ভ্রমণের তালিকায় নতুন গন্তব্য বিদেশি ফার্মেসি, লক্ষ্য সানস্ক্রিন

ফিচার ডেস্ক
১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩০আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪২

ভ্রমণের স্মারক হিসেবে ফ্রিজ ম্যাগনেট, পোস্টকার্ড কিংবা স্থানীয় খাবার এসব তো বহু পুরোনো। কিন্তু নতুন এক প্রবণতায় সেই তালিকায় জায়গা করে নিচ্ছে এমন একটি জিনিস, যা দেখতে একেবারেই সাধারণ, কিনস্তু অতিপ্রয়োজনী। সেটি হলো সানস্ক্রিন।

সিউল, প্যারিস, টোকিও কিংবা কার্টাহেনা বিশ্বের বিভিন্ন শহরে ভ্রমণকারীদের একটি অংশ এখন দর্শনীয় স্থান ঘোরার পাশাপাশি খুঁজে বেড়াচ্ছেন স্থানীয় ফার্মেসি ও বিউটি স্টোর। উদ্দেশ্য, নিজেদের দেশে সহজে পাওয়া যায় না এমন জনপ্রিয় সানস্ক্রিন সংগ্রহ করা।

কানাডার ক্যাটলিন ফ্রান্সিস-অ্যাগনিউ যেমন সিউল যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই ভ্রমণসূচিতে যুক্ত করেছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় প্রসাধনী বিক্রেতা অলিভ ইয়াং। তার লক্ষ্য ছিল যতটা সম্ভব কোরিয়ান সানস্ক্রিন কিনে দেশে ফেরা।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার আনা ক্লার্কও পরিবারের সঙ্গে কলম্বিয়ার কার্টাহেনায় যাওয়ার আগে গুগল ম্যাপে হোটেল থেকে স্থানীয় ফার্মেসি চেইন ফার্মাতোদো পর্যন্ত পথ চিহ্নিত করে রেখেছিলেন।

কারণ সেখানে মিলতে পারে ইউরোপের জনপ্রিয় কিছু সানস্ক্রিন, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সহজে পাওয়া যায় না।

কিন্তু সানস্ক্রিনই কেন ভ্রমণের আকর্ষণ? এ বিষয়ে আচরণগত মনোবিজ্ঞানী ক্যারোলিন মায়েরের মতে, গত এক দশকে রোদ পোহানো ও ত্বকের যত্ন নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। একসময় ত্বকে ট্যান বা বাদামি রংকে স্বাস্থ্য, তারুণ্য ও অবসরযাপনের প্রতীক হিসেবে দেখা হলেও এখন সানস্ক্রিন ক্রমেই দৈনন্দিন আত্মযত্নের অংশ হয়ে উঠেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্কিনকেয়ার সংস্কৃতিও এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নতুন ফর্মুলা, ব্র্যান্ড ও উপাদান সম্পর্কে মানুষ এখন ঘরে বসেই জানতে পারছে। ফলে ভ্রমণের সময় সেগুলো নিজের চোখে দেখা ও কিনে আনার আগ্রহও বাড়ছে।

বিশেষ করে এশিয়া-প্যাসিফিক ও ইউরোপের সানস্ক্রিন নিয়ে আগ্রহ বেশি। দক্ষিণ কোরিয়ার কসমেটিকস বাজারে পর্যটকদের উপস্থিতিও এর প্রমাণ দিচ্ছে।

অলিভ ইয়াংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১৯০টির বেশি দেশ থেকে আসা বিদেশি ক্রেতারা তাদের অফলাইন বিক্রির ২৫ শতাংশের বেশি করেছেন। বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে সানকেয়ার পণ্য বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

সিউলের মিয়ংডং এলাকাতেও পর্যটকদের হাতে স্যুটকেস ও বড় শপিং ব্যাগ নিয়ে এসব দোকানে ঢুকতে দেখা যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সুপারমার্কেট কিংবা কনভেনিয়েন্স স্টোরের মতো ফার্মেসিও স্থানীয় জীবনের সাধারণ অংশ। কিন্তু পর্যটকের চোখে এগুলো হয়ে উঠতে পারে নতুন কিছু আবিষ্কারের জায়গা।

ফ্রান্সের ফার্মেসিগুলো যেমন কয়েক বছর ধরেই বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র। বিশেষ করে প্যারিসে জনপ্রিয় ফার্মেসিগুলোতে স্থানীয় ও ইউরোপীয় স্কিনকেয়ার পণ্যের বিশাল সংগ্রহ পর্যটকদের টানে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব দোকানের ছবি, ভিডিও ও ‘হল’ ছড়িয়ে পড়ায় আগ্রহ আরও বেড়েছে।

ইউরোপে লা রোশ-পোজে ও স্পেনের আইএসডিন, দক্ষিণ কোরিয়ায় বিউটি অব জোসন ও রাউন্ড ল্যাব এ ধরনের ব্র্যান্ড এখন অনেক ভ্রমণকারীর কেনাকাটার তালিকায় থাকে। আবার জাপানি সানস্ক্রিনের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ এর হালকা, পানির মতো অনুভূতি।

