উষ্ণতা কি করোনার বিস্তার ঠেকাতে ভূমিকা রাখবে?

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৩:০১, মার্চ ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৮, মার্চ ১৩, ২০২০

এই বছরের শুরুতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নভেল করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার শুরুতে সন্দেহবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয় সংক্রমণ ঠেকাতে। ধারণা করা হয়, এই ভাইরাসটি ফ্লু’র মতো যা স্পর্শকাতর গোষ্ঠীর জন্য বিপজ্জনক কিন্তু লক ডাউন পরিস্থিতির মতো না। বিশ্বজুড়ে মৃতের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজারের কাছাকাছি চলে আসার পর এখন ওই অবস্থান যে ভুল ছিল তা প্রমাণিত। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যে সর্বনিম্ন মৃত্যুর হার শনাক্ত হওয়া রোগীদের মধ্যে ১-২ শতাংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে। যা শীতকালীন ইনফ্লুয়েঞ্জার ০.১ শতাংশের কাছাকাছি। ফ্লু’র মতোই সংক্রামক করোনা ভাইরাস, হতে পারে আরও বেশি সংক্রামক। কিন্তু এর কোনও নির্দিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি, রোগনিরোধক বা মৌসুমী টিকা নেই। তবে একটি ক্ষেত্র রয়েছে যাতে বিশেষজ্ঞরা প্রত্যাশা করছেন, ভাইরাসটি ফ্লু’র মতো আচরণ করবে এবং উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর প্রাদুর্ভাব কমে যাবে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন’র এক প্রতিবেদনে এই বিষয়টি উঠে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চিকিৎসা গবেষক নেলসন মাইকেল বলেন, ‘এটি শ্বাসযন্ত্রের ভাইরাস এবং এগুলো ঠান্ডা আবাহওয়ায় নির্দিষ্ট কারণে আমাদের জন্য সমস্যা তৈরি করে। শীতে আমরা সবাই দরজা-জানালা ইত্যাদি বন্ধ করে ঘরের ভেতরে থাকি। ফলে আমরা প্রায়ই এই সময়কে ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু মৌসুম বলি।’

ইনফ্লুয়েঞ্জা ঠান্ডা ও শুষ্ক অবস্থায় সতেজ হয়। ফলে উত্তর গোলার্ধে শীতকালকে অনেক সময় ফ্লু মৌসুম বলা হয়। শীতে আচরণগত পার্থক্যেরও প্রভাব থাকতে পারে। নেলসন মাইকেলের ধারণা, করোনা ভাইরাস ফ্লু’র মতো আচরণ করতে পারে এবং আবহাওয়া উষ্ণ হয়ে উঠলে হয়ত প্রাদুর্ভাব কমে যেতে পারে। কিন্তু তিনি সতর্ক করে বলছেন, আবার যখন শীত ফিরে আসবে তখন ভাইরাসটিও ফেরত আসতে পারে।

আশাবাদের জায়গা হলো, বিভিন্ন দেশের সরকার ও জনগণের অভূতপূর্ব পদপেক্ষেপের ফলে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা কমে আসছে। গরম আবহাওয়ায় বিস্তার কম হলে স্বাস্থ্যসেবা সময় ও সুযোগ পাবে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে কাজ করার এবং একটি সম্ভাব্য টিকা আবিষ্কারের।

নেলসন মাইকেল সতর্ক করে বলেন, ‘এখন আমরা যা কিছু করছি তা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপের বিস্তার ঠেকানোর জন্যও আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।’

কিন্তু যদি ভাইরাসটি ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো আচরণ না করে? তাহলে কী বছর জুড়ে আমাদের উচ্চ সংক্রমণ হার মোকাবিলা করতে হবে? সিঙ্গাপুরে শতাধিক মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন যেখানে গরম ও উষ্ণ-আর্দ্র চমৎকার আবহাওয়া সারা বছর বিরাজ করে। অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনায় এখন গ্রীষ্মের মাঝামাঝিতে রয়েছে, এসব স্থানেও অনেক মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন।

 

অজ্ঞাত যত অজানা

নির্দিষ্ট আবহাওয়াতে করোনা ভাইরাসের বিস্তার ঘটতে পারে বলে প্রমাণিত হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে আক্রান্ত এলাকাগুলোর মধ্যে একটি উহান। এই শহর থেকে শুরু করে ইরান, ইতালি ও দক্ষিণ কোরিয়া প্রায় বা কাছাকাছি একই অক্ষাংশে অবস্থিত এবং তাপমাত্রা ও সংশ্লিষ্ট আর্দ্রতার সামঞ্জস্য রয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব ম্যারিল্যান্ডের গবেষকরা এই শহরগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশ্বের অন্যান্য স্থানে সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়টি অনুসন্ধানের চেষ্টা করছেন। যদিও গবেষণাটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে গবেষণায় এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, নির্দিষ্ট জলবায়ুগত পরিস্থিতি ভাইরাসটির বিস্তার ঠেকানোর বিষয়ে নিশ্চিত হতে না পারলেও তা যে বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে তা মোটামুটি নিশ্চিত।

