ভারতের রাজনীতিতে জনতোষণবাদের প্রভাব কেমন?

Send
আশীষ বিশ্বাস, কলকাতা
প্রকাশিত : ২১:৫৬, জুলাই ০৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৫৯, জুলাই ০৬, ২০২০

কয়েক দিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা দিয়েছিলেন ৮ কোটি ভারতীয় নাগরিকদের জন্য নভেম্বর পর্যন্ত বিনামূল্যে খাবার রেশন সরবরাহ করার। ধাপে ধাপে শিথিল হওয়ার পথে চলমান লকডাউনে সরকার এই বিনামূল্যে রেশন কর্মসূচি ঘোষণা করে। যখন কাজ ও উপার্জন হারানো ঘটনা ব্যাপক হারে ঘটছে এবং দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কোনও ইঙ্গিত নেই তখন মোদির বিনামূল্যে রেশন কর্মসূচিতে আমজনতার মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে।




মোদির বিভিন্ন বক্তব্যের মতোই তার এই উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও এতে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া এসেছে। যথারীতি ছিল ভারতের বামপন্থীদের সমালোচনা। সিপিআই(এম) নেতা সীতারাম ইয়েচুরি মোদির এই ঘোষণাকে ভারতীয় ক্ষমতাসীন পার্টির ‘মিথ্যা প্রতিশ্রুতি’ হিসেবে উদ্যোগটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। সিনিয়র কংগ্রেস নেতারা বলছেন, মোদির এই দানশীলতা বিহার ও কয়েকটি রাজ্যের আসন্ন নির্বাচনকে মাথায় রেখে নেওয়া উদ্যোগ। অন্যরা অভিযোগ করছেন, ভারতে খাদ্য শস্য সংরক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকার প্রেক্ষিতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ভারতে খাদ্য কর্পোরেশনের দীর্ঘদিন ধরেই খাদ্য শস্য সংরক্ষণের রেকর্ড ভালো না।
কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে, গত কয়েক মাসে ৬৫ লাখ টনের বেশি খাদ্য শস্য গুদামে নষ্ট হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে চাল ও গম। বছরে সরকারের কল্যাণ তহবিল থেকে মানুষকে যে পরিমাণ খাবার সরবরাহ করা হয় নষ্ট হওয়ার পরিমাণ তার চেয়ে বেশি।
মোদির এই কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও একবার চরম ও নাটকীয় প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। টেলিভিশনে মোদির ভাষণের ৪৫ মিনিটের মধ্যেই তিনি কলকাতাভিত্তিক বাংলা টিভি চ্যানেলগুলোকে বলেন, ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ১০ কোটি মানুষকে বিনামূল্যে রেশন দেওয়া হবে। এর মধ্য দিয়ে তিনি আবারও একতরফা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতি নিজের ঝোঁক প্রকাশ করলেন। রাজ্যের মন্ত্রিসভার কোনও বৈঠক ও প্রশাসনিক অনুশীলন না থাকায় এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার জন্য আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
অবশ্য এখন আর মমতার রাজনৈতিক ঘোষণা ভারতের মূলধারার চ্যানেলগুলোতে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ ও মনোযোগ পায় রা। ইংরেজি ও হিন্দি টিভি নেটওয়ার্কগুলো খবরটি প্রচার করলেও তা ছিল সংক্ষিপ্ত। তবে প্রত্যাশিতভাবেই বাংলা টিভি চ্যানেলগুলো দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দিন আনি দিন খাওয়া মানুষদের নিয়ে টকশো আয়োজন করেছে।
