উত্তর মেরু অঞ্চলে অবস্থিত ওয়েডেল সাগর ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার একটি অংশকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব বাতিল হয়ে গেছে চীন, রাশিয়া ও নরওয়ের বিরোধিতায়। যুক্তরাজ্যের মতো দেশের সমর্থন ও বিজ্ঞানীদের উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণকে উপেক্ষা করেই এমন বড় প্রকল্প বাতিল করে দেওয়ায় হতাশ সংশ্লিষ্টরা। পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিনপিসের একজন কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, কূটনীতিকরা প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার চেয়ে সাগরে মাছ ধরার ব্যবসার সম্প্রসারণেই বেশি আগ্রহী। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, ১৯৭০ সাল থেকে এ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে মানুষ ৬০ শতাংশ বন্যপ্রাণী সাফ করে ফেলেছে। মানুষের হাত থেকে প্রাণবৈচিত্র্যকে রক্ষা করতে ও মানুষকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে রক্ষা করতে সামুদ্রিক অভয়ারণ্যটি অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারত।
পরিবেশবাদীরা ওয়েডেল সাগর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার ১৮ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে সামুদ্রিক অভয়ারণ্য গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। বাস্তবায়িত হলে তার মোট এলাকার পরিমাণ হতো জার্মানির মোট এলাকার পাঁচ গুণ বড়। গত শুক্রবার (২ নভেম্বর) সামুদ্রিক প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার জন্য গঠিত ‘কমিশন ফর দ্য কনজারভেশন অব অ্যান্টার্টিক মেরিন লিভিং রিসোর্সেসের’ (সিসিএএমএলআর) এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় তাসমানিয়ার হোবার্টে। সেখানে মূলত চীন, রাশিয়া ও নরওয়ের ভূমিকার কারণে প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়। প্রস্তাবটির পক্ষে সমর্থন জানিয়েছিলেন ২০ লাখ মানুষ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের হতাশ হতে হয়েছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিনপিসের ‘প্রোটেক্ট অ্যান্টার্টিক’ প্রকল্পের ফ্রিডা বেংটসন বলেছেন, ‘উত্তর মেরু অঞ্চলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক অভয়ারণ্য তৈরির জন্য এটি ছিল এক সুবর্ণ সুযোগ। কার্যকর করা গেলে একদিকে যেমন প্রাণবৈচিত্র্য বৈচিত্র রক্ষায় অবদান রাখা যেত তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ঠেকাতেও ভূমিকা রাখত প্রকল্পটি। ২২ জন প্রতিনিধি এখানে এসেছিলেন আলোচনার জন্য। কিন্তু এমন একটি বৈজ্ঞানিকভাবে যুক্তিযুক্ত প্রস্তাবকে তারা নস্যাৎ করে দিলেন যাদের সঙ্গে বিজ্ঞানের কার্যত কোনও সম্পর্ক নেই।’ এদিকে সিসিএএমএলআর এ বিষয়ে সরাসরি কোনও মন্তব্য না করে তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলেছে, শুক্রবারের সভায় ‘অনেক আলোচনা’ হয়েছে, আগামী বছর আরও ‘আলোচনা’ হবে।
যুক্তরাজ্য এই পরিকল্পনায় সমর্থন দিয়েছিল। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধি দল আলোচনায়ও উপস্থিত ছিল। ব্রিটিশ মন্ত্রী অ্যালান ডানকান মন্তব্য করেছেন, ‘এমন প্রকল্প আমাদের একার পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এর জন্য বিভিন্ন দেশের মধ্যে আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদিত হতে হবে। সিসিএএমএলআরে প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে গেছে অন্যান্যদের বিরোধিতায়।’ ভবিষ্যতে উত্তর মেরু অঞ্চলের সাগরে সামুদ্রিক অভয়ারণ্য তৈরির প্রস্তাবের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এই ব্রিটিশ মন্ত্রী।
মানুষ যে পরিবেশের অনেক বড় ক্ষতি করছে তা বোঝাতে বিজ্ঞানীদের প্রমাণের পর প্রমাণ হাজিরের প্রেক্ষিতে এমন অভয়ারণ্য তৈরির প্রস্তাব নিয়ে কাজ শুরু হয়। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ১৯৭০ সাল থেকে এ পর্যন্ত সময়ের মধ্যেই মানুষ বিশ্বের ৬০ শতাংশ বন্যপ্রাণী সাফ করে ফেলেছে, যা ভবিষ্যতে মানব জাতির জন্য বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনবে। গত মাসে জাতিসংঘ সতর্ক করে দিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে প্রশমিত করতে মানুষের হাতে আর মাত্র ১২ বছর সময় রয়েছে।
শুক্রবারের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর গ্রিন পিসের কর্মকর্তা বেংটসন বলেছেন, সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের ৩০ শতাংশ সাগরে অভয়ারণ্য তৈরি করতে হবে খাদ্য সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করতে। কিন্তু কূটনীতিকদের দেখে মনে হচ্ছে, অভয়ারণ্য তৈরির চেয়ে মাছ ধরার ব্যবসা সম্প্রসারণেই তাদের বেশি আগ্রহ। সাধারণ মানুষের উচিত তাদের দেশের নেতাদের ওপর চাপ তৈরি করা যাতে সব শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই সমুদ্রগুলোকে সুরক্ষিত করা যায়।
তার ভাষ্য, ‘যদি সামুদ্রিক প্রাণবৈচিত্র্যকে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে অ্যান্টার্টিক কমিশনের মতো সংগঠন ব্যর্থ হতে থাকে তাহলে ধরে নিতে হবে তারা পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্য পূরণে অযোগ্য এবং তাদের কাছ থেকে কিছু আশা করে লাভ নেই। এর বদলে আমাদের উচিত হবে জাতিসংঘের অধীনে সমুদ্রবিষয়ক বৈশ্বিক চুক্তিটি কার্যকরের দিকে মনোনিবেশ করা।’