বিদেশি সানস্ক্রিনের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে মার্কিন ক্রেতাদের মধ্যে বিদেশি সানস্ক্রিনের প্রতি আগ্রহের একটি কারণ হলো দেশটির নিয়ন্ত্রক কাঠামো। কিছু আধুনিক ইউভি ফিল্টার যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদিত না হওয়ায় ইউরোপ বা এশিয়ার বাজারে পাওয়া কিছু ফর্মুলা সেখানে সহজে মেলে না।

নিউ অরলিন্সের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ প্যাট্রিক কোলম্যানের মতে, সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে ত্বক রক্ষা করা ক্যানসার ও অকালবার্ধক্যের ঝুঁকি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায়গুলোর একটি।

তবে শুধু ‘কোন দেশের সানস্ক্রিন ভালো’ এই প্রশ্নই পর্যটকদের চালিত করছে না। অস্ট্রেলিয়ার জো কার্লিস যেমন গ্রিসে গিয়ে ফার্মেসিতে ঘুরে ঘুরে সানস্ক্রিন কিনেছেন। নিজের দেশের সানস্ক্রিনের মান নিয়ে তার আস্থা থাকলেও বিদেশি ফার্মেসিতে নতুন ব্র্যান্ড আবিষ্কারের আনন্দই তার কাছে বড়।

ফ্লোরিডার আনা ক্লার্কের কাছে সানস্ক্রিন কেনা যেন আলাদা এক অভিযান। কার্টাহেনা থেকে পাঠানো তার একটি ছবিতে দেখা যায়, লা রোশ-পোজে, ইউসেরিন ও আইএসডিনের ১১টি বোতল। তিনি সেটিকে বলেছেন ‘প্রথম দফা’ কেনাকাটা।

পছন্দের একটি স্প্রে সানস্ক্রিন ফার্মাতোদোতে না পেয়ে থেমে যাননি ক্লার্ক। কার্টাহেনার রঙিন ঔপনিবেশিক রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আরও ফার্মেসি খুঁজে বের করার পরিকল্পনা তার।

পরিবারের সদস্যরা অবশ্য তার এই অভ্যাস নিয়ে মজা করেন। কোনও ফার্মেসির সবুজ ক্রস চিহ্ন দেখলেই তিনি ঢুকে পড়তে চান। আর সানস্ক্রিন কেনার সময় তাকে তাড়া দেওয়া একেবারেই পছন্দ নয়।

তবে ভ্রমণে গিয়ে পছন্দের সানস্ক্রিন পেতে হলে আগে থেকেই কিছুটা প্রস্তুতি দরকার। ক্যাটলিন ফ্রান্সিস-অ্যাগনিউ ভ্রমণের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই রেডিটের পোস্ট, বিউটি ব্লগ ও নতুন পণ্যের তালিকা ঘেঁটে নিজের ফোনে একটি কেনাকাটার তালিকা তৈরি করেন। শেষ দিনের জন্য কেনাকাটা রেখে দেন না। সিউলের মিয়ংডংয়ের বড় অলিভ ইয়াং শাখায় ছাড় পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকায় সেটিকেও তালিকায় রাখেন।

তার পরামর্শ, সপ্তাহের কর্মদিবসে সকালে যান। সন্ধ্যা ও ছুটির দিনে সেখানে ভিড় এত বেশি হয় যে স্বচ্ছন্দে কেনাকাটা করা কঠিন।

প্যারিসের জনপ্রিয় সিটিফার্মা-তেও প্রায়ই দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। তুলনামূলক কম দামের জন্য বিখ্যাত হলেও অনেক ভ্রমণকারী ভিড় এড়িয়ে অন্য ফার্মেসি বেছে নেন।

সৌন্দর্য বিশেষজ্ঞ ক্রিসেল লিমের কাছে একটি আদর্শ ভ্রমণের দিন হতে পারে সকালে কফি, এরপর জাদুঘর বা গ্যালারি, দুপুরে খাবার, বিকেলে ফার্মেসি বা বিউটি শপ এবং রাতে ডিনার। তার কাছে সিউল, টোকিও, প্যারিস বা সিডনির মতো শহরে স্কিনকেয়ার পণ্য ঘাঁটাঘাঁটি করা এক ধরনের ‘রিসেট’। কারণ সৌন্দর্যচর্চার মধ্য দিয়েও একটি শহরের মানুষের স্বাস্থ্য, নান্দনিকতা ও আত্মযত্নের ধারণা সম্পর্কে জানা যায়।

অর্থাৎ, ফার্মেসির তাক এখন শুধু কেনাকাটার জায়গা নয়; হয়ে উঠছে স্থানীয় সংস্কৃতি বোঝারও একটি জানালা।

