রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহতদের জীবন বাঁচাতে ২১ জনের হাত কিংবা পা কাটা হয়েছে। সেখানে চিকিৎসাধীন আছেন ৯৮ জন। আহতদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পুরোপুরি আগের মতো স্বাভাবিক নাও হতে পারে বলে মনে করেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কেনান।
সোমবার (৬ জানুয়ারি) বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই কথা বলেন।
জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহতদের অনেকেরই দিন কাটছে হাসপাতালের বিছানায়। মনে একটাই প্রশ্ন– কবে সুস্থ হয়ে বাড়ি যাবেন আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন। আন্দোলনের দুঃসহ স্মৃতির মধ্যেই চলছে তাদের চিকিৎসা।
সরকারি হিসেবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত হয়েছেন ৮২৩ জন এবং আহত হয়েছেন ১১ হাজার ৭০৫ জন। নিটোরে এখন পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়েছেন ৮৭৬ জন। তাদের মধ্যে হাত-পা কাটা গেছে ২১ জনের, যার মধ্যে ১৭ জনের পা এবং চার জনের হাত কাটা হয়েছে। এছাড়া আহত হয়ে হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে ৬ জনের।
আহতদের কয়েক জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আন্দোলনের ট্রমায় এখনও ভুগছেন অনেকে। জুলাইয়ের স্মৃতি ভুলে যেতে চান তারা। মনে করলেই তাদের শরীর কেঁপে ওঠে।
হাসপাতালের পরিচালক জানান, আহতদের বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে হাত-পা কাটার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। আহতরা অনেকেই নিজ বাড়িতে আছেন। তারা আমাদের ফলোআপে আছেন। যারা ভর্তি আছে তাদের বেশিরভাগেরই অবস্থা এখন স্থিতিশীল। আমরা ৬ জনকে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছি। তাদের বিদেশে যাওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। চিকিৎসার বিষয় নিয়ে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা, সচিব তৎপর আছেন। আশা করা যায় খুব দ্রুত তারা বিদেশে চিকিৎসা নিতে পারবে।
তার মতে, যারা চিকিৎসাধীন আছেন তাদের কারো হয়তো গুলির আঘাতে হাড়ের অংশ চলে গেছে, মাংস-চামড়া চলে গেছে। এই গুরুতর বিষয়ে চিকিৎসা চলমান আছে এবং এই চিকিৎসায় একটু সময় লাগবে। কারণ যে মাংস চলে গেছে সেটি দফায় দফায় অস্ত্রোপচার করে প্রতিস্থাপন করার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে যে হাড় ক্ষয় হয়ে গেছে তা ধীরে ধীরে পূর্ণ করার চিকিৎসা চলছে। দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে তাদের সেরে উঠতে। তবে তাদের হাত বা পা যেটা হোক না কেনও পুরোপুরি আগের মতো স্বাভাবিক নাও হতে পারে।
বিদেশে পাঠানোর প্রয়োজন পড়ছে কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন আছে। এসব অস্ত্রোপচার আমাদের হাসপাতালে হয় না তা নয়। কিন্তু বিদেশে পাঠানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে যে, সেখানে টেকনিক্যাল সাপোর্ট ভালো। বিদেশের হাসপাতালের সাপোর্ট, পরিবেশ আমাদের এখান থেকে ভালো। সেজন্য এই অস্ত্রোপচার করলে ফলাফল কতটুকু আসবে তা আগে থেকে বলা মুশকিল। কিন্তু যদি বিদেশে টেকনিক্যাল সাপোর্ট ভালো হয়, পরিবেশ ভালো হয় আমাদের প্রত্যাশা ফলাফল ভালো আসবে। এই উদ্দেশ্যে তাদের বিদেশ পাঠানো প্রয়োজন। দেশের জন্য আন্দোলন যারা করেছে— তারা দেশে বা বিদেশে যেন সর্বোচ্চ চিকিৎসা পায় সেজন্য আমরা সুপারিশ করেছি।
চিকিৎসায় অবহেলা, গাফিলতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চিকিৎসায় গাফিলতি আছে বলে আমরা মনে করি না। জুলাই আন্দোলনে যারা আহত হয়েছেন তাদের চিকিৎসায় আলাদা ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের চিকিৎসায় কোনও কার্পণ্য না হয় সেজন্য বিশেষ ব্যবস্থা আছে, বিশেষ টিম আছে। প্রত্যেক রোগীর ওপর বিশেষ দৃষ্টি আমরা রেখেছি।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা চলছে, যার চিকিৎসায় সময় বেশি প্রয়োজন তার অস্থিরতা থাকা স্বাভাবিক। কারণ আন্দোলনে এমন সব পরিবেশ দেখে তারা মৃত্যু মুখ থেকে ফিরে এসেছে, তাদেরকে স্বাভাবিক করার জন্য দফায় দফায় অস্ত্রোপচার করা হচ্ছে, এই ধকলগুলো তাদের ওপর দিয়ে যাচ্ছে। তার ওপর শারীরিক এবং মানসিক কষ্ট তাদের সহ্য করতে হচ্ছে। পুরোপুরি সুস্থ হতে কেমন সময় লাগবে এটিও এখনও আমাদের পক্ষে বলা মুশকিল। সেক্ষেত্রে হয়তো তাদের মনে হচ্ছে যে— সেরে উঠছে না কেন। অস্থিরতা কিংবা অনিশ্চয়তার দিক থেকে হয়তো তারা অভিযোগ করে থাকতে পারে। আমরা এখানে চিকিৎসা দিচ্ছি, এমনকি বিদেশ থেকে যে টিম এসে দেখে গেছেন তারাও প্রশংসা করেছেন আমাদের চিকিৎসায়।








