আফ্রিকাকে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার পরামর্শ

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৫:৩৮, মার্চ ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪২, মার্চ ২০, ২০২০

করোনা ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা থেকে শুরু করে জনসমাগম নিষিদ্ধ করা পর্যন্ত সব পদক্ষেপই নিয়েছে আফ্রিকা।  তারপরও সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চলে আক্রান্তের সংখ্যাও উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বুধবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইথিওপিয়া অঞ্চলের পরিচালক টেড্রোস অ্যাধানম গেব্রিসাস বলেন, ‘আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে এবং এখনই এই ‍হুমকি মোকাবিলায় আফ্রিকার দেশগুলোতে জেগে ‍উঠতে হবে। তিনি বলেন, আফ্রিকার জন্য এখন সবচেয়ে ভালো পরামর্শ হলো সবচেয়ে খারাপ কিছুর জন্য প্রস্তুত থাকা এবং তা আজ থেকেই।’

১৯ মার্চ পর্যন্ত হিসেব অনুযায়ী আফ্রিকার ৩৩টি দেশে ৬০০ এরও বেশি মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের। সুস্থ হয়েছেন ৪০ জনেরও বেশি।  এই অঞ্চলের সবচেয়ে জনবহুল দেশ নাইজেরিয়া ১৩টি আক্রান্ত দেশের নাগরিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। বিশেষ করে ইউরোপ থেকে আগতদের ব্যাপারে নেওয়া হয়েছে বিশেষ সতকর্তা। অন্যান্য দেশের আফ্রিকানদের আশ্রয় দেওয়া দেশগুলোও একই পদক্ষেপ নিয়েছে। আক্রান্ত অঞ্চলগুলো আগতদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হচ্ছে।

স্কুল বন্ধ, নিষিদ্ধ জনসমাগম

ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি সেনেগাল, রুয়ান্ডা, দক্ষিণ আফ্রিকা, কেনিয়া, ইথিওপিয়া, জাম্বিয়া, তানজানিয়াতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। বোতসানা, ঘানা, ইথিওপিয়াতে খেলাধুলার আয়োজন বাতিল করা হয়েছে। ডিআর কঙ্গো, রুয়ান্ডা ও ঘানায় ধর্মীয় জমায়েতও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

কেনিয়ায় এখন পর্যন্ত সাতজন করোনা আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। সরকার কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠান মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এছাড়া টাকা ছাড়াই কেনাকাটার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মাকুনি প্রদেশে সাপ্তাহিক বাজারের দিন বন্ধ করা হয়েছে। মোম্বাসায় ৩০ দিনের জন্য বন্ধ করা হয়েছে নাইটক্লাব। কেনিয়ান মহামারি বিশেষজ্ঞ নেলি ইয়াতিচ বলেন, দেশটিতে ৩৫টি আসোলেশন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। তবে সেখানে পর্যাপ্ত সুবিধা নেই। স্বাস্থ্যকর্মীদের নেই নিজেদের সুরক্ষিত রাখার কোন ব্যবস্থা।

কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবির এক স্বাস্থ্যকর্মী নাম না জানানোর শর্তে বলেন, তারা সহকর্মীরা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন। হাসপাতালে পর্যাপ্ত পানি কিংবা স্যানিটাইজার নেই।

দীর্ঘকালীন প্রতিবন্ধকতা

কেনিয়ার পাশ্ববর্তী সোমালিয়ায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ফৌজিয়া আবিকার নুর বলেন, দেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। তিনি চীন থেকে দেশে এসেছেন। এতে করে সোমালিয়ার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

মোগাদিসুর পরিবারভিত্তিক নার্স হোডান আলি বলেন, ‘তিন দশক ধরে এখানে সহিংসতা চলছে। নিরাপত্তা ইস্যুতে এখানে আগে থেকেই অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। করোনা ভাইরাসের মতো পরিস্থিতি সামাল দিতে গেলে এই ব্যবস্থা আরও পঙ্গু হয়ে যাবে।’    

তবে জিম্বাবুয়ের মতো দেশ যেখানে এখনও করোনা আক্রান্ত কোনও রোগী পাওয়া যায়নি তারাও বেশ সতর্ক ভূমিকা পালন করছে। দেশটির সরকার মঙ্গলবৈার জাতীয় সংকট ঘোষণা করেছে। স্থানীয়রা অবশ্য অভিযোগ করছে অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত একটি দেশে এমন পদক্ষেপ নেওয়া ঠিক হয়নি।

রাজধানী হারারে এর একজন আইটি কনসালটেন্ট মিশেক চিরওয়া বলেন, ‘কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করার ব্যাপারে উৎসাহিত করছে। তবে এখানে ১৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎই থাকে না। সরকার অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ। আমাদের পানি সংকটও রয়েছে। তাই আমাদের সামনে এখন অনেক চ্যালেঞ্জ।

