যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৮:৩৭, মার্চ ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪১, মার্চ ২৯, ২০২০

অন্য যে কোনও দেশের চেয়ে বেশি বন্দি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারগুলোতে। ২০১৭ সালের হিসাবে দেশটির জেলখানাগুলোতে প্রায় ২৩ লাখ বন্দি রয়েছে। ইউএস ব্যুরো অব জাস্টিস-এর হিসাব অনুযায়ী, এদের মধ্যে ১৫ লাখের মতো রয়েছে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা কারাগারগুলোতে। আর স্থানীয় কারাগারগুলোতে রয়েছে আরও সাত লাখ ৪৫ হাজার বন্দি।

রিকার্স দ্বীপের একটি কারাগার থেকে সোমবার মুক্তি পাওয়া একজন জানিয়েছেন, কারাগারের ভেতরে সুস্থ ও অসুস্থ লোকজন প্রায়ই অবাধে মিশে যান। তিনি জানান, তার কাছাকাছি থাকা একজন বন্দি ও একজন প্রহরীর করোনাভাইরাস ধরা পড়ার পর থেকে তিনি নিজের দুই জনের সেলটিতেই বেশিরভাগ সময় কাটাতেন। তবে ওষুধের জন্য জানালার পাশে অন্য কয়েদিদের সঙ্গেই তাকে লাইন ধরতে হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ৩২ বছরের একজনের ভাষায়, ‘সেখানে কোনও সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই। চাইলেও আপনি লোকজনের কাছ থেকে দূরে সরতে পারবেন না।’

নিউ ইয়র্ক শহরের সংশোধন বিভাগ জানিয়েছে, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। এর মধ্যে কোনও কয়েদির সংক্রমণ ধরা পড়লে সেখানকার অন্যদের মধ্যে মাস্ক বিতরণ, বন্দিদের মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখতে উৎসাহিত করা, সেলগুলো পরিষ্কার রাখা ও সাবান সরবরাহের মতো নানা পদক্ষেপ রয়েছে।

পাবলিক ইনফরমেশন বিভাগের কমিশনার পিটার থর্ন বলেন, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে আমাদের হেফাজতে লোকজনকে নিরাপদে ও মানবিকভাবে রাখার জন্য সম্ভব সবকিছুই করছে সংশোধন বিভাগ।

কিছু কারাগার থেকে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে এমন কয়েদিদের মুক্তি দেওয়া হচ্ছে।

জর্জিয়ার মেরিয়েত্তায় চুরির অভিযোগে অব্রে হার্ডিওয়ে নামের একজনকে আটক করে কোব কাউন্টি অ্যাডাল্ট ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়েছিল। আটকের সময় তার কাশি, মাথা ব্যথা, গলা ব্যথা ও ১০৩ ডিগ্রি জ্বর ছিল। অভিযুক্ত ব্যক্তি বলছিলেন, ‘আমি এটি নিতে পারছিলাম না। ভয়ঙ্কর বোধ করছিলাম।’ চার দিন পর তার ফ্লু ও স্ট্রেপ থ্রোট পরীক্ষা করা হয়। দুটোই নেগেটিভ এলে অন্যান্য পরীক্ষার জন্য তাকে কাছাকাছি একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়।

হার্ডওয়ে জানান, তার করোনভাইরাস পরীক্ষা করা হয়েছিল কিনা এটা তাকে কখনোই বলা হয়নি। তবে একজন চিকিৎসক তার ডেপুটিদের হার্ডিওয়েকে কোয়ারেন্টিন করতে বলেছিলেন। অবশ্য কারাগারে ফেরার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বন্ধুদের মুচলেকায় তিনি মুক্তি পান।

হার্ডিওয়ে বলেন, তার বিশ্বাস তার ব্যাপারটি হয়তো তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রহরী এবং একই সেলে থাকা অন্য বন্দিরা জেনে গেছে।

সংশ্লিষ্ট অন্তত দুইটি সূত্র জানিয়েছে, সেখানে কারাগারের অন্তত একজন ডেপুটির শরীরে এ ভাইরাস ধরা পড়েছে। আরও একজনের শরীরে করোনার উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরপরই তাকে আলাদা করা হয়। তবে এ ব্যাপারে কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন স্থানীয় কাউন্টি শেরিফ।

