল, একটি বুলেট এসে তাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। এক লহমায় তোলপাড় হয়ে যায় শাহিদ-সাজিয়ার ছোট্ট নতুন সংসার। কিন্তু মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সারাদিন অপেক্ষার পরও পরিবারের হাতে শাহিদের দেহ তুলে দেয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কেবল শাহিদ কেন, দাঙ্গায় নিহতদের কারও দেহই বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সকালের আগে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি। বলা হয়েছে, ময়নাতদন্ত শেষ হওয়ার আগে আর দিল্লি পুলিশের অনুমতি ছাড়া কোনও মরদেহই ছাড়া যাবে না।

পরে বুধবার আলাদাভাবে অন্তত পাঁচটি মৃতদেহ তাদের পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বলে বাংলা ট্রিবিউন জানতে পেরেছে। প্রত্যেকটাই দিনের আলাদা আলাদা সময়ে, আলাদা আলাদা গেট দিয়ে পুলিশি পাহারা দিয়ে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে—পরিবারের মাত্র এক-দুজন সদস্যের উপস্থিতিতে। তারা প্রত্যেকেই ছিলেন মুসলিম।

তেগবাহাদুর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে নিহত একজনের মরদেহ

লক্ষণীয় বিষয় হলো, হতাহতদের ধর্মীয় পরিচয় কী, তা নিয়ে প্রশাসন একেবারে মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। গুরু তেগবাহাদুর হাসপাতাল নিহতদের নাম-ধাম পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমকে জানাতে সরাসরি অস্বীকার করেছে।

তবে এদিন (বুধবার) বিকালে যখন উত্তর-পূর্ব দিল্লির তেগবাহাদুর হাসপাতালে যাই, মর্গের সামনে শুধু গোটাকয়েক মুসলিম পরিবারের ভিড়ই চোখে পড়েছে। শাজিয়া ও তার নিকটাত্মীয়রা ছিল যার অন্যতম। যে কোনও কারণেই হোক, হিন্দু পরিবারের সদস্যদের কিন্তু সেখানে একেবারেই চোখে পড়েনি।

দিল্লিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রে এই প্রতিবেদক যেটা জানতে পেরেছে তা এরকম: বুধবার রাত দশটা পর্যন্ত দাঙ্গায় মোট নিহতের সংখ্যা ২৩ জন। যার মধ্যে নিশ্চিতভাবে মুসলিম অন্তত দশজন, হিন্দু অন্তত পাঁচজন এবং একজন দিল্লি পুলিশের হেড কনস্টেবল রতন লাল। নিহত বাকি সাতজন হিন্দু না মুসলমান, তা এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

তবে এযাবৎ নিহতদের মধ্যে মুসলিমদের সংখ্যা যে অনেক বেশি (অন্তত দ্বিগুণ) তা নিয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু প্রশাসনের নীরবতাই বুঝিয়ে দিচ্ছে তারা এ ব্যাপারে কোনও তথ্য সামনে আসতে দিতে রাজি নয়।

পাশাপাশি ব্যাপক সংখ্যায় মুসলিমদের এই প্রাণহানিও এটাই প্রমাণ করছে তারা একটা পরিকল্পিত সংঘবদ্ধ আক্রমণের শিকার হয়েছে। মুসলিম মহল্লাগুলোতে বেছে বেছে মসজিদ-মাদ্রাসা বা কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে আক্রমণ চালানো হয়েছে।

তবে শেষ পর্যন্ত রবিবার বিকাল থেকে পরবর্তী বাহাত্তর ঘণ্টা ধরে দিল্লিতে যেটা হয়েছে তা পুরোদস্তুর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাই—এবং প্রাথমিক আক্রমণের ধাক্কা সামলে মুসলিমরাও তাদের সাধ্যমতো জবাব দিয়েছে গোকুলপুরী, ভজনপুরা, জাফরাবাদ, চানবাগ বা মোস্তফাবাদের মতো এলাকাগুলোয়। সেই পাল্টা হামলায় অনেক জায়গায় হিন্দুরাও মারা গেছেন।

নিহত মুবারক হোসেনের মরদেহ বাবরপুর মহল্লায় নিয়ে আসা হয়েছে

প্রতিবেদন শুরু করেছিলাম শাজিয়ার কথা দিয়ে। দিল্লিতে গত বছরের শেষ দিকে পা রাখার পর থেকে বুলন্দশহরের এই তরুণী কখনও বোরকা ছাড়া বাইরে বেরোয়নি। এমনকি বাড়িতে যৌথ পরিবারে ভাশুর ইমরানের সামনেও সে বোরকা ছাড়া আসতে অভ্যস্ত নয়। অথচ সেই ইমরানই এদিন বলেন, ‘রাস্তায় বোরকা পরে বেরোনো মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না, কারণ লোকজন মুসলিম বলে চিনে গেলে বিপদ হবে।’ রাজধানী দিল্লির একটা বিস্তীর্ণ অংশে এটাই যে এখন বাস্তবতা—মুসলিম পরিচয়ে আপনার জীবন এতটুকুও নিরাপদ নয়। অগত্যা বুধবার প্রথমবারের মতো বোরকার আড়াল ছেড়ে দিল্লিতে বেরিয়েছিল শাজিয়া—স্বামীর মৃতদেহ হাসপাতালের মর্গ থেকে ছাড়িয়ে আনতে!

/এমআর/বিএ/এমএমজে/

লাইভ

টপ