সানস্ক্রিনের প্রতি এই আগ্রহ কতটা তীব্র হতে পারে, তার আরেকটি উদাহরণ মেলিসা কোলম্যান। রোম ও গ্রিস ভ্রমণে গিয়ে তিনি কখনো কখনো ৬০টি পর্যন্ত সানস্ক্রিনের বোতল কিনে ফেলেন। সব নিজের জন্য নয়। অনেকগুলো পরিবার ও বন্ধুদের উপহার দেন, কিছু দেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুসারীদের।

ক্যাটলিনও তার সর্বশেষ বিদেশ সফর থেকে ১৫টি এসপিএফ পণ্য নিয়ে ফিরেছেন নিজের ও বন্ধুদের জন্য।

বিদেশি সানস্ক্রিনের প্রতি এই আগ্রহকে শুধু পণ্য কেনার উন্মাদনা হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে খোঁজার রোমাঞ্চ, নতুন কিছু আবিষ্কারের আনন্দ এবং একটি নির্দিষ্ট ট্রেন্ডের অংশ হয়ে ওঠার অনুভূতি।

শেষ পর্যন্ত বিদেশি সানস্ক্রিনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়তো এর ব্যবহারিকতার বাইরেও কোথাও। আজ যে সানস্ক্রিনটি প্যারিসের কোনো ফার্মেসি থেকে কেনা হলো, সেটি কয়েক মাস পর ব্যবহার করার সময় মনে করিয়ে দিতে পারে সেই শহরের সরু রাস্তা, কোনও ক্যাফেতে কাটানো বিকাল কিংবা হঠাৎ আবিষ্কার করা সেই ছোট্ট দোকানটির কথা।

ক্রিসেল লিমের ভাষায়, সানস্ক্রিন তখন হয়ে ওঠে একই সঙ্গে স্মারক, দৈনন্দিন অভ্যাস ও স্মৃতি।

একসময় মানুষ ভ্রমণ থেকে বাড়ি ফিরত সুগন্ধি, চকলেট বা পোস্টকার্ড নিয়ে। এখন কারও কারও স্যুটকেসে জায়গা নিচ্ছে সানস্ক্রিনের সারি সারি বোতল।

ভ্রমণের গন্তব্য তাই শুধু শহর, সমুদ্র কিংবা পাহাড়ে সীমাবদ্ধ থাকছে না—কখনো কখনো গন্তব্য হয়ে উঠছে একটি ফার্মেসিও। আর সেই ফার্মেসির তাক থেকে বেছে নেওয়া একটি সানস্ক্রিনই হয়ে উঠতে পারে পুরো ভ্রমণের সবচেয়ে স্মরণীয়।

সূত্র: বিবিসি

/এমএএল/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ট্রেনের ধাক্কায় দাদি-নাতনি নিহত
ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ট্রেনের ধাক্কায় দাদি-নাতনি নিহত
বাজার বুঝে ব্যবসার সিদ্ধান্ত, মার্কেট রিসার্চ অ্যানালিস্ট হতে পারেন আপনিও
বাজার বুঝে ব্যবসার সিদ্ধান্ত, মার্কেট রিসার্চ অ্যানালিস্ট হতে পারেন আপনিও
বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত বিমানবন্দর এখন কোনটি
বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত বিমানবন্দর এখন কোনটি
রাষ্ট্রপতি হলেও জনগণের পাশে থেকে সেবা করবো: মির্জা ফখরুল 
রাষ্ট্রপতি হলেও জনগণের পাশে থেকে সেবা করবো: মির্জা ফখরুল 
সর্বাধিক পঠিত
মৃত্যুদণ্ডে ফাঁসির বদলে ইনজেকশনের আবেদন, সুপ্রিম কোর্টের ‘না’
মৃত্যুদণ্ডে ফাঁসির বদলে ইনজেকশনের আবেদন, সুপ্রিম কোর্টের ‘না’
আস্ত খাসি না দেওয়ায় বর বললেন ‘তুই বিয়ে কর’, বিয়ে না দিয়ে বের করে দিলেন কনের বাবা
আস্ত খাসি না দেওয়ায় বর বললেন ‘তুই বিয়ে কর’, বিয়ে না দিয়ে বের করে দিলেন কনের বাবা
চার দেশের বাংলাদেশি প্রবাসীদের সতর্ক করলো দূতাবাস 
চার দেশের বাংলাদেশি প্রবাসীদের সতর্ক করলো দূতাবাস 
মহাসড়কে এআই ক্যামেরার অ্যাকশন শুরু, ৩ ঘণ্টায় ৩৭৯ মামলা
মহাসড়কে এআই ক্যামেরার অ্যাকশন শুরু, ৩ ঘণ্টায় ৩৭৯ মামলা
চেক ডিজঅনারের আরেক মামলায় গ্রেফতার দেখানো হলো মুজিব পরদেশীকে 
চেক ডিজঅনারের আরেক মামলায় গ্রেফতার দেখানো হলো মুজিব পরদেশীকে