দিল্লিভিত্তিক বিশ্লেষকরা একমত যে, মোদি শুধু করোনা মহামারিতে ভারতের গ্রামীণ জনগণের কঠিন দুর্ভোগে নিজের দয়ালু মন থেকে এই সিদ্ধান্ত নেননি। বিজেপি নেতাদের মধ্যেও আলোচনা হচ্ছিল পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে, ঝাড়খন্ড, বিহার ও উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া আসছিল। মাঠ পর্যায়ে ত্রাণ ও সহযোগিতা কর্মকাণ্ডে জড়িত আরএসএস ও বিজেপির বিভিন্ন গণসংগঠন থেকেই এমন খবর আসছিল। পশ্চিম বঙ্গ ও কয়েকটি এলাকায় বামপন্থীরা এমন উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো এক্ষেত্রে খুব এগিয়ে আসেনি। ফলে এই পরিস্থিতি বিজেপি নিজেকে চালকের আসনে বসতে পারার সুবিধা পেয়েছে।
নরেন্দ্র মোদি ঠিকই সহযোগিতা পাওয়ার দাবিদার মানুষের সঠিকভাবে অনুমান করেছেন, প্রায় ৮ কোটি। ভারতের ১৩০ কোটির বেশি মানুষের জন্য বিনামূল্যে খাদ্য শস্য নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা নেই। (মোদিকে চ্যালেঞ্জ করতে সব ভারতীয় নাগরিকদের জন্য বিনামূল্যে রেশন দেওয়ার ব্যবস্থার পরামর্শ দিয়েছিলেন মমতা) মহামারিতে থমকে যাওয়া ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণি রেশন ব্যবস্থার উপর খুব বেশি নির্ভরশীল না। তাদের সংখ্যা ২৫ থেকে ৩৫ কোটির মতো। এই শ্রেণির মানুষেরা দরিদ্র সীমার নিচে নেই। তাদেরকে বাদ দিলেও এই উদ্যোগকে সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মানবিক উদ্যোগ হিসেবে দাবি করতে পারেন মোদি।
এখানেই মমতার মতো নেতারা পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যা ১০ কোটির জন্য খাদ্য বিতরণের কথা বলে ভুল করেন। তিনি এমনকি দাবি করেছেন, পশ্চিমবঙ্গে সব মানুষকে বিনামূল্যে খাওয়ানো হচ্ছে। যা গুরুতর ভুল বক্তব্য।
বিশ্লেষক সন্ময় ব্যানার্জিকে এক প্যানেল আলোচনায় প্রশ্ন তুলে বলেছেন, তিনি জানেন না কী নিয়ে কথা বলছেন। তিনি কি বলছেন যে রাজ্যের সব জনগণ দরিদ্র সীমার নিচে বাস করছেন?
আরেকবার মমতা বলেছেন, সরকার ৬ কোটি মানুষকে রেশন দিচ্ছে এবং বাকি ৪ কোটি বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় আছেন। এগুলোর কিছু পরিচালনা করছে কেন্দ্রীয় সরকার। ফলে রুটি-রোজগার নিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই নিজের বোল পাল্টালেন মমতা।
মমতার এমন দাবির পর উদ্বিগ্ন বিশ্লেষকরা ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত বিনামূল্যে রেশন বিতরণের ব্যয় হিসাব করতে শুরু করেন। তাদের হিসাবে ন্যূনতম ব্যয় হলে ৪ হাজার কোটি রুপি। তবে এমন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গেলে খরচ আরও বাড়বে। অথচ অর্থনৈতিক সংকটের কথা বলে রাজ্যের ৮ লাখ সরকারি কর্মীদের মহার্ঘভাতা দেওয়া হচ্ছে না পাঁচ বছর ধরে।
মমতার সমর্থক অর্থনীতিবিদ দেবনারায়ণ সরকার আশা প্রকাশ করে বলেন, সন্দেহ নেই প্রয়োজনীয় তহবিল সংস্থানের কোনও উপায় তিনি বের করবেন।
মজার বিষয় হলো পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সভাপতি দিলিপি ঘোষ ও সিপিআই(এম)- এর সুজন চক্রবর্ত্তী সচরাচর কোনও বিষয়ে একমত না হলেও এই বিষয়ে তাদের অবস্থান কাছাকাছি। তারা উভয়েই বলেছেন, মমতা ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন না। অন্য যে কারও চেয়ে তিনিই তা ভালো জানেন।
উল্লেখ্য, আগামী এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

/এএ/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