একটা সময় ছিল, কোনো বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হলে নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে নির্দিষ্ট সময়ে ক্লাস করতে হতো। শিক্ষকের কাছে সরাসরি বসে শেখাই ছিল জ্ঞান অর্জনের প্রধান পথ। প্রযুক্তির অগ্রগতিতে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কল্যাণে এখন ঘরে বসেই বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষের কাছ থেকে শেখা সম্ভব। একইভাবে নিজের জানা দক্ষতা অন্যদের শেখিয়ে আয় করার সুযোগও তৈরি হয়েছে।
এই পরিবর্তনের ফলে তৈরি হয়েছে নতুন এক পেশার ক্ষেত্র, যার অন্যতম হলো ‘অনলাইন স্কিল ট্রেইনার’ বা ডিজিটাল মেন্টর। নিজের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে অনলাইনে অন্যদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আয় করার এই পেশা তরুণদের জন্য হয়ে উঠতে পারে স্বাধীন ক্যারিয়ার ও উদ্যোক্তা হওয়ার একটি সম্ভাবনাময় পথ।
অনলাইন স্কিল ট্রেইনার আসলে কারা
সহজভাবে বললে, কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে নিজের জ্ঞান ও দক্ষতা অনলাইনের মাধ্যমে অন্যদের শেখান এবং এর বিনিময়ে আয় করেন, তিনিই একজন অনলাইন স্কিল ট্রেইনার। এ ক্ষেত্রে বড় কোনো প্রতিষ্ঠান থাকা কিংবা অনেক বেশি একাডেমিক ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক নয়। বরং যে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, সে বিষয়ে বাস্তব জ্ঞান, কাজের অভিজ্ঞতা এবং বিষয়টি সহজভাবে বোঝানোর সক্ষমতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একজন দক্ষ ডিজাইনার ডিজাইন শেখাতে পারেন, ভিডিও নির্মাতা ভিডিও এডিটিং শেখাতে পারেন, সাংবাদিকতা জানা কেউ মোবাইল সাংবাদিকতা বা কনটেন্ট তৈরির প্রশিক্ষণ দিতে পারেন। অর্থাৎ নিজের যে দক্ষতাটি অন্যের কাজে লাগতে পারে, সেটিকেই প্রশিক্ষণের বিষয় হিসেবে বেছে নেওয়া সম্ভব।
কোন কোন দক্ষতা শেখানোর সুযোগ রয়েছে
ডিজিটাল দুনিয়ায় অনলাইনে শেখানোর বিষয়ের পরিধি অনেক বিস্তৃত। বিশেষ করে চাকরি ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের বাজারে যেসব দক্ষতার চাহিদা রয়েছে, সেগুলো নিয়ে কোর্স তৈরি করে ভালো সম্ভাবনা তৈরি করা যায়।
এর মধ্যে অন্যতম হলো ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট ও গ্রাফিক ডিজাইন। ক্যানভা বা অন্যান্য ডিজাইন সফটওয়্যার ব্যবহার করে নিউজ কার্ড, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, ইনফোগ্রাফিক কিংবা থাম্বনেইল তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। বর্তমানে সংবাদমাধ্যম, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, উদ্যোক্তা ও বিভিন্ন অনলাইন ব্যবসায়ীর নিয়মিত ডিজিটাল কনটেন্ট প্রয়োজন হওয়ায় এ ধরনের দক্ষতার চাহিদাও রয়েছে।
