X
বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২২, ১৩ মাঘ ১৪২৮
সেকশনস

ঘুমের ঘোরে হাত বাড়ায় ওরা, পায় না মাকে

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২২, ২১:৪৬

বিছানা যতই তুলতুলে হোক, সাড়ে সাত হাজার কিলোমিটার দূরে মা-বাবাকে ফেলে এসে ঘুমাতে পারে না ওরা। গভীর রাতে ফোঁপানোর শব্দে ভারী হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে থাকা আফগান শরণার্থী আশ্রয়কেন্দ্রগুলো। খাবার, চিকিৎসা ও যত্নের অভাব নেই। এমনকি স্কুলেও যাচ্ছে কেউ কেউ। তবু প্রশ্ন রয়ে যায়, আফগান শিশুর ক্ষুধা কি মিটবে আমেরিকান দুধভাতে? তালেবানের আগ্রাসন আর আইএস-এর বোমাবাজির সময় তাড়াহুড়ো করে উড়োজাহাজে চড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসা হাজারো আফগান শিশু জানে না, এ জীবনে তারা আর পরিবারের দেখা পাবে কিনা।

খাবার, চিকিৎসা ও যত্নের অভাব নেই। এমনকি স্কুলেও যাচ্ছে কেউ কেউ

হয়তো একদিন দেখা হতেও পারে। ততদিনে অনেকেরই কেটে যাবে শৈশব। ততদিনে তাদের অনেকের নতুন জীবন গড়ে উঠবে আমেরিকান মাটিতে। কারও ক্ষত শুকাবে, কেউ বা প্রতিটি ক্ষণ খুঁজতে থাকবে ফেলে আসা পরিবারের কাছে যাওয়ার কোনও না কোনও রাস্তা।

বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে আফগানিস্তান ইস্যু এখন মৃতপ্রায়। কিন্তু ঘটনাচক্রে মার্কিন সরকারের জিম্মায় যে ১ হাজার ৪৫০ আফগান শিশু এসে পড়েছে, তাদের ব্যাপারে হয়নি কোনও সিদ্ধান্ত। সিএনএন’কে বাইডেন সরকারের কোনও পক্ষ জানাতে পারেনি, পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া শিশুগুলো আবার তাদের স্বজনদের সঙ্গে এক ছাদের তলায় থাকতে পারবে কিনা।

মুখে বোল ফোটেনি এমন শিশু থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোরও আছে এ তালিকায়। আশ্রয়কেন্দ্রে তাদের ছোট ছোট দলে রাখা হয়েছে স্পন্সর করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জিম্মায়। ভাগ্যবান কেউ হয়তো কাছে পেয়েছে আপন খালাকে, কেউ বা প্রতিবেশীকে। আবার অনেককে তুলে দেওয়া হয়েছে আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে আসা নিকটাত্মীয়ের হাতে। কিন্তু অফিস অব রিফিউজি রিসেটলমেন্টের দেওয়া তথ্যমতে, প্রায় আড়াইশ’ শিশু আছে, যারা বলতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রে একেবারে একা। তবে সিএনএন কারও কাছ থেকে সঠিক পরিসংখ্যান জানতে পারেনি বলে জানিয়েছে তাদের প্রতিবেদনে।

 

ভিডিও কলের জীবন

নর্দার্ন ভার্জিনিয়ায় আছে রামিন (১৭) ও এমাল (১৬)। দুজন বন্ধু। কাবুল বিমানবন্দরে হামলার সময় দুজনই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যার যার মা-বাবার কাছ থেকে। এরমধ্যে এমালের চাচা তাদের সঙ্গে জায়গা পায় প্লেনে। তিনিই এখন রোজ দুই বন্ধুকে ভিডিও কলে কথা বলিয়ে দিচ্ছেন আফগানিস্তানে পড়ে থাকা মা-বাবার সঙ্গে। আফগান-আমেরিকান ফাউন্ডেশনের বোর্ড মেম্বার ওয়াইদা আমির বললেন, ‘রামিন আসার পর থেকেই ফিরে যাওয়ার জন্য পাগলপ্রায় ছিল। ও বেশি মিস করছে তার ১৮ মাস বয়সী ছোট ভাইটাকে। দুজন বলতে গেলে চব্বিশটা ঘণ্টা একসঙ্গেই থাকতো।’

