ভারতে নতুন করে বাড়ছে ইসলামবিদ্বেষ

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ০১:৫২, এপ্রিল ০৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০১:৫৩, এপ্রিল ০৪, ২০২০

ভারতে নতুন করে বাড়ছে ইসলামবিদ্বেষের মাত্রা। যদিও দেশটির মুসলিমবিদ্বেষী নাগরিকত্ব আইন ও কথিত নাগরিকপঞ্জির মতো ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে বহুদিন থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট হচ্ছিল। তবে নতুন করে বিদ্বেষের চর্চা শুরু হয়েছে দিল্লিতে তাবলিগ জামাতের এক সমাবেশকে কেন্দ্র করে। ভারত সরকার বলছে, ওই সমাবেশে যোগ দেওয়া অন্তত ৩০০ জনের শরীরে করোনার সংক্রমণ পাওয়া গেছে। আর সরকারি এমন ঘোষণার পরই দেশটিতে উদ্বেগজনক পর্যায়ে মুসলিমবিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর একটা অংশ এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে নানা মুসলিমবিদ্বেষী হ্যাশট্যাগ তৈরি হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে নানা ভুয়া খবর। করোনাজিহাদ বা নিজামুদ্দিন ইডিয়টস নামে বিভিন্ন হ্যাশট্যাগও ব্যবহার করা হচ্ছে।

ভারতের মুসলমান নেতৃত্ব যদিও স্বীকার করেছেন যে, তাবলিগের ত্রুটি নিশ্চই হয়েছে। কিন্তু খোদ রাজধানীতে পুলিশ বা সরকারই কেন এ সময়ে ওই সম্মেলন (মারকাজ) হতে দিলো? এমন প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে।

দিল্লির নিজামুদ্দিনে তাবলিগ জামাতের মারকাজে যোগ দিয়ে নিজের রাজ্যে ফিরে যাওয়া কয়েকজনের শরীরে করোনা সংক্রমণ প্রমাণিত হওয়ার পর ভারতের গণমাধ্যমে ওই ঘটনা অতি মাত্রায় গুরুত্ব পেতে শুরু করে।

ওই ঘটনা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের সদস্য জাফরিয়াব জিলানি বিবিসি-কে বলেন, ‘ভুল দুই তরফেই হয়েছে। ওই সমাবেশে যারা গিয়েছিলেন, তাদের উচিত ছিল নিজের থেকেই পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া এবং চিকিৎসকদের আর সরকারের পরামর্শ নেওয়া। কিন্তু উল্টো দিকে, সরকারই বা ব্যবস্থা নেয়নি কেন! সমাবেশটা তো হয়েছে যখন দেশে কোনও লকডাউন ছিল না, সেই সময়ে। তারপর যারা ফিরতে পারেনি, লকডাউনের ফলে তাদের জন্য তো সরকারের কোনও ব্যবস্থা নেওয়া দরকার ছিল।’

তিনি বলেন, ‘এ রকম একটা কঠিন সময়ে বিষয়টাকে যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটা একেবারেই কাম্য নয়। মুসলমানদের প্রায় সবাই কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কথা মেনে চলছে। আলেমরা নির্দেশ দিয়েছেন জমায়েত না করতে।’

পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী এবং রাজ্যের মুসলমান সমাজের অতি পরিচিত নেতা সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীও একই প্রশ্ন তুলছেন। তিনি বলেন, তাবলিগ জামাত যদি ভুল করে থাকে সমাবেশ করে, তাহলে সরকার কী করছিল?

সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী বলেন, ‘মার্কাজে নিজামুদ্দিনের পাশেই থানা আছে। কেন্দ্রীয় সরকারের পুলিশ আছে দিল্লিতে। তারা কি সমাবেশে হাজির মানুষকে কোনওভাবে সচেনতন করেছিলেন? একবারও মাইকিং করেছিলেন এলাকায়? সেটা করলেই তো এরকম পর্যায়ে যেত না বিষয়টা! আবার মাওলানা সাদ সাহেবও কার সঙ্গে কী পরামর্শ করেছিলেন জানি না। তাদের একগুঁয়ে মনোভাব নেওয়াটা উচিত হয়নি। এরকম একটা ঘটনার ফলে গোটা দেশের মুসলমানদের একটা পরীক্ষার মুখে ফেলে দিয়েছেন তারা।’

পশ্চিমবঙ্গ থেকেও অনেকে গিয়েছিলেন ওই সমাবেশে। সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী বলেন, ‘কারা গিয়েছিলেন সেখানে, সেটা জানা গেছে। আমি বলবো, তারা নিজের থেকেই এগিয়ে এসে পরীক্ষা করিয়ে নিন। ডাক্তারি পরীক্ষা করানো তো ইসলামবিরোধী কাজ নয়।’

হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো অবশ্য তাবলিগ জামাতের সমাবেশ নিয়ে মুসলিমবিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ অস্বীকার করছে।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসের বাংলা পত্রিকা স্বস্তিকার সম্পাদক রন্তিদেব সেনগুপ্ত বিবিসি-কে বলেন, ‘এটা মুসলমান বিদ্বেষ কখনোই নয়। তবে যেটা হয়েছে, সেটা তো ভয়াবহ। তাবলিগ জামাত যে ঘটনা ঘটিয়েছে, এ রকম একটা পরিস্থিতিতে বড় সমাবেশ করলেন তারা, সেখান থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লেন। এরকম একটা দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ কী করে করলেন তারা? ধর্মান্ধতা আর পশ্চাদপদতা যে মানুষকে কোথায় টেনে নিয়ে যায়, কীভাবে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনলেন তারা, সেটাই প্রমাণ করলো তাবলিগ জামাত।’

ছড়িয়ে পড়ছে মুসলিম বিদ্বেষী ভুয়া ভিডিও, খবর

মুসলিমবিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই ওই ঘটনার পর মুসলমানদের লক্ষ্য করে নানা ভুয়া খবর ছড়ানো হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে।

ভুয়া খবর যাচাই করে দেখে, এমন একটি ওয়েবসাইট অল্টনিউজের সম্পাদক প্রতীক সিনহা বিবিসি-কে বলেন, ‘নিজামুদ্দিনের ঘটনার পর থেকে এ রকম অনেক ভিডিও আর পোস্ট ভাইরাল হয়েছে, যেগুলোর টার্গেট মুসলমানরা। আমরা একটা ভুয়া ভিডিও খুঁজে পেয়েছি, যেখানে একদল মুসলমানকে থালা-বাটি চাটতে দেখা যাচ্ছে। বলা হয়েছে, এভাবেই মুসলমানরা করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে দিচ্ছে। আমরা যাচাই করে দেখি যে, ওটি আসলে বোহরা মুসলমানদের একটি রীতি। খাওয়ার পরে যাতে থালায় একটিও খাদ্যকণা অবশিষ্ট না থাকে, সেজন্য তারা চেটে পরিষ্কার করে দেন।’

তিনি বলেন, ‘দুই দিন আগে আরেকটি ভিডিও আসে আমাদের কাছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে একটি মসজিদের ভেতরে একদল মুসলমান কোনও একটা আওয়াজ করছেন। ভুয়া পোস্টটিতে বলা হয়, এভাবে হাঁচি দিয়ে মুসলমানরা নাকি করোনা ছড়াচ্ছে। অথচ এটি আসলে একটা সুফি আচার, যেখানে তারা শ্বাস-প্রশ্বাসের একটা অভ্যাস করেন - সেটাই তারা করছিলেন।’

তার ভাষায়, ‘এসব ভুয়া ভিডিওগুলো ছড়িয়ে দিয়ে ভারতে করোনা ছড়িয়ে পড়ার জন্য মুসলমানরাই দায়ী, এমন একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।’ সূত্র: বিবিসি।

/এমপি/

লাইভ

টপ