অন্য রোগে মৃত্যু কয়েকগুণ বেশি, আলোচনায় কেবল করোনা

জাকিয়া আহমেদ
২০ মার্চ ২০২২, ১০:০০আপডেট : ২০ মার্চ ২০২২, ১৬:০৪

দেশে এখন প্রায় ২০ লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত। এর সঙ্গে প্রতিবছর প্রায় আরও এক থেকে দেড় লাখ মানুষ নতুন যোগ হয়, মৃত্যুও হয় প্রায় লাখের কাছাকাছি। এক লাখ মানুষ যদি বছরে মৃত্যুবরণ করে তাহলে গড়ে প্রতিদিন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ২৭৩ জন। অর্থাৎ গত দুই বছরে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১ লাখ ৯৯ হাজার ২৯০ জন।

অন্যদিকে দেশে প্রায় ২ কোটি মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত। প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার নতুন রোগী যোগ হয়, আর ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এ রোগে আক্রান্ত হয়ে। সে হিসেবে গত দুই বছরে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় কিডনি রোগে ভোগে।

বাংলাদেশে ২০২০ বছরের ৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। তার ঠিক ১০ দিন পর প্রথম রোগীর মৃত্যু হয়। সে হিসেবে গত দুই বছরে (১৮ মার্চ ২০২০-১৮ মার্চ ২০২২) পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২৯ হাজার ১১৪ জন।

ক্যানসার, কিডনি রোগে, স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাকের মতো অসংক্রামক রোগের কারণে মৃত্যু বাড়ছে। দেশে যত মৃত্যু হয় তার ১০ জনের মধ্যে ৭ জনই অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন। অর্থাৎ এসব রোগে ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ মারা যান।

নিউরোলজিক্যাল ডিসঅর্ডারগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে স্ট্রোক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ২০১৭ সালের পর থেকে স্ট্রোক দেশে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৮ সালের তথ্যানুযায়ী, বছরে দুই লাখ ৭৭ হাজার ৯৪২ জনের মৃত্যু হয় হৃদরোগজনিত অসুখ ও স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে। সে হিসেবে গত দুই বছরে ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৮৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বিভিন্ন গবেষণা বলছে, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাদের উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস আছে এমন তিনজনের একজন কিডনি রোগে ভুগছেন, বিষয়টি তারা নিজেও জানেন না। দেশে ১০০ জনের মধ্যে ৫০ জনই জানেন না তাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে। যাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে তাদের অর্ধেকের বেশি জানেন না উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ১০০ জনের মধ্যে ৭৭ জন ওষুধ খাচ্ছেন কিন্তু তাদের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নেই। একই অবস্থা ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রেও।

গত ২৭ জানুয়ারি প্রথম জাতীয় অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্মেলনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, করোনার চেয়ে দেশে ১০ থেকে ২০ গুণ বেশি মানুষের মৃত্যু হয় অসংক্রামক রোগে। স্বাস্থ্য অর্থ ইউনিটের মহাপরিচালক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসাইন মাহমুদ বলেন,  আমাদের দেশে কোভিডে যে মৃত্যু, অসংক্রামক কোনও কোনও রোগে মৃত্যু তার চেয়ে ১০ থেকে ২০ গুণ বেশি। শুধু ধূমপানজনিত কারণে দেশে প্রতিদিন গড়ে মৃত্যু হচ্ছে সাড়ে ৩০০ মানুষের। ক্যানসার, টিবি, হার্ট ডিজিস সবগুলোই অসংক্রামক রোগ। এগুলোর যে মৃত্যুর হার, প্রত্যেকটির ক্ষেত্রে তা কোভিডের তুলনায় ৫ গুণ।

গত ১০ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জাতীয় ক্যানসার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালে ক্যানসার দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেন, বাংলাদেশে এখন প্রায় ২০ লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত।  প্রতি বছর আরও প্রায় এক থেকে দেড় লাখ মানুষ এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে এই তালিকায়।

তিনি জানান, বছরে মৃত্যুও হয় লাখের কাছে। রোজ মারা যায় ২৭৩ জন। সে খবর আমাদের নেই। অথচ করোনার মৃত্যুটাকে আমরা সবাই দেখে থাকি। রোজ জানানো হচ্ছে বলে আমরা এটা জানতে পারি। ক্যানসারে কত লোক মারা যায় সেই হিসাবটা খুব একটা লোকে রাখে না।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ঢাকার বাতাস ভালো না, নদীনালায় শিল্পবর্জ্য ফেলা হয়। খাবারে ভেজাল মেশানো হয়। এসব দূষণের কারণে ফুসফুস, গলার ক্যানসারসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার হয়। এসব বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ ‍মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আহসান হাবীব হেলাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপে সরাসরি কোনও মৃত্যু হয়নি। কিন্তু এই দুই রোগের কারণে অন্যান্য রোগে মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেশি বেড়ে যায়। এই দুই অসুখের কারণে হার্ট ফেইলিওরের সম্ভাবনা বাড়ে, কিডনি দ্রুত খারাপের দিকে যায়।

