নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে উত্তেজনাকানহাইয়ার শুনানি চলাকালে আবারও হামলা

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৪:৩২, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৫, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৬

``রাষ্ট্রদ্রোহী স্লোগান` দেওয়া শিক্ষার্থীদের খোঁজে পুলিশের অভিযানজওহর লাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দেওয়া’ সব শিক্ষার্থীকে খুঁজে বের করতে ভারতের ৫টি রাজ্যে ব্যাপক তল্লাশি চালাচ্ছে ভারতীয় পুলিশ। তাদের দাবি, বহিরাগতরাও এ ঘটনায় জড়িত বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এদিকে বুধবার কানহাইয়া কুমারের বিরুদ্ধে মামলার শুনানির সময় আবারও দিল্লির একটি আদালত প্রাঙ্গণে আইনজীবীদের দু পক্ষের সংঘর্ষ এবং সাংবাদিকের ওপর হামলা হয়েছে। আর আজই (বুধবার) আদালত প্রাঙ্গণে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ওপর আইনজীবীদের আগের হামলার ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা পিটিশনের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। যে স্লোগানকে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ উল্লেখ করে নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ সভাপতি কানহাইয়া কুমারকে গ্রেফতার করা হয়েছে সে একই স্লোগান প্রতিধ্বনিত হয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কণ্ঠেও। আর গোটা পরিস্থিতি নিয়ে উত্তপ্ত ভারতের রাজনৈতিক ময়দান।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি ভারতের পার্লামেন্টে হামলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত আফজাল গুরুকে ২০১৩ সালে ফাঁসিতে ঝোলানোর বর্ষপূর্তি পালন করে ভারতের জওহরলাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল শিক্ষার্থী। সেসময় তারা রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিজেপি নেতা মহেশ গিরি ও বিজেপির ছাত্র শাখা এবিভিপির দায়ের করা অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সভাপতি কানহাইয়া কুমারকে গ্রেফতার করা হয়।

৫ রাজ্যে ব্যাপক তল্লাশি চলছে

বুধবার, ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিযুক্ত সব শিক্ষার্থীকে খুঁজতে দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, বিহার, মহারাষ্ট্র এবং জম্মু-কাশ্মিরে দিল্লি পুলিশের অভিযান চলছে।

পুলিশের দাবি ‘রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দেওয়া’ সব শিক্ষার্থীকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন তারা। ওই শিক্ষার্থীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে প্রমাণ না থাকায় পুলিশ পিছু হটেছে বলে যে গুঞ্জন উঠেছে তা নাকচ করে দিয়েছেন দিল্লি পুলিশের প্রধান বিএস বাস্যি। তিনি বলেন, ‘ঘটনার মূল চত্রান্তকারীদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছি আমরা। বহিরাগতদের জড়িত থাকার ইঙ্গিতও আমরা পেয়েছি।’

দিল্লি কোর্ট প্রাঙ্গণে উত্তেজনা

আদালত প্রাঙ্গণে আবারও হামলা

বুধবার কানহাইয়া কুমারের বিরুদ্ধে মামলার শুনানি চলার সময় আবারও দিল্লির পাটিয়ালা হাউজ আদালত প্রাঙ্গণে আইনজীবীদের হামলা হয়েছে। এর আগে গত সোমবারও এখানে আইনজীবীরা সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছিলেন। এনডিটিভি জানায়, আদালতে সহিংসতা ঠেকাতে শুনানির সময় কড়া বিধি নিষেধ আরোপ করে সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের ভেতরে কেবল ৫ জন রিপোর্টার ও দুজন শিক্ষার্থী অবস্থান করতে পারবেন বলে ঘোষণা করা হয়। তবে সুপ্রিম কোর্টের সে কড়াকড়ি আরোপ সত্ত্বেও এদিন তারিক আনোয়ার নামে ফার্স্ট পোস্টের এক রিপোর্টারকে পিটিয়েছে আইনজীবীদের একটি দল। তারিকের অভিযোগ, আগের দিনের মতো বুধবারও হামলার সময় পুলিশ নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। তিনি জানান, এদিন আইনজীবীদের দুটি পক্ষ পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে পড়ে।  এক পক্ষ কানহাইয়ার পক্ষে আর আরেক পক্ষ কানহাইয়ার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে স্লোগান দিতে থাকে। পরে আইনজীবীদের দু পক্ষের সংঘর্ষের এক পর্যায়ে ওই সাংবাদিককে পেটানো হয়। সোমবারের মতোই বুধবারের হামলার জন্য বিক্রম চৌহানকে দায়ী করা হয়েছে।

