বিয়ে কেন নারীদের জন্য নেতিবাচক

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৮:৫৪, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৩১, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০১৬

বিশ শতকের সুখ্যাত এক লেখক ও রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন এমা গোল্ডম্যান। তিনি ছিলেন একজন বামপন্থী, একজন নারীবাদী। নিজের অরাজপন্থী রাজনৈতিক দর্শনের পরিসর থেকে তিনি ‘বিয়ে ও ভালোবাসা’ নামের এক লেখায় দেখিয়েছিলেন কী করে বিয়ে সমাজে একটি বীমা চুক্তির মতো কাজ করে, নারীর জন্য অধস্তনতার সংস্কৃতি নির্মাণ করে এবং পুরুষতান্ত্রিক ব্যক্তিমালিকানা রক্ষায় ব্যবহৃত হয়। বিয়ে নামের কৃত্রিম প্রতিষ্ঠান কী করে ভালোবাসাকে যান্ত্রিক করে তোলে সেটাও দেখিয়েছিলেন তিনি। এমা গোল্ডম্যান নন কেবল, তার ধারাবাহিকতায় অনেক অনেক চিন্তাবিদ বিয়েকে যান্ত্রিক-ভালোবাসাহীন এক নির্মিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেছেন। এমনই একজন মানুষ হলেন নিউইয়র্কভিত্তিক নারীবাদী লেখক সুসান কক্স। তার মতে, বিয়ে হলো এমন একটি আইনি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান যা কোন সুবিধা দিলে তা কেবল পুরুষকেই দেয়। নারীরা আদতে বৈবাহিক জীবনেই সবচেয়ে বঞ্চনার শিকার হন বলেই তার মত। নারীদের কেন বিয়ে করা উচিত নয়, তার কয়েকটি কারণ উল্লেখ করে নারীবাদী ওয়েবমাধ্যম ফেমিনিস্ট কারেন্টে একটি নিবন্ধ লিখেছেন সুসান। তার সে নিবন্ধের আলোকে নারীদের বিয়ে করার ৭টি নেতিবাচক দিক তুলে ধরা হলো।

বিয়ে কেবল পুরুষদের লাভবান করে, নারীদের নয়

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে বিয়ে করার মধ্য দিয়ে পুরুষরাই কেবল সুবিধা পায়। তাদের স্বাস্থ্য, সম্পদ এবং সুখবোধ বাড়ে। অন্যদিকে বিবাহিত নারীর ক্ষেত্রে আর যাই হোক না কেন, অন্তত অবিবাহিত অবস্থা থেকে ভালো পরিস্থিতি তৈরি হয় না।

স্ত্রীদের জন্য সমাজের রীতিনীতি খুবই বাজে। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষরা এমনভাবে গড়ে ওঠে যে স্ত্রী ছাড়া যেন তারা তাদের পোশাকও ঠিকমতো পরতে পারে না। ঘরোয়া কাজকর্মে শিশুদের মতো করেই স্ত্রীরা স্বামীর যত্ন নেবেন এমনটা আশা করা হয়। তারা খেয়েছেন কিনা, তাদের পোশাক গোছানো আছে কিনা, তাদের জিনিসপত্র জায়গামতো রাখা আছে কিনা এসব খেয়াল রাখা যেন স্ত্রীর দায়িত্ব হয়ে পড়ে। অন্যদিকে পুরুষের কাছ থেকে খুব কমই আশা করা হয়।

পুরুষরা বিয়ে করার পরও তাদের ক্যারিয়ার অবিবাহিত অবস্থার মতোই চালিয়ে নিতে পারেন। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তারা বরং বিয়ের পর ক্যারিয়ারে ভালো সুবিধা পান। বিয়ের পর কর্মস্থলে পুরুষদের দায়িত্ববান আর স্থির বলে বিবেচনা করা হয়। তাদের পদোন্নতির সুযোগ বাড়ে। অন্যদিকে বিয়ের পর নারীদের ওপর আস্থা হারায় কর্মস্থল। কর্মজীবী নারী বিয়ে করার পরই নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান উদ্বেগে পড়ে যে এই বুঝি সে সন্তান সম্ভবা হয়ে পড়বে, মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যাবে, কাজের চেয়ে সন্তানকে বেশি গুরুত্ব দেবে।