হয়তো একদিন দেখা হতেও পারে। ততদিনে অনেকেরই কেটে যাবে শৈশব

মাসখানেক ধরে কান্নাকাটির পর রামিন ও এমাল এখন অনেকটাই বুঝতে পেরেছে তাদের ভবিতব্য। প্রতিদিন যে একবার ভিডিও কলে কথা বলতে পারছে, আপাতত এটাই তাদের লাইফলাইন। এমাল বললো, ‘আমি তাদের (পরিবারের) সঙ্গে কথা বলার সময় চেহারার দিকে তাকাতে পারি না। ওদের কষ্ট দেখলে আমি ঘুমাতে পারি না।’

 

তুমি আমার মায়ের মতো

এ শিশুদের সঙ্গে পরিবারকে একত্র করা বা ওদের প্রত্যাবর্তন নিয়ে আইনজীবী ও বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলেছিল সিএনএন। কিন্তু কেউই পরিষ্কার কিছু বলতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসী শিশুদের নিয়ে কাজ করা সংস্থা কিডস ইন নিডস অব ডিফেন্স-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেনিফার পডকাল জানালেন, ‘এই শিশুদের তাদের পরিবারের কাছে কে পাঠাবে? বিশাল এ প্রশ্নটার উত্তর বের করার চেষ্টা করছি আমরা।’

আশ্রয়কেন্দ্রে তাদেরকে ছোট ছোট দলে রাখা হয়েছে স্পন্সর করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জিম্মায়

ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান সার্ভিসও বলছে, মার্কিন সরকার এ পরিস্থিতি সমাধানে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। কিন্তু সেই সর্বোচ্চ চেষ্টাটা এখনও আটকে আছে স্পন্সরশিপ আর বিভিন্ন কেয়ার সেন্টারে। এর মানে হলো, অভিভাবকহীন যে শিশুরা উড়োজাহাজে করে যুক্তরাষ্ট্রে চলে এসেছে তাদের একটি করে স্পন্সর পরিবারের জিম্মায় তুলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এ নিয়ে অবশ্য সিএনএন-এর সঙ্গে কথা বলতে রাজি হয়নি হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কিংবা মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর।

তবে অফিস ফর রিফিউজি রিসেটলমেন্ট (ওআরআর) বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে আসা এই শিশুদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাসহ পরিবারকে কাছে আনার চেষ্টা অব্যাহত আছে। কারণ, ওআরআর-এর আইনজীবীরা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে গিয়ে দেখেছেন, যাবতীয় সুযোগ-সুবিধার পরও শিশুগুলো কতটা মানসিক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।

মুসলিম উইম্যানস রিসোর্স সেন্টারের প্রধান শিমা কোরেশি জানালেন, শিকাগোতে আফগান শিশুদের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে তিনি পা রাখলেই সবাই ছুটে এসে বলতে থাকে তারা তাদের পরিবারের কাছে যেতে চায়। যারা এখনও অবুঝ, তারা শিমাকেই জড়িয়ে ধরতে চায় বারবার। তারা বলে, ‘তুমি আমার মায়ের মতো দেখতে।’

কোরেশি জানালেন, তিনি তাদের ভেতর নিজের ছায়া দেখতে পান। কারণ, ঠিক ৩০ বছর আগে তিনি নিজেও মা-বাবাকে হারিয়ে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন।

 

মিনার কান্না থামে না

আপাতত যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে সমাধান একটাই, এ শিশুদের খাওয়া-পরার যেন সমস্যা না হয় সে জন্য যত দ্রুত সম্ভব ফস্টার পরিবার তথা দত্তকের ব্যবস্থা করা। কিন্তু মা-বাবা বা নিকটাত্মীয় আফগানিস্তানে বেঁচে থাকতে তারা আরেক পরিবারে কীভাবে মানসিকভাবে ভালো থাকবে সে প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছে বড়রা।

মুখে বোল ফোটেনি এমন শিশু থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোরও আছে এ তালিকায়