দেশে কত মানুষ প্রতি বছর স্ট্রোকে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং তাদের ভেতরে কত মানুষ মারা যাচ্ছে প্রশ্নে তিনি বলেন, বাংলাদেশে ডাটা এন্ট্রির সিস্টেম ডেভলপ করাতে পারিনি, তবে চেষ্টা করা হচ্ছে ‘স্ট্রোক রেজিস্ট্রি’ চালু করার জন্য, আর তখনই আসলে প্রকৃত সংখ্যাটা বলতে পারবো। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে বাংলাদেশে মৃত্যুর অন্যতম ‘লিডিং কজ’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে, কখনও কখনও ক্যানসারকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সে হিসেবে প্রায় এক লাখের কাছাকাছি বা এর চেয়েও বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে প্রতিবছর।

ডা. আহসান হাবীব হেলাল বলেন, স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণ মানুষের অসচেতনতা। আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবেই সচেতনতা গড়ে তুলতে পারিনি। বাংলাদেশে স্ট্রোকের রিস্ক ফ্যাক্টর হিসেবে রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান রক্তে চর্বির মাত্রা বেশি আর ওবেসিটি বা স্থূলতা। আর এই পাঁচ কারণে স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাক দুটোরই ঝুঁকি থাকে।

ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপকে মানুষ গুরুত্ব দেয় না, ওষুধ নিয়মিত না খাবারও প্রবণতা রয়েছে। ধূমপান পরিহারের কথা বলা হলে বরং আমাদেরকেই উল্টো লজ্জা পেতে হয়-তাই সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। অথচ দেশে স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাকের মাত্রা ভয়ঙ্করভাবে বেড়েছে।

আর এ কারণে আমাদের হেলথ সিস্টেম থেকে সচেতনতা বাড়ানোর প্রচার করতে হবে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে ‘রুট লেবেল’ পর্যন্ত। কিন্তু সেটা হচ্ছে না—বলেন ডা. আহসান হাবীব হেলাল।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ও হাসপাতালের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বছরে দুই লাখ ৭৭ হাজার ৯৪২ জনের মৃত্যু হচ্ছে হৃদজনিত রোগে এবং স্ট্রোকে।

“মৃত্যুর সংখ্যাই বলে দিচ্ছে, এ দুই রোগে আক্রান্ত হয়ে বছরে কত মানুষ মারা যায়। আর এসব মৃত্যুর একটা বড় অংশই হচ্ছে ‘প্রিমেচিউর’। অর্থাৎ অকাল মৃত্যু বা অপরিণত বয়সে মৃত্যু। আর অকাল মৃত্যু বলা হয় ৭০ বছরের নিচের মৃত্যুকে”।

এসব অকাল মৃত্যুকে যদি প্রতিরোধ করতে হয় তাহলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে, যেসব রিস্ক ফ্যাক্টর বা ঝুঁকির কারণ রয়েছে সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার—বলেন ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী।

তবে হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের এই মৃত্যুর সংখ্যা করোনা মহামারির আগের এবং মহামারিকালে সেটা আরও বেড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. হারিসুল হক।

“কমপক্ষে পাঁচ লাখের মতো মানুষ মারা গেছেন গত দুই বছরে হৃদরোগ অথবা তার জটিলতায় বলে আমার ধারণা। কারণ, আমেরিকার মতো দেশেই ২৭ শতাংশের মতো রোগী হাসপাতালে যাওয়ার আগেই মারা যায়। সেখানে আমাদের দেশে এই অবস্থাটা আরও বেশি”।

গত দুই বছরে করোনাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে এসব অসংক্রামক রোগের প্রতি এবং চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি সেভাবে নজর দেওয়া হয়নি। রোগীরা এ সময়ে ফলো আপে আসতে পারেনি। ফলে, তাদের রোগের জটিলতা, মৃত্যু বেড়েছে— বলেন ডা. হারিসুল হক।

/এমআর/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
এবছরই সব স্কুলে ফিডিং চালুর পরিকল্পনা, পাঠ্যক্রমে খেলাধুলা: শিক্ষামন্ত্রী
এবছরই সব স্কুলে ফিডিং চালুর পরিকল্পনা, পাঠ্যক্রমে খেলাধুলা: শিক্ষামন্ত্রী
দুই দল গ্রামবাসীর সংঘর্ষে ৬২ জন আহত
দুই দল গ্রামবাসীর সংঘর্ষে ৬২ জন আহত
বাংলাদেশ সফরের ব্যাখ্যা দিলো আইসিসি
বাংলাদেশ সফরের ব্যাখ্যা দিলো আইসিসি
বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নে সহযোগীদের সমর্থন চাইলেন প্রধানমন্ত্রী
বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নে সহযোগীদের সমর্থন চাইলেন প্রধানমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান