ট্রাম্পের প্রকৃত অবস্থা আড়াল করা হচ্ছে?

Send
ফাহমিদা উর্ণি
প্রকাশিত : ২২:৪১, অক্টোবর ০৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৪৫, অক্টোবর ০৪, ২০২০

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শারীরিকভাবে কেমন আছেন; তা নিয়ে সুনিশ্চিত ও সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। শনিবার ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছেন, তিনি হাসপাতালে আসার সময়ে অসুস্থ বোধ করলেও এখন ভালো আছেন। হোয়াইট হাউসের চিকিৎসকরাও একই দাবি করেছেন। তবে চিফ অব স্টাফ মার্ক মিডোস বলেছেন ভিন্ন কথা। তাকে উদ্ধৃত করে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, শুক্রবার কঠিন সময় পার করেছেন ট্রাম্প। সামনের ৪৮ ঘণ্টা খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং তিনি ঝুঁকিমুক্ত নন। শনিবার ট্রাম্পের প্রধান চিকিৎসক ড. শন কোনলি অবশ্য স্বীকার করেছেন প্রেসিডেন্ট শঙ্কামুক্ত নন। তবে তিনিসহ অন্য চিকিৎসকরা  যেসব বক্তব্য দিয়েছেন তাতে ট্রাম্পের স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে স্পষ্ট কোনও উত্তর ছিল না। বরং তারা পরস্পরবিরোধী কিংবা সাংঘর্ষিক বক্তব্য দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করা সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত মার্ক ক্রিস্টোফার সানডে শো অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হোয়াইট হাউসের অবস্থান নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, হোয়াইট হাউস স্পষ্ট করে কিছু বলছে না। মার্কিন সংবাদমাধ্যম  এপি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের চিকিৎসকদের বক্তব্য হোয়াইট হাউজের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নে সংকট তৈরি করেছে।

শুক্রবার মৃদু উপসর্গ দেখা দেওয়ায় টন মেরিল্যান্ডের ওয়াল্টার রিড ন্যাশনাল মিলিটারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় মার্কিন প্রেসিডেন্টকে। শনিবার সবাইকে আশ্বস্ত করে ট্রাম্প টুইটারে জানান, হাসপাতালে আসার সময় অসুস্থ থাকলেও এখন আগের চেয়ে ভালো বোধ করছেন তিনি। একইদিন ট্রাম্পের ব্যক্তিগত চিকিৎসক শন কনলি বলেন, এখন পর্যন্ত ট্রাম্পকে অক্সিজেন দিতে হয়নি এবং অনেকটাই সুস্থ রয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে চিকিৎসকের এ বক্তব্যের কিছুক্ষণ পরেই হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ মার্ক মিডোসের বক্তব্যে ট্রাম্পের শারীরিক অবস্থা নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। ওয়াল্টার রিড হাসপাতাল প্রাঙ্গণে মিডোস সাংবাদিকদের বলেন, গত ২৪ ঘণ্টা প্রেসিডেন্টের অবস্থা খুবই উদ্বেগজনক ছিল। পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা তার চিকিৎসার জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হবে। এখনও তিনি পুরোপুরি সুস্থতার পথে নেই।

মিডোসের বক্তব্যের পর শনিবার সন্ধ্যায় হাসপাতাল থেকে ট্রাম্প নিজেই নিজের স্বাস্থ্য অবস্থার কথা জানিয়ে ভিডিও বার্তা দিয়েছেন। বলেছেন, আগের চেয়ে ভালো বোধ করতে শুরু করেছেন এবং শিগগিরই কাজে ফিরবেন। জানা গেছে, মিডোস ট্রাম্পের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে যে মূল্যায়ন দিয়েছেন, তাতে ক্ষুব্ধ হয়েছেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট। হোয়াইট হাউজ সংশ্লিষ্ট এক রিপাবলিকান নেতাকে উদ্ধৃত করে এপি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষোভের জেরেই নিজের শারীরিক অবস্থা ভালো দাবি করে  ভিডিও বার্তা দেন ট্রাম্প। শুধু তাই, তার বিশ্বস্ত রুডি গিউলিয়ানিকে তার পক্ষ থেকে বিবৃতি দেওয়ার এখতিয়ার দেন।

শনিবার নেভি কমান্ডার ড. শন কোনলি ও অন্য চিকিৎসকরা  যেসব বক্তব্য দিয়েছেন তাতে উত্তর মেলার চেয়ে প্রশ্নই বেশি উঠেছে। সংবাদ সম্মেলনে কোনলির কাছে ট্রাম্পের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির বিস্তারিত জানতে চাওয়া হচ্ছিলো। তবে বারবারই সাংবাদিকদের প্রশ্নকে এড়িয়ে গিয়ে কায়দা করে উত্তর দিতে দেখা গেছে তাকে। ট্রাম্পের কখনও সাপ্লিমেন্টাল অক্সিজেনের প্রয়োজন পড়েছে কিনা তা বলতে বার বারই অস্বীকৃতি জানিয়েছেন কোনলি। তার কাছে বার বারই জানতে চাওয়া হয়েছে-ট্রাম্পের শারীরিক তাপমাত্রা স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার আগে তার জ্বর কত বেশি ছিল। তবে সে প্রশ্নের জবাবও এড়িয়ে গেছেন তিনি।

ট্রাম্পের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তিকে উদ্ধৃত করে মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার সকালে ট্রাম্পকে অক্সিজেন দেওয়া হয়েছিল। আর ওইদিন বিকালে তাকে হেলিকপ্টারে করে সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনেও দাবি করা হয়েছে, ট্রাম্পকে অক্সিজেন দেওয়া হয়েছিল। অথচ অক্সিজেনের ব্যাপারে কোনলি বলেন, ‘বৃহস্পতিবার ট্রাম্পকে কোনও অক্সিজেন দেওয়া হয়নি, এ মুহূর্তেও অক্সিজেন চলছে না। আমরা সবাই যখন ছিলাম, তখনও তাকে অক্সিজেন দিতে দেখিনি।’ তবে তাদের অনুপস্থিতিতে বা কোনও একটা সময়ে ট্রাম্পকে অক্সিজেন দেওয়া হয়েছে কিনা সে প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেছেন তিনি।

কোনলি বলেন, ট্রাম্পের মৃদু কাশি, সর্দি ও ক্লান্তিসহ যে লক্ষণগুলো দেখা গিয়েছিল, তা এখন ঠিক হচ্ছে এবং অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। তার দাবি, ২৪ ঘণ্টা প্রেসিডেন্টের জ্বর ছিল না। তবে ট্রাম্প অ্যাসপিরিনও নিচ্ছেন। এটি শরীরের তাপমাত্র কমায়। কোনলি বলেছেন ট্রাম্প কোনও ধরনের জটিলতা ছাড়াই হাসপাতালে হাঁটাহাঁটি করতে পারছেন। শন ডুলি নামের আরেক চিকিৎসক ট্রাম্পের স্বাস্থ্য অবস্থা সম্পর্কে বলেন, ‘তার স্পৃহা অসাধারণ রকমের ভালো।’ তিনি জানান, প্রেসিডেন্টের হার্ট, কিডনি ও লিভারের কার্যক্রম স্বাভাবিক আছে। শ্বাস নিতে কিংবা হাঁটতে তার কষ্ট হচ্ছে না।’

করোনা মহামারির শুরু থেকেই তথ্য প্রকাশে ট্রাম্প প্রশাসনকে স্বচ্ছ থাকতে দেখা যায়নি। প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্য অবস্থা এবং হোয়াইট হাউজে কীভাবে করোনা ছড়ালো তা নিয়েও তাদের একই রকমের অবস্থান দেখা গেছে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগীর করোনা আক্রান্ত হওয়ার খবরটি প্রথম মিডিয়াতেই প্রকাশ হয়েছিল, হোয়াইট হাউস তা প্রকাশ করেনি। প্রেসিডেন্টের সহযোগীরা স্বাস্থ্য পরিস্থিতিজনিত তথ্য প্রকাশে অস্বীকৃতি জানাচ্ছিলেন। ট্রাম্পের শরীরে কী উপসর্গ আছে, তার কোন কোন পরীক্ষা করাতে হয়েছে, তার ফল কী-এসব তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছিলো না।

শুক্রবার (২ অক্টোবর) সকালে ট্রাম্প নিজেই টুইট করে জানান তার ও স্ত্রী মেলানিয়ার শরীরে বৃহস্পতিবার করোনাভাইরাস ধরা পড়েছে। এদিন বিকালে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রাতে কোনলি জানান, ট্রাম্পকে হাসপাতালে রেমডেসিভির ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের শরীরে করোনা শনাক্ত হওয়ার আগে সবশেষ তিনি কবে করোনা পরীক্ষা করিয়েছিলেন তা বলতে রাজি হননি তিনি। শুরুতে কোনলি ইঙ্গিত করেছিলেন, ট্রাম্পের ডায়াগনসিস হয়েছে ৭২ ঘণ্টা আগে। তার মানে বুধবারও ট্রাম্প নিশ্চিতভাবে করোনা আক্রান্ত ছিলেন। পরে কোনলি জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরে ট্রাম্পের শরীরে যথার্থভাবে করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তা হপ হিকস-এর করোনা পজিটিভ শনাক্তের পরই প্রেসিডেন্টের উপসর্গ দেখা যায় এবং পরীক্ষা করা হয়।

এপি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরস্পরবিরোধী কিংবা সাংঘর্ষিক এসব বক্তব্য হোয়াইট হাউজের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নে সংকট তৈরি করেছে। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশ যখন এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দাঁড়িয়ে, তখনই এ সংকট দেখা দিয়েছে। একদিকে ট্রাম্পকে আরও কিছুদিন হাসপাতালে থাকতে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর এদিকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ক্ষণও এগিয়ে আসছে। এমন অবস্থায় ট্রাম্পের শারীরিক অবস্থাকে উদ্বেগের চোখে দেখছে আমেরিকানরা।

যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করা সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত মার্ক ক্রিস্টোফার সানডে শো অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হোয়াইট হাউসের অবস্থান নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, হোয়াইট হাউস ট্রম্পের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে স্বচ্ছ কোনও অবস্থান নেয়নি।  তিনি বলেন, ‘খোদ হোয়াইট হাউজ থে্কে আমরা স্পষ্টভাবে কিছু জানতে পারছি না। ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা যা বলছেন তার তুলনায় মার্ক মিডোস ও হোয়াইট হাউজের সংবাদকর্মীদের বক্তব্য অনেক বেশি হতাশার। সুতরাং, ট্রাম্প নিজে এবং তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা যা বলছেন, তা নিয়ে বেশ সন্দেহ রয়েছে।’

/বিএ/

লাইভ

টপ
X