অন্যদিকে করোনা ভাইরাসের আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। সংস্পর্শে এই রোগ ছড়ানোর ব্যাপারটি অনেকেই বিশ্বাস করছে না। কেনিয়ায় এক মেডিক্যাল স্পা ভুয়া টেস্টিং কিট এর বিজ্ঞাপন প্রচার করলে সেখান থেকে ১০ জনকে আটক করেছে দেশটির পুলিশ।

সতর্কতাপূর্ণ আশাবাদ

এখনও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিগত জরুরি অবস্থা থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা এখন কাজে লাগানো সম্ভব। বিশেষ করে ২০১৪-২০১৬ সাল পর্যন্ত চলা ইবোলা মহামারি। এই সময়ে পশ্চিম আফ্রিকার ১১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এবার তাদের সামনে করোনা ভাইরাস চ্যালেঞ্জ।

 কঙ্গোর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক সূত্র জানায়, ‘ইবোলা হয়তো কোভিড-১৯ থেকে আলাদা। তবে আমরা প্রতিরোধের আবশ্যকতা শিখেছি। আমরা জানি কিভাবে মিথ্যা তথ্য রুখতে হয়। উগান্ডার চিকিৎসক সাবরিনা কিটাকাও একমত প্রকাশ করে বলেন, ‘উগান্ডা ইবোলা ও মারবার্গ মোকাবিলা করেছে। আমাদের সিস্টেমের ওপরা আমার আস্থা আছে।’

চাটাম হাউসের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য প্রকল্প এর সহযোগী ফেলো এনগোজি বলেন, আগের দুর্যোগে তৈরি স্থাপনাগুলো বিশেষ করে আফ্রিকা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এর মতো প্রতিষ্ঠান ভালো কাজ করবে। তিনি দাবি করেন, আফ্রিকার অন্তত ২০টি দেশে এই ভাইরাস পরীক্ষা করার মতো কেন্দ্র আছে। আর এরোন্ডু বলেন, প্রতিরোধের বাকি বিষয়গুলো এখন বিদেশফেরতদের আলাদা করে রাখা ও সংক্রমণ রোধের ওপর নির্ভর করছে।   

নাইজেরিয়া সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এর মহাপরিচালক চিকে আইজেকওয়াজু বলেন, নাইজেরিো তাদের পর্যবেক্ষণ ও রোগ নির্ধারণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। তিনি বলেন, এই রোগের মহামারির ধরন প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে আর আমরাও। ২০১৪ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলা মহামারির সময় আমরা অনেক উন্নতি করেছি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই অঞ্চলের সংস্থা ও ডিজিজ কন্ট্রোল কেন্দ্রগুলো সেসময় দারুণ কাজ করেছে।

সেনেগালে স্থানীয় সংকমণ হয়েছে। ফান হাসপাতালে সংক্রমণযোগ্য রোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মুসা সাইদি বলেন, তারা গবেষণগার এর ধারণক্ষমতায় আশাবাদী যে এই ভাইরাসের সঙ্গে মোকাবিলা সম্ভব।

‘আমরা এটা মোকাবিলা করবো’

এখনও দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিষয়টি সবাইকে ভাবাচ্ছে। এছাড়া স্কুল বন্ধ করা হলেও শিশুযত্নের ব্যাপারেও সবাই চিন্তিত। সবকিছু বন্ধে করে দেওয়ায় ইনফরমাল ইকোনমির ওপর কি প্রভাব পড়বে এবং দেশজুড়ে এর পরিণতি কি হবে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন আফ্রিকানরা।

বিশ্বের অন্যান্য দেশে নেওয়া পদক্ষেপগুলো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে আফ্রিকাতেও। নাইরোবি সুপারমার্কেটের সুপারভাইজর রোজ আরুঙ্গা বলেন, আমরা দেখছি যে মানুষ হন্যে হয়ে কেনাকাটা করছে। যারা স্যানিটাইজারের দাম বৃদ্ধি করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার।

সুদানি রাজধানী খারতুমে স্থাপত্যশিল্পী তাগরিদ আবদিন বলেন, সবাই করোনা ভাইরাস নিয়ে কথা বলছে। কয়েকটি ফার্মেসি মাস্ক ও স্যানিটাইজারের দাম বৃদ্ধি করেছে। আবার কেউ কেউ এগুলো বিনামূল্যে বিতরণ করছে। লাইবেরিয়ার রাজধানী মনোরিভায় জশুয়া স্নেহ নামে এক দোকান মালিক বলেন, পাঁচ বছর আগে ইবোলা মোকাবিলা করেছি। আমরা এটাও মোকাবিলা করবো।

/এমএইচ/বিএ/

লাইভ

টপ