কারাগারগুলোর কর্তৃপক্ষ বলছে, করোনাভাইরাস মোকাবিলায় তারা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কারাগারে নতুন বন্দিদের স্থান নির্ধারণের আগে তাদের শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করা হচ্ছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে মেডিক্যাল ছাড়পত্র পাওয়ার আগ পর্যন্ত নতুন বন্দিদের কোয়ারেন্টিন করে রাখা হচ্ছে। কারও ক্ষেত্রে আবার কিছুই করা হচ্ছে না।

ফেডারেল কারাগার কর্মীদের প্রতিনিধিত্বকারী ইউনিয়নের সহ-সভাপতি স্যান্ডি পার। তিনি বলেন, ফেডারেল কারাগারের রক্ষীরা কর্তব্যরত অবস্থায় মাস্ক পরার অনুমতি চেয়েছে। যদিও কর্তৃপক্ষ এতোদিন পর্যন্ত এর অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিল। এ ব্যাপারে কারা ব্যুরোর বক্তব্য চাওয়া হলে কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

কারা ব্যুরোর ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ১৪ জন ফেডারেল বন্দি এবং ১৩ জন কর্মীর শরীরে ইতোমধ্যেই এ ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। স্যান্ডি পার বলেন, একটি মহামারি আমাদের বন্দিদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।

গত বৃহস্পতিবার অভিবাসন সংক্রান্ত মামলার শুনানি চলাকালে নিউ জার্সির কাউন্টি কারাগারে বন্দি ১০০ জনকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে ফেডারেল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন একজন বিচারক। ডিস্ট্রিক্ট জজ অ্যানালিসা টোরেস এক রায়ে বলেছেন, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ফলে ইমিগ্রেশন ডিটেনশনে থাকা প্রত্যেক বন্দি মারা যাওয়া কিংবা গুরুতর আহত হওয়ার আসন্ন ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

রয়টার্সের অনুসন্ধনে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ এক ডজন কারাগারের মধ্যে কোথাও আক্রান্ত বন্দিদের ভাইরাস ছড়িয়ে দেওয়া থেকে বিরত রাখার কোনও অভিন্ন পদ্ধতি না থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে।

কোনও কোনও কারাগারে বন্দিরা বেরুনোর আগে তাদের স্ক্রিনিং করা হয়। তবে সর্বত্র এটা করা হয় না। এর মধ্যে ওয়াশিংটনের কিং কাউন্টি কারেকশনাল ফ্যাসিলিটির নামও রয়েছে।

কিংড কাউন্টি বিভাগের অ্যাডাল্ট এবং জুভেনাইল ডিটেনশনে অন্তত একজন সংশোধনকারী কর্মকর্তা করোনভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। সেখানকার ক্যাপ্টেন ডেভিড ওয়েরিচ বলেন, ‘এই মুহুর্তে পূর্ববর্তী চিকিৎসা বা মনোরোগ সংক্রান্ত কোনও ধরণের সমস্যা না থাকলে মুক্তির সময় কয়েদিদের কোনও উন্নত স্ক্রিনিং-এর ব্যবস্থা নেই।

ওহিও-র হ্যামিল্টন কাউন্টি জাস্টিস সেন্টার অবশ্য মুক্তি পাওয়া সব বন্দির তাপমাত্রা পরীক্ষা করছে।

ফ্লোরিডার সেমিনোলের জন ই পক কারেকশনাল ফ্যাসিলিটিতে কোনও বন্দির অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে তাকে বাইরের চিকিৎসা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যান্য কারাগারে বিদ্যমান কয়েদিদের করোনাভাইরাস সংক্রান্ত পড়াশোনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

ফেডারেল কারাগারে বন্দিরা জানিয়েছেন, শিক্ষামূলক কর্মসূচি এবং বেশিরভাগ পরিদর্শনসহ কিছু ধর্মীয় পরিষেবা বাতিল করা হয়েছে।

কলোরাডোর লিটলটনের ফেডারেল কারাগারের ৫৫ বছরের একজন বন্দি স্টিভেন জোনস। তিনি বলেন, ‘আমাদের আশঙ্কা ভাইরাসটি যদি এখানে ঢুকে পড়ে তাহলে এটি আমাদের শেষ করে দেবে।’

/এমপি/বিএ/

লাইভ

টপ