পুরুষদের নারীদের চেয়ে বেশি উপার্জনক্ষম বলে মনে করা হয়। আর সেকারণে স্ত্রীর চেয়ে স্বামীর ক্যারিয়ারকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। আবার যদি এমন হয় যে স্ত্রী চাকরি করছেন না তারপরও তাকে ঘরে কাজ করতে হচ্ছে। কিন্তু সে কাজকে কেউ কাজ হিসেবে বিবেচনা করে না। স্ত্রীরা ভাবতে থাকেন তারা বুঝি পরিবারের জন্য অবদান রাখছেন না। অথচ দুজনই একইসময় ধরে কাজ করে যাচ্ছেন।

 

 

বিয়ে একাকিত্ব দূর করতে পারে না বরং বিচ্ছিন্নতা বাড়ায়

অবিবাহিত অবস্থায় একজন নারীর জন্য সব দরজা খোলা। চাইলে তিনি ঘুরতে যেতে পারেন, লোকজনের সঙ্গে দেখা করতে পারেন, সংগঠনে যোগ দিতে পারেন যা খুশি করতে পারেন। কিন্তু বিবাহিত অবস্থায় এসব কিছুর পরিবর্তন হতে শুরু করে। সামাজিক প্রথা নারীদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করাতে চায় যে পরিবারই সবার আগে।

সুবিধাজনক সময়ে অল্প ক’জন বন্ধুর সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ মেলে কখনও কখনও। সেটা কেবলই অবসর সময়ে। স্বামীর সঙ্গে কাটানোর জন্য নির্ধারিত সময়ে অন্য কোথাও আড্ডা দেওয়ার সুযোগ খুব কমই পান নারীরা।  

 

অনিচ্ছাকৃত যৌন সম্পর্ক

বিয়ে এমন একটি কাঠামো যা যৌন সম্পর্ককে নির্ধারণ করে দেয়। স্ত্রী যতো হতাশ, কিংবা নির্লিপ্ত থাকেন না কেন, তারা চেষ্টা করেন স্বামীর যৌনাকাঙ্ক্ষা মেটাতে। কেবল তাই নয়, স্বামীর জন্য ‘যৌন আবেদন ধরে রাখা’ যেন বিশ্বব্যাপী একটি শিক্ষণীয় বস্তুতে পরিণত হয়েছে। বই, ব্লগ কিংবা ম্যাগাজিনে নিবন্ধ লিখে নারীদের রীতিমত যৌন আবেদন ধরে রাখার শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। আগে স্ত্রীরা নিজেরা সে চেষ্টা করতেন আর এখন সে চেষ্টাকে সফল করতে ওষুধ উদ্ভাবন করা হচ্ছে। দ্য ইউএস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন থেকে নারীদের জন্য ভায়াগ্রার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে; যার মধ্য দিয়ে পুরুষ সঙ্গীর প্রতি নারীর আকাঙ্ক্ষার কমতিতে পরিবর্তন ঘটবে।

 

প্রেমিককে যেকোনও সময় ছেড়ে যাওয়া যায়, স্বামীকে নয়

হয়তো একসঙ্গে পড়াশোনা করতে গিয়ে চোখে চোখ পড়েছে। প্রেম হয়েছে। কিন্তু এখন আর তাকে ভালো লাগছে না। তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না। এমনটা যদি প্রেমিকের ক্ষেত্রে হয় তখন খুব সহজেই একটি নারী সম্পর্ক ভেঙে দিতে পারেন। সব বিরক্তি ঝেড়ে ফেলতে পারেন। ডিভোর্সের মতো আইনি জটিলতায় তাকে যেতে হয় না। কিন্তু বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি একেবারে আলাদা। 

 

