৩ বছর বয়সী রামিয়া বেশ চঞ্চল। তবে তার বাবা-মা’র কাছে তার এই চঞ্চলতা স্বাভাবিক মনে হয় না। তাই তাকে থামাতে প্রায়ই শাসন করেন। আবার অন্যদিকে ভাবেন যে শিশুরা একটু চঞ্চল হবে এটাই স্বাভাবিক, তাই তারা শিশুর আচরণ নিয়ে দ্বিধার মধ্যে থাকেন।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিচঞ্চল শিশুর সমস্যাকে বলা হয় অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার অ্যাকটিভিটি ডিজঅর্ডার (এডিএইচডি)। বাংলায় এ সমস্যাকে বলে অতিচঞ্চল অমনোযোগিতা। এটি শিশুর একধরনের স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যা। বাবা-মা কিংবা স্কুলের শিক্ষক সবচেয়ে আগে এ সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে পারেন। সাধারণত তিন–চার বছর বয়সে শিশুর এই লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। স্বাভাবিক চঞ্চল শিশুকেও অনেকে অতিচঞ্চল মনে করেন। কিন্তু চঞ্চলতা মানেই এডিএইচডি নয়।
বিশ্বব্যাপী অসংখ্য শিশু এই রোগে আক্রান্ত হয় এবং পরিণত বয়সেও তা ভুগাতে থাকে। মানসিক এই রোগে আক্রান্তদের মাঝে স্বাভাবিকের চাইতে বেশিমাত্রায় চঞ্চলতা এবং জেদ দেখা যায়। কোনও একটি কাজে তারা মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না, পরিণতি নিয়ে চিন্তা না করেই সিদ্ধান্ত নেয়। যে কোনও কাজে প্রচণ্ড তাড়াহুড়া করে। ফলে একসময় তাদের আত্মমর্যাদাবোধ কমে যায়, সম্পর্কে টানাপোড়ন সৃষ্টি করে এবং শিক্ষাজীবনে পদে পদে ব্যর্থতার সম্মুখীন হতে হয়। তবে শিশুদের এই মনোযোগের ঘাটতির উৎস কোথায়—এ নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা হয় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও পিএইচডব্লিউসি’র টিম লিডার ডা. আশিক সেলিমের সঙ্গে।
তার মতে, ৫০ বছর আগেও বাবা-মায়েরা বলতেন বেশি বই না পড়তে, চোখ নষ্ট হয়ে যাবে। এখন বলে এতো ডিভাইসের দিকে তাকিয়ো না। এটা একটা প্রজন্মগত ভুল বুঝাবুঝি। ডিভাইস ব্যবহার করা কিন্তু একটা বাস্তবতা। মহামারির সময় ডিভাইসই স্কুল, বন্ধু, খেলাধুলা, বিনোদন ছিল। এই ডিভাইসের ব্যবহার অনেক জটিল এবং এর জন্য মানুষকে অনেক কিছু চিন্তা করতে হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—ডিভাইস কী স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতি ডেকে আনছে? সব কিছুই আমাদের জন্য ক্ষতি ডেকে আনে যদি যথাযথ ব্যবহার করা না হয়।
ডা. আশিক বলেন, ডিভাইস আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ হতে পারে যদি অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার করা হয়। যেমন- দুই বছরের একটি শিশু, কথা বলার আগে ইউটিউব চালানো শিখে গেছে। দুই বছরের শিশুকে ডিভাইস দেওয়া হবে কেন? এখন ডিভাইস না দিলে যদি না খায় সেটি তো আর সে নিজে শিখছে না। আমরা তাকে অভ্যস্ত করছি। এখানে শিশুকে খাওয়ানোর জন্য এফরট দিতে হবে। শিশুরা তো ডিভাইসের ব্যবহার নিজেরা শিখছে না, তাদেরকে শিখিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদেরকে শান্ত রাখার জন্য, খাওয়ানোর জন্য ডিভাইস ব্যবহার করা হচ্ছে। তাছাড়া, আমরা যদি আমাদের নিজেদের কথাও বলি, পরিণত বয়সে আমরা কতটুকু ডিভাইস ব্যবহার করি। আমরা ডিভাইসে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করছি, ব্যাংকিংয়ের কাজ করছি, অফিসের কাজ করছি। ডিভাইস আসলে ক্ষতির কারণ না, আমাদের ভাবতে হবে যে এই ডিভাইসের সঙ্গে আমরা কী করছি।