আদালত প্রাঙ্গণে আগের হামলার ঘটনায় শুনানি

আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর আইনজীবীদের হামলার বিরুদ্ধে নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের করা আবেদনের ব্যাপারে বুধবার ভারতের সুপ্রিম কোর্টে শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। এনডি জয়প্রকাশের দায়ের করা ওই পিটিশনে ওই ধরনের হামলার ঘটনা যেন ভবিষ্যতে না ঘটে তা নিশ্চিত করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দিল্লি পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

মঙ্গলবার সাংবাদিকদের একটি দলও ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে দেখা করেন। তাদের অভিযোগ, আদালত প্রাঙ্গণে পুলিশের উপস্থিতিতেই জেএনইউর শিক্ষার্থী-শিক্ষক ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়েছে বেশ কিছু লোক। পুলিশ হামলা থামাতে কোন ভূমিকা নেয়নি।

ঘটনার ভিডিওতে দেখা যায়, আইনজীবীদের একটি দল হামলার সময় ‘ভারত দীর্ঘজীবী হোক, জেএনইউ নিপাত যাক’ স্লোগান দেন। বিজেপির সাংসদ ওপি শর্মাকেও আদালতের বাইরে এক ব্যক্তিকে হামলা করতে দেখা যায়। শর্মার অভিযোগ ওই ব্যক্তি পাকিস্তানের পক্ষে স্লোগান দিচ্ছিলেন।   এক আইনজীবীকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ওপর হামলার সময় আদালতের ভেতর এক ব্যক্তিকে লাথি দিতে দেখা যায়। এ সময় সাংবাদিকরা হামলা ও হুমকির শিকার হন। অনেকের মোবাইলও কেড়ে নেওয়া হয়।




যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ

এদিকে মঙ্গলবার বিকালে পার্লামেন্টে দোষী সাব্যস্ত আফজাল গুরুর ফাঁসির বিরোধিতা করে এবং নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ সভাপতি কানহাইয়ার মুক্তির দাবিতে মিছিল করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী। গোলপার্ক থেকে শুরু হওয়া মশাল মিছিলে তারা কাশ্মিরের স্বাধীনতার দাবিতেও স্লোগান দেন বলে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো। এরইমধ্যে ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।

নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সমর্থনে বিক্ষোভ

কানহাইয়া আদৌ রাষ্ট্রদ্রোহী স্লোগান দিয়েছেন কিনা তা নিয়ে সংশয়

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম স্ক্রল.ইনের খবরে বলা হয়েছে, আফজাল গুরুর ফাঁসি কার্যকরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত ছাত্রনেতা কানহাইয়া কুমার সম্ভবত রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দেননি; এমন দাবি করেছে খোদ ভারতের নিরপত্তা সূত্র। স্ক্রল.ইনের দাবি, জওহরলাল  নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট ইউনিয়নের এই সভাপতির গ্রেফতার নিয়ে যখন ভারতজুড়ে তোলপাড় চলছে, ঠিক তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণ দিল্লির কিছু পুলিশ কর্মকর্তার অতি উৎসাহী ভূমিকার ফল হতে পারে।  তবে এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত কানহাইয়াকে রাষ্ট্রবিরোধী মনে করার অবস্থানে অনড় রয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। মঙ্গলবার জওহর লাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে দিল্লি হাইকোর্টকে জানানো হয়, ‘ওই ঘটনা তরুণদের ভুল নাকি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ সে ব্যাপারে তদন্ত চলছে’।

পক্ষে-বিপক্ষের মত

কানহাইয়াকে গ্রেফতার ও নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ধরপাকড়ের ঘটনা নিয়ে উত্তপ্ত রয়েছে রাজনীতির ময়দান। রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করেন না বলে দাবি করলেও জওহর লাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন বিরোধী দলীয় নেতাদের অনেকে। তবে ক্ষমতাসীন বিজেপি নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার দায় দিয়ে আসলেও নিজ দলের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বিজেপি নেতা শত্রুঘ্ন সিনহা। অবিলম্বে কানহাইয়ার মুক্তির দাবি তুলেছেন তিনি। টুইটারে বিজেপি সাংসদ লিখেছেন, ‘কানহাইয়া কোনও দেশবিরোধী অথবা সংবিধানবিরোধী কথা বলেননি। জেএনইউ-তে সমস্যার কারণ আসলে কী, তা খুব ভালভাবেই জানেন রাজনৈতিক নেতারা।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক খ্যাতি রয়েছে। কোনও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আলটপকা মন্তব্য করার আগে প্রত্যেকের সতর্ক হওয়া উচিত।’

এদিকে পদ্মবিভূষণ পুরস্কারবিজয়ী  আধ্যাত্মিক নেতা শ্রী শ্রী রবি শংকর বলেন, যে কোনও মূল্যে মত প্রকাশের অধিকারের সুরক্ষা দেওয়ার পক্ষপাতী তিনি। তবে তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান কোনও গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, এবিপি আনন্দ

/এফইউ/বিএ/

লাইভ

টপ