ডিভোর্স নেওয়ার ঝক্কি ঝামেলা

বিয়ে করা খুব সহজ একটি ব্যাপার। দু’পক্ষের সম্মতি। একটি কাগজে সই। ব্যস হয়ে গেল! কিন্তু ডিভোর্সের অনেক জটিলতা। এর মানে হলো আমাদের পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি যে নারীদের সহজে বিয়ের ফাঁদে ফেলা যায়। কিন্তু এরপর সে ফাঁদ থেকে বের হয়ে আসা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

 

বিয়ে করে কেউ পূর্ণাঙ্গ হয় না

বিয়েকে প্রাপ্তবয়স্ক হ্ওয়ার পর একটি গুরুত্বপূর্ণ রীতি ও অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।  যখন কেউ বিয়ে করেন তখন সবাই তাকে স্বীকৃতি দেয় এবং তার জন্য আনন্দ করে। বিয়ে যেন সমাজের প্রতি অঙ্গীকার রক্ষার প্রতীক, একটি সম্পর্ককে বৈধতা দান। বিবাহিত ব্যক্তিকে দায়িত্ববান এবং প্রাপ্তবয়স্ক বলে বিবেচনা করা হয়।  সত্যিকারের ‘প্রাপ্তবয়স্ক’! লোকজন তাকে মিসেস কিংবা ম্যাডাম বলে সম্বোধন করবে এমন ধরনের ‘প্রাপ্তবয়স্ক’। অথচ সবই ভুল।

আমরা এমন একটি পুরুষশাসিত সমাজে বাস করি যেখানে নারীর সম্পর্ককে পুরুষের মালিকানায় বৈধতা দেওয়া হয়। দীর্ঘদিনের ইতিহাস খতিয়ে দেখলে বোঝা যায় বিয়ে হলো মালিকানার পরিবর্তন যা বাবা থেকে স্বামীর হাতে যায়।

 

বিয়ে না করে কী হবে?

এ প্রশ্নটি মনে আসতেই পারে। কারও মনে বিয়ের দিনটির আকাঙক্ষা থাকতে পারে। ওই দিনটি নিয়ে অনেক পরিকল্পনা থাকতে পারে। অনেক আয়োজন আর আনন্দ করার স্বপ্ন থাকতে পারে। সে ইচ্ছে অন্যভাবেও বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। নিজের বিয়ের আয়োজন না করে অন্য কারও বিয়েতে যোগ দেওয়া যেতে পারে। এতে মজা হবে। আর তার চেয়েও ভালো সকল বন্ধু ও স্বজনদের নিয়ে বড় একটি পার্টি দেওয়া। তাতেই মিটে যেতে পারে স্বপ্ন।

 

যদি চিরকুমারি থাকা যায়?

জীবনে কোনও পুরুষ থাকবে না। কোনও সন্তান থাকবে না। শুধুই নিজেকে নিয়েই জীবন। এটা কি কোনও কষ্টের জীবন হবে বলে মনে হয়? চিরকুমারি থাকা মানে এই নয় যে, জীবনে শূন্যতা তৈরি হওয়া। এ জীবনের মধ্যে ভগ্নিত্বের বোধ (সিসটারহুড), বন্ধুত্ব, সৌহার্দ্য এবং রাজনৈতিক সংহতি থাকতে পারে। প্রেমিকও থাকতে পারে। চাইলে বাচ্চাও থাকতে পারে। ওই অবস্থায়ও মা হওয়া যেতে পারে। জৈবিকভাবে মা না হলেও বন্ধু, ভাই-বোনদের সন্তানদের লালন-পালন করা যেতে পারে।

অনেক উপায় আছে। পুরুষশাসিত সমাজের দেখানো পথে চলার কারণে আমরা সে উপায়গুলো দেখতে পাই না। আর সে সমাজ আমাদের দেখায় কীভাবে একজন পুরুষের জন্য নিজেকে নিবেদিত করতে হবে। সবটুকু ভালোবাসা তাকে দিতে হবে। একজন পুরুষের প্রতি নিজেকে নিবেদিত না করে নিজের কাছেই কি নিজেকে সমর্পণ করা যায় না? বোধহয় যায়। তাতে বোধহয় নারীর নিজেরই উপকার।

/এফইউ/বিএ/

লাইভ

টপ