ইন্টারনেটের কন্টেন্ট একটি সমস্যা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানে প্রচুর কন্টেন্ট আছে—সেগুলোকে মডারেট করতে হবে। আরেকটি হচ্ছে নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। একটি শিশু কতক্ষণ ব্যবহার করবে এবং কী দেখবে সেটি নিয়ন্ত্রণ তো আমাদের হাতে আছে। আমরা যদি ব্যবহারে বাধা দেই তাহলে কিন্তু সমস্যা, তারা পিছিয়ে যাবে। তাকে অপশন দিয়ে বলতে হবে এটা না করে ওটা করো। আমরা যদি নিয়ন্ত্রণ না করি তাহলে খারাপের দিকে যাবে।
গবেষণার বরাত দিয়ে তিনি জানান, দুই বছর আগে যুক্তরাজ্যে একটি বড় গবেষণা করা হয়েছিল শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যে ডিজিটাল স্ক্রিনের প্রভাব নিয়ে। গবেষণায় দেখা গেলো—কোনও প্রভাব নেই। শুধু যারা ঘুমানোর আগে ব্যবহার করে তাদের ঘুমের মান খারাপ হয়। তাছাড়া কোনও নেতিবাচক প্রভাব নেই। কিন্তু এই গবেষণাকে সব অভিভাবক মেনে নিতে চায় না। শিশুদের যদি ডিভাইসের বাইরে অন্য কিছু করতে হয় তাহলে বাবা-মাকেও করতে হবে। আমাদের দেশে শিশুকে জোর করে খাওয়াতে হয়, বিদেশে এমন নেই। এটি সমস্যা। শিশুরা অবশ্যই ডিভাইস ব্যবহার করবে, তবে কত বছর বয়স থেকে ব্যবহার করবে, কীভাবে ব্যবহার করবে সেটার একটা রেগুলেশন থাকতে হবে। নাহলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যেমন ঘুম হবে না, বন্ধু থাকলে তাদের সঙ্গে বাইরে গিয়ে খেলতে চাইবে না।
তিনি বলেন, এডিএইচডি রোগের দিক দিয়ে নতুন। রোগটি নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করা হচ্ছে সাম্প্রতিককালে। কিছু কিছু শিশুর খুব তীব্র এডিএইচডি হয়। যদি চিহ্নিত করে চিকিৎসা করা হয় তাহলে তারা ভালো থাকে। অনেক শিশুর এ সমস্যা মাইল্ড লেভেলে থাকে। আমাদের অ্যাটেনশন টাইম কমে যাচ্ছে। যেমন—নেটফ্লিক্সে ৪৫ মিনিটের সিরিজ কিন্তু মানুষ এখন কম দেখে, তাই এখন ২০ মিনিটের সিরিজ তৈরি হচ্ছে। এডিএইচডির ক্ষেত্রেও বিষয়টা একই। আমরা যদি শিশুদের ২-৩ মিনিটের ভিডিও দেখাই তাহলে কিন্তু মনোযোগ ওই ২-৩ মিনিটের জন্য থেকে যায়। তখন ওদের অ্যাটেনশন প্রব্লেম হয় কিন্তু এডিএইচডি হয় না। এটি একটি রোগ। ডিভাইস দেখে দেখে এডিএইচডি হয়ে যাবে তা নয়, তাদের মনোযোগ কমে আসবে। কিছু শিশু আছে যারা ডিভাইসে কম সময়ে মনোযোগ আকৃষ্ট করতে পারে না। তখন হয়তো তারা ডিভাইস একটু বেশি ব্যবহার করে। হাইপার যাদের তারা আবার উল্টো। তারা কিছুক্ষণ ডিভাইস ব্যবহার করবে তারপর ছোটাছুটি করবে। আবার কিছুক্ষণ ব্যবহার করবে আবার দৌড়াবে। কারণ ওদের হাইপার অ্যাক্টিভিটি বসে থাকতে পারে না। তরুণ ছেলে যাদের এডিএইচডি থাকে তারা বসে থাকতে পারে না। সবসময় লাফালাফি করতেই থাকে, বাবা-মা হয়রান হয়ে যায় রাতে ঘুমায় না।
চিকিৎসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যদি কোনও সন্দেহ হয় প্রথমেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। আমাদের ‘ইনার সার্কেল’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান আছে, ওখানে আমরা এডিএইচডি’র অ্যাসেসমেন্ট করি। স্কুলের শিক্ষক, বাবা ও মা তিনজনের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে আমরা অ্যাসেসমেন্ট করি। কারণ এডিএইচডি’র জন্য জীবনের দুটি ক্ষেত্রে কর্মক্ষমতা হারাতে হবে। স্কুল আর বাসা এই দুই ক্ষেত্র শিশুদের জন্য প্রযোজ্য, চিকিৎসক দেখবেন বিষয়টি। যেকোনও দুই ক্ষেত্রে প্রব্লেম থাকতে হবে। যদি থাকে তাহলে চিকিৎসা করতে হবে। যদি দেখা যায়—চিকিৎসকের চেম্বারে দৌড়াদৌড়ি করছে আবার স্কুলে গেলে চুপচাপ, তাহলে এডিএইচডি না। তাই নিরীক্ষা করা খুব জরুরি, একবার নিরীক্ষা হয়ে গেলে মাইল্ড, মডারেট, সিভিয়ার তিনটি ধরন আছে। মাইল্ড হলে কাউন্সিলিং দিয়ে, আচরণ পরিবর্তনের মাধ্যমে এটি ঠিক করা যায়। বাকিদের ওষুধের প্রয়োজন হয়।