এমনকি নিজের আত্মীয়ের কাছে থেকেও রাতে ঘুমাতে পারছে না অনেক শিশু। সেপ্টেম্বরে জার্মানি হয়ে আমেরিকায় আসতে পেরেছিল আট বছরের মিনা ও ১৩ বছরের আহমেদ ফয়সাল। ভার্জিনিয়ায় তারা এখন ফারিস্তা খালার কাছে আছে। ফারিস্তা জানালেন, মিনা এখনও প্রশ্ন করে যায়, কেন তার মা তাদের সঙ্গে নেই। ফারিস্তা এখনও সত্য লুকিয়ে রেখেছেন। জানতে দেননি, তাদের পালিয়ে আসার দিনেই কাবুলে বোমা হামলায় তার মা মারা গিয়েছিলেন। ‘রাত হলেই সে কাঁদতে শুরু করে। ঘুম আসার আগ পর্যন্ত কান্না থামে না। মাঝে মাঝে তাকে থামানোই যায় না’, সিএনএন-কে বললেন ফারিস্তা।

অনেককে তুলে দেওয়া হয়েছে আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে আসা নিকটাত্মীয়ের হাতে

ওদিকে মিনা আর ফয়সালের বাবা কিন্তু বেঁচে আছেন। ফারিস্তা জানালেন, তাকে যদি কেউ খবর না দিয়ে থাকে, তবে বেচারা এখনও তার সন্তানদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন। সেই খবর জানানোটাও কঠিন। কারণ, উড়োজাহাজে চড়ার সময় অনেকেই নিরাপত্তার কারণে নাম ও জন্ম তারিখ ভুলভাল দিয়েছিল। ওই তালিকা ধরে কাউকে খুঁজে বের করা প্রায় অসম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্রে আগে থেকে বাস করা অনেক আফগান-আমেরিকানই এসব শিশুকে দত্তক নিতে আগ্রহী। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মে চাইলেই সেটা সম্ভব নয়। সান দিয়াগোর এক শিশু বিশেষজ্ঞ পেরিনো জানালেন, ফস্টার প্যারেন্ট হওয়াটা দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। যতজন আবেদন করেছেন তাদের বেশিরভাগই আইন অনুযায়ী দত্তক নেওয়ার যোগ্য নন। আর এভাবেই নানা কূটনীতি আর কাগজপত্রের চক্রে কেটে যাচ্ছে হাজারো শিশুর বিষণ্ন দিনরাত্রি।

 

/এএ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
সুতার ওপর ঝুলছে আফগানিস্তান: জাতিসংঘ প্রধান
সুতার ওপর ঝুলছে আফগানিস্তান: জাতিসংঘ প্রধান
ইউক্রেন সংকট: রুশ দাবি প্রত্যাখ্যান যুক্তরাষ্ট্রের
ইউক্রেন সংকট: রুশ দাবি প্রত্যাখ্যান যুক্তরাষ্ট্রের
রাশিয়া-ইউক্রেন উত্তেজনা: পূর্ব ইউরোপে সেনা মোতায়েন নিয়ে বিভক্ত ন্যাটো
রাশিয়া-ইউক্রেন উত্তেজনা: পূর্ব ইউরোপে সেনা মোতায়েন নিয়ে বিভক্ত ন্যাটো
নিষেধাজ্ঞায় পুতিনের ব্যক্তিগত ক্ষতি হবে না: ক্রেমলিন
নিষেধাজ্ঞায় পুতিনের ব্যক্তিগত ক্ষতি হবে না: ক্রেমলিন
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সুতার ওপর ঝুলছে আফগানিস্তান: জাতিসংঘ প্রধান
সুতার ওপর ঝুলছে আফগানিস্তান: জাতিসংঘ প্রধান
ইউক্রেন সংকট: রুশ দাবি প্রত্যাখ্যান যুক্তরাষ্ট্রের
ইউক্রেন সংকট: রুশ দাবি প্রত্যাখ্যান যুক্তরাষ্ট্রের
রাশিয়া-ইউক্রেন উত্তেজনা: পূর্ব ইউরোপে সেনা মোতায়েন নিয়ে বিভক্ত ন্যাটো
রাশিয়া-ইউক্রেন উত্তেজনা: পূর্ব ইউরোপে সেনা মোতায়েন নিয়ে বিভক্ত ন্যাটো
নিষেধাজ্ঞায় পুতিনের ব্যক্তিগত ক্ষতি হবে না: ক্রেমলিন
নিষেধাজ্ঞায় পুতিনের ব্যক্তিগত ক্ষতি হবে না: ক্রেমলিন
মার্কিন নাগরিকদের ইউক্রেন ত্যাগ বিবেচনার আহ্বান
মার্কিন নাগরিকদের ইউক্রেন ত্যাগ বিবেচনার আহ্বান
© 2022 Bangla Tribune