তুরস্কের সঙ্গে সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়াচ্ছে সিরিয়া?

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ০১:২৪, ফেব্রুয়ারি ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২০, মার্চ ০২, ২০২০

তুরস্ক ও সিরিয়ার মধ্যে নতুন করে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইদলিবে সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের অনুগত বাহিনী বিমান হামলা চালিয়ে ৩৩ তুর্কি সেনাকে হত্যার পর এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, তাহলে কি তুরস্কের সঙ্গে সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে রাশিয়া ও ইরানের সমর্থনপুষ্ট সিরিয়ার আসাদ বাহিনী?
আসাদ বাহিনীর ওই হত্যাকাণ্ডের পর আঙ্কারায় উচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা বৈঠকে অংশ নেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান। সিরিয়ার ২০০টি লক্ষ্যবস্তুতে স্থল ও বিমান হামলা শুরু করে তুর্কি বাহিনী। আঙ্কারা জানিয়েছে, তাদের  পাল্টা হামলায় আসাদ বাহিনীর ৩০৯ জনকে ‘নির্মূল’ করা হয়েছে। এছাড়া পাঁচটি হেলিকপ্টার, ২৩টি ট্যাংক, ২৩টি হাওইটজার এবং দুইটি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে। তুর্কি সংবাদমাধ্যমগুলোতেও আসাদের সামরিক যানে বিস্ফোরণের ছবি দেখানো হয়েছে।

এ ঘটনাকে কেন বিপদজনক বলে মনে করা হচ্ছে?

গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই সিরিয়ার সরকারি বাহিনী ইদলিব প্রদেশ পুনর্দখলের জন্য রাশিয়ার সামরিক সমর্থন নিয়ে ব্যাপক যুদ্ধ চালাচ্ছে। ইদলিব হচ্ছে সিরিয়ার ভেতরে বাশার আসাদবিরোধী বিদ্রোহীদের সবশেষ ঘাঁটি। এখানে একাধিক তুরস্ক সমর্থিত সিরিয়ান বিদ্রোহী, জিহাদি ও আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী রয়েছে। যে কারণে পরিস্থিতি জটিল আকার নিচ্ছে তা হলো, তুরস্ক হচ্ছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। অন্যদিকে সিরিয়ার বাশার আসাদ সরকারের মিত্র বা প্রধান পৃষ্ঠপোষক হচ্ছে রাশিয়া। মূলত রাশিয়াই আসাদকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছে। আর এক্ষেত্রে রাশিয়া ও আসাদের মধ্যে  সমন্বয়ের কাজটি করেছে ইরান। তাই তুরস্ক আক্রান্ত হলে ইদলিবের যুদ্ধে পরাশক্তিগুলো জড়িয়ে পড়ে কিনা, সেই আশঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে। এমন আশঙ্কার কথাই জানিয়েছেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক জোসেপ বোরেল। তিনি বলেছেন, সিরিয়ায় একটি বড় আকারের আন্তর্জাতিক সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বেড়ে গেছে।

কাদের বিমান হামলায় নিহত হলো তুর্কি সেনারা?

ইদলিব প্রদেশে বাশার আল আসাদ-বিরোধী বাহিনী সারাকেব নামে একটি শহর দখল করে নেওয়ার পর ওই বিমান হামলা চালানো হয়। আসাদ বাহিনীর দাবি, সেখানে তুর্কি সেনারা জিহাদি যোদ্ধাদের পাশে নিয়ে যুদ্ধ করছিল। তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে আঙ্কারা। তুরস্কের হাতায় প্রদেশের গভর্নর রাহমি ডোগান বলেছেন, ‘আসাদ বাহিনীর বিমান হামলায় আমাদের ৩৩ জন সেনা শহীদ হয়েছেন।’ তিনি যদিও বলছেন সিরিয়ান বাহিনীর কথা, তবে বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব বিমান হামলা চালিয়েছে আসাদের মিত্র রুশ বাহিনী। কিন্তু রাশিয়া বলেছে, বালিউন নামের ওই এলাকায় রুশ বাহিনী যুদ্ধ করছিল না। তাহলে বালিউন এলাকায় আসলে কী ঘটেছিল?

রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, বালিউন এলাকায় তুর্কি সেনারা তাদের ভাষায় ‘সন্ত্রাসীদের’ সঙ্গে মিলে যুদ্ধরত থাকাকালে এক ‘বোমাবর্ষণে’ নিহত হয়। এখানে হায়াত তাহরির আল-শাম গোষ্ঠী বা সাবেক আল-নুসরা বাহিনীর যোদ্ধারা - সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালাচ্ছিল। রাশিয়া বলছে, ইদলিবে যাতে তুরস্কের সেনারা আক্রান্ত না হয়, সেজন্য তারা সব সময় আঙ্কারার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছিল। কিন্তু বালিউন এলাকায় যে তুরস্কের সেনারা সক্রিয় আছে তা তাদের জানানো হয়নি।

মস্কো বলছে, ওই এলাকায় তাদের বিমান কোনও হামলা চালায়নি। কিন্তু তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, কোথায় তুরস্কের সেনা আছে তা রাশিয়াকে জানানো হয়েছিল। এমনকি আক্রান্ত তুর্কি সেনাদের কাছাকাছিও কোন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর পক্ষ থেকে ইদলিবের সব পক্ষকে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে। শুক্রবার সকালেই এরদোয়ান ও পুতিনের মধ্যে জরুরি ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

তুরস্ক আগেই বলেছিল, ইদলিবে তাদের অভিযানের উদ্দেশ্য হচ্ছে উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ায় একটি নিরাপদ এলাকা তৈরি করা - যাতে যুদ্ধের কারণে সিরিয়া থেকে পলায়নপর বেসামরিক লোকজনকে দেশটির ভূখণ্ডের ভেতরেই আশ্রয় দেওয়া যায়। তারা যেন প্রতিবেশী তুরস্কের ভেতরে ঢুকে না পড়ে। কারণ এমনিতেই প্রায় ৩৭ লাখ সিরীয় শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে আঙ্কারা। ফলে তাদের পক্ষে বাস্তবিকই নতুন করে আরও শরণার্থী নেওয়ার মতো অবস্থা নেই।

তুরস্কের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে, শরণার্থীদের দলগুলো ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে ঢোকার চেষ্টায় তুরস্ক-গ্রিস সীমান্তের দিকে যাচ্ছে। এর আগে খবর বেরোয় যে, তুরস্ক পশ্চিমা দেশগুলোকে সতর্ক করে দিয়েছে যে ইদলিব অভিযানে তাদের সমর্থন না পেলে যেভাবে তারা সিরিয়ান অভিবাসীদের ইউরোপে প্রবেশ ঠেকিয়ে রেখেছে, তা আর করবে না। তবে অভিবাসীদের ব্যাপারে নীতি পরিবর্তনের কথা অস্বীকার করেছে আঙ্কারা।

তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, সিরিয়ার ঘটনাবলী তুরস্কের ওপর অভিবাসনের চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু শত শত সিরিয়ান অভিবাসী গ্রিসের লেসবস দ্বীপে যাবার জন্য সীমান্তের দিকে যাত্রা শুরু করেছে এমন খবরের পর গ্রীস সীমান্তে প্রহরা জোরদার করেছে। এই গ্রিস দিয়েই ১০ লাখেরও বেশি অভিবাসী ইউরোপ ঢুকেছিল। ২০১৫ সালে তুরস্ক ও ইইউ-এর এক চুক্তির আওতায় সেই অভিবাসনের জোয়ার নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

পূর্ণ মাত্রার সংঘাতের পরিস্থিতি?

বিবিসি-র বিশ্লেষক জোনাথন মার্কাস বলছেন, তুরস্ক ও সিরিয়ার মধ্যে এখন পূর্ণ-মাত্রার সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আঙ্কারা বা দামেস্ক এক্ষেত্রে পিছু হটবে কিনা। রাশিয়াকে যদিও এখানে কোনও নিরপেক্ষ দেশ বলা যায় না; কিন্তু তারা উত্তেজনা হ্রাসে কোনও ভূমিকা রাখবে কি? তারা কি আসাদ বাহিনীর ইদলিব পুনর্দখলের অভিযান বন্ধ করতে পারবে?

এ নিয়ে সংশয় আছে। কারণ, আসাদ চাইছেন তিনি পুরো সিরিয়ার ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করবেন। আর এ কাজে রাশিয়া বরাবরই তাকে সাহায্য করে আসছে। খবর পাওয়া যাচ্ছে যে, ক্রুজ মিসাইল সজ্জিত দুইটি রাশিয়ান ফ্রিগেট এখন বসফরাস প্রণালী পার হয়ে ভূমধ্যসাগরের দিকে যাচ্ছে। যদিও মস্কো বলছে, এর সঙ্গে সিরিয়ার ঘটনাবলীর কোনও সম্পর্ক নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আমরা ন্যাটো মিত্র তুরস্কের পাশে আছি। সিরিয়া, রাশিয়া ও ইরান সমর্থিত বাহিনীর নিন্দনীয় অভিযান তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছি।’ ন্যাটো মহাসচিব ইয়েন্স স্টোলটেনবার্গ সিরিয়ার বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে রাশিয়া ও আসাদ বাহিনীর অভিযান থামানোর আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু দামেস্ক বলছে, ইদলিবে ‘সন্ত্রাসীদের’ তৎপরতা দীর্ঘায়িত করতে পশ্চিমাদের কোনও চেষ্টা তারা মেনে নেবে না।

প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের একজন মুখপাত্র বলেছেন, রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনকে বলা হয়েছে সিরিয়ার সরকারের সঙ্গে সস্পৃক্ত যে কোনও কিছুই তুরস্কের বৈধ টার্গেট। তাদের আঘাত করা হবে। আঙ্কারার অনুরোধে শিগগিরই ব্রাসেলসে ন্যাটোর জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিবিসি-র বিশ্লেষক জোনাথন মার্কাস বলছেন, এ ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা প্রায় দর্শকের মতো হয়ে পড়েছে। কারণ রাশিয়া ছাড়া এখানে উত্তেজনা কমাতে কার্যকর ভূমিকা পালনের মতো কেউ নেই। এতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতির ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

তুরস্ক সিরিয়ার ব্যাপারে এত বেশি জড়িয়ে পড়েছে কেন?

প্রথমত সিরিয়ার সঙ্গে তুরস্কের দীর্ঘ সীমান্ত আছে। এছাড়া প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান আসাদের ঘোরতর বিরোধী। ফলে সিরিয়ার থেকে পালানো মানুষজন তুরস্ককে তাদের স্বাভাবিক গন্তব্য হিসেবে বেছে নিয়েছে। আরও একটি গভীর কারণ হচ্ছে, সিরিয়ার কুর্দি বিদ্রোহীরা যেন আসাদবিরোধী বিদ্রোহের সুযোগে তুরস্ক সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারে; সেই চেষ্টা করছে আঙ্কারা। কেননা, এতে করে তুরস্কের অভ্যন্তরেও একটি কুর্দি বিদ্রোহের উসকানি তৈরি হবে। তাই আঙ্কারা চাইছে, সীমান্ত এলাকা থেকে কুর্দিদের তাড়িয়ে প্রায় ২০ লাখ সিরিয়ান শরণার্থীকে সেখানে পুনর্বাসন করতে। সূত্র: বিবিসি।

 

/এমপি/

লাইভ

টপ