একইভাবে মোবাইল জার্নালিজম বা মোজো, ভিডিও ধারণ ও ভিডিও এডিটিং নিয়েও অনলাইন কোর্স তৈরি করা সম্ভব। স্মার্টফোন ব্যবহার করে কীভাবে ভালো ভিডিও ধারণ, সাক্ষাৎকার গ্রহণ, মোবাইল এডিটিং এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য কনটেন্ট তৈরি করা যায়, তা শেখানোর সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ডেটা অ্যানালাইসিস, গবেষণা, এসপিএসএসের মতো সফটওয়্যার ব্যবহার, ডিজিটাল মার্কেটিং, কনটেন্ট রাইটিং, স্পোকেন ইংলিশ, কোডিং, ফটোগ্রাফি, ভিডিও প্রোডাকশনসহ নানা বিষয়ে অনলাইন প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়।
কীভাবে শুরু করা যায়
অনলাইন স্কিল ট্রেইনার হিসেবে কাজ শুরু করার আগে প্রথমেই নির্ধারণ করতে হবে কোন বিষয়টি আপনি সবচেয়ে ভালো জানেন এবং কোন বিষয়ে অন্যদের শেখানোর মতো বাস্তব দক্ষতা আপনার রয়েছে। এরপর সেই দক্ষতাকে কেন্দ্র করে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির শিক্ষার্থী বা প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচন করতে হবে।
পরবর্তী ধাপে তৈরি করতে হবে একটি গোছানো কোর্স মডিউল। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা কী শিখবে, কোন বিষয় আগে এবং কোনটি পরে শেখানো হবে, প্রতিটি ক্লাসের সময়কাল কত হবে, এসব আগে থেকেই নির্ধারণ করা জরুরি।
কোর্স তৈরির জন্য শুরুতেই দামি ক্যামেরা বা স্টুডিওর প্রয়োজন নেই। ভালো আলো, পরিষ্কার শব্দ এবং একটি স্মার্টফোন দিয়েই মানসম্মত ভিডিও তৈরি করা সম্ভব। প্রয়োজন অনুযায়ী স্ক্রিন রেকর্ডিং, উপস্থাপনা ও উদাহরণ যুক্ত করে শেখানোর বিষয়টি আরও সহজবোধ্য করা যায়।
এরপর আসে প্রচার ও ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত নিজের দক্ষতা সম্পর্কিত ছোট ছোট কনটেন্ট, টিপস, টিউটোরিয়াল কিংবা বিনামূল্যের শিক্ষামূলক ভিডিও প্রকাশ করলে ধীরে ধীরে একটি নিজস্ব দর্শক বা শিক্ষার্থী গোষ্ঠী তৈরি করা সম্ভব।
চাকরির পাশাপাশি বাড়তি আয়ের সুযোগ
অনলাইন স্কিল ট্রেইনার পেশার অন্যতম সুবিধা হলো এর নমনীয়তা। একজন শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী কিংবা ফ্রিল্যান্সার নিজের মূল কাজের পাশাপাশি অনলাইন কোর্স তৈরি ও পরিচালনা করতে পারেন। নির্দিষ্ট সময় মেনে কোনো প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা না থাকায় নিজের সুবিধামতো সময় নির্ধারণ করা যায়।
একটি ভালোভাবে তৈরি করা রেকর্ডেড কোর্স একাধিকবার বিক্রি করা সম্ভব। ফলে একই বিষয় বারবার সরাসরি ক্লাস না নিয়েও সেই কোর্স থেকে আয় করার সুযোগ থাকে। তবে এটিকে পুরোপুরি ‘প্যাসিভ ইনকাম’ হিসেবে দেখার আগে মনে রাখতে হবে, কোর্সের মান বজায় রাখা, শিক্ষার্থীদের সহায়তা, নিয়মিত আপডেট এবং প্রচারণার জন্য সময় ও পরিশ্রম প্রয়োজন।
নিজের দক্ষতাকে পরিণত করুন সম্পদে
ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে শুধু চাকরি খোঁজার পরিবর্তে নিজের দক্ষতাকে কেন্দ্র করে আয়ের পথ তৈরি করার সুযোগও বাড়ছে। অনলাইন স্কিল ট্রেইনার পেশা সেই সুযোগগুলোরই একটি।
কারও যদি কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে ভালো দক্ষতা থাকে এবং সেটি অন্যদের সহজভাবে শেখানোর সক্ষমতা থাকে, তাহলে সেই জ্ঞানকে আর শুধু ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে ধরে রাখার প্রয়োজন নেই। প্রযুক্তির সহায়তায় সেটিকে কোর্স, প্রশিক্ষণ কিংবা অনলাইন শিক্ষামাধ্যমে রূপ দেওয়া সম্ভব।