গবেষকরা বলেছেন, একই ধরনের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও অক্ষাংশ ভাইরাসটির বিস্তারের সময়ে সামঞ্জস্যতা দেখা গেছে। এছাড়া এসব স্থানের বছরের নিম্নতম তাপমাত্রা চক্রেও মিল পাওয়া গেছে। এই আবহাওয়া প্রায় এক মাসের বেশি সময় ছিল।

নিউ ইয়র্কের সিরাকাস ইউনিভার্সিটির জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ব্রিটানি মুশ ইউনিভার্সিটি অব ম্যারিল্যান্ডের গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তিনি বলেন, ‘মানুষকে সংক্রমণ করে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও অপর করোনা ভাইরাসগুলো ঋতু নির্ভর। উত্তর গোলার্ধে শীতে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা সর্বাধিকে পৌঁছায়। তবে আমরা জানি না এই করোনা ভাইরাস ঋতুকালীন ধারা অনুসরণ করবে কিনা।’

রুটগার্স নিউ জার্সি মেডিক্যাল স্কুলের সংক্রমণ রোগের গবেষক ডেডিভ সেনিমো বলেছেন, ‘অনেক বিশেষজ্ঞ প্রত্যাশা করছেন গ্রীষ্মে আক্রান্তদের সংখ্যা কমে যেতে পারে। তবে মৌসুমী দেশগুলোর যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে এই আশায় গুড়েবালি হতে পারে।’

অবশ্য সেনিমো ও মুশ উভয়েই সতর্কতা জানিয়েছেন ভৌগলিক তথ্যের ভিত্তিতে উপসংহার না টানার জন্য। তারা ইঙ্গিত করছেন ভাইরাসটি সম্পর্কে অনেক কিছুই অজ্ঞাত এবং সম্প্রতি কয়েক মাসে এটি ছড়িয়েছে। মুশ বলেন, ‘প্রশ্ন হলো এগুলো ভ্রমণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত অথবা উৎস অজ্ঞাত কিনা। যদি ঋতুকালীন হয় আমরা আবহাওয়া উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্ত এবং অজ্ঞাত আক্রান্তদের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রত্যাশা করতে পারি। আমার মনে হয়, কোভিড-১৯ ঋতুকালীন প্রবণতা অনুসরণ করবে কিনা তা বলার সময় এখনও আসেনি।’

রুটগার্সের মেডিসিনবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক ডেব্রা চিউ স্বীকার করেছেন ভাইরাসটির জানাশোনার অভাবের কথা। তিনিও মনে করেন, এই মুহূর্তে ভাইরাসটির ঋতুকালীন প্রবণতা চিহ্নিত করা অসম্ভব। তিনি বলেন, ‘ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন কিছুর ওপর নির্ভর করতে হয়। আমরা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো কোনও ভাইরাস মোকাবিলা করছি না যা প্রতি বছর প্রত্যাশিত আচরণ করে।’

সাময়িক প্রাদুর্ভাব?

এই সপ্তাহে বিভিন্ন স্থানে আশঙ্কাজনক হারে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও ভালো খবরের আভাসও পাওয়া গেছে। কিছুদিন আগেও সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হওয়া চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া স্থিতিশীল হচ্ছে, প্রতিদিনই সেখানে কমছে নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যা। লক ডাউন, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, মানুষকে ঘরে বসে কাজ করা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার সমন্বিত পদক্ষেপসহ স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপের কারণে এই পরিস্থিতি অর্জিত হয়েছে। একই সঙ্গে জনগণকে কঠোর শিষ্টাচার মেনে চলার আহ্বান ও শিক্ষারও ভূমিকা রয়েছে।

এখন পর্যন্ত যদিও ভয়াবহ আক্রান্ত এলাকাগুলো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়নি আবারও ভাইরাসটির বিস্তারের আশঙ্কায়। এমনকি ভাইরাসটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে গেছে তাও বলা যাচ্ছে। তবে বিশ্বের অন্যান্য স্থান ভাইরাসটি মোকাবিলা করতে শুরু করেছে মাত্র। অনেকেই প্রত্যাশা করছেন, উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে এই মোকাবিলা সহজ হবে। এমনকি কমে আসলেও সেটির অর্থ এই হবে না যে আর তা ফিরে আসবে না।

মুশ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ভাইরাসটি সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা যায়নি। গ্রীষ্মে যদি আক্রান্তের সংখ্যা কমে আসলেও শীতকালীন মাসগুলোতে পুনরায় ভাইরাসটির আক্রমণের বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়া খুব ভালো উদ্যোগ হবে।’

/এএ/

লাইভ

টপ