বর্ষা শেষে শরতের আবহে প্রকৃতি যখন নতুন রূপে সাজে, তখন বরিশালের উজিরপুরের সাতলা বিল হয়ে ওঠে লাল শাপলার অপূর্ব এক রাজ্য। বিস্তীর্ণ জলাভূমির পানির ওপর সারি সারি লাল শাপলা, সবুজ পাতার ফাঁকে নৌকার চলাচল আর ভোরের নরম আলো, যেন সাতলা বিল প্রকৃতির আঁকা এক জীবন্ত ছবি। চলতি মৌসুমেও বিলজুড়ে শাপলার সমারোহ দেখা যাচ্ছে।
বরিশাল শহর থেকে প্রায় ৬০ থেকে ৬৭ কিলোমিটার দূরে উজিরপুর উপজেলার সাতলা এলাকায় এই বিলের অবস্থান। বর্ষা মৌসুমে পানিতে ডুবে থাকা বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে প্রাকৃতিকভাবেই শাপলা ফুটে ওঠে। লাল শাপলার আধিক্যের কারণে এটি পর্যটকদের কাছে ‘শাপলা বিল’ বা ‘লাল শাপলার বিল’ নামে পরিচিত।
সাতলা বিলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় সময় ভোর। সূর্যের আলো পুরোপুরি তীব্র হওয়ার আগেই শাপলার সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি উপভোগ করা যায়। তাই দূর থেকে আসা পর্যটকদের আগের রাতে বরিশাল শহরে অবস্থান করে ভোরে সাতলার উদ্দেশে রওনা দিলে সময়ের সঙ্গে প্রকৃতির সৌন্দর্যও ভালোভাবে উপভোগ করা সম্ভব।
নৌকায় ভেসে লাল শাপলার রাজ্যে
সাতলা বিলে পৌঁছে শুধু তীরে দাঁড়িয়ে শাপলা দেখার মধ্যে ভ্রমণ শেষ নয়। স্থানীয় ঘাট থেকে ছোট নৌকা ভাড়া করে বিলের ভেতরে ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে। নৌকায় বসে চারপাশে যতদূর চোখ যায় লাল শাপলা আর সবুজ পাতার সমারোহ দেখা যায়। স্থানীয়ভাবে নৌকা ভাড়া সাধারণত ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যেতে পারে, যদিও সময়, নৌকার ধরন ও দরদামের ওপর ভাড়া পরিবর্তিত হতে পারে।
ঢাকা থেকে সাতলা বিল যাবেন যেভাবে
ঢাকা থেকে সড়কপথে প্রথমে বরিশাল যেতে পারেন। বর্তমানে বাসের ধরন ও পরিবহনভেদে ঢাকা-বরিশাল যাতায়াতের ভাড়া আনুমানিক ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা ধরে বাজেট করা যেতে পারে। পুরোনো ভাড়ার তথ্যের তুলনায় বর্তমান ভাড়া পরিবর্তিত হতে পারে, তাই যাত্রার আগে পরিবহনের কাছ থেকে ভাড়া নিশ্চিত করে নেওয়া ভালো।
বরিশাল শহরে পৌঁছে উজিরপুরের দিকে যেতে হবে। এরপর স্থানীয় অটোরিকশা বা অন্যান্য যানবাহনে সাতলা এলাকায় পৌঁছানো যায়। বরিশাল থেকে সাতলা পর্যন্ত স্থানীয় যাতায়াতের ভাড়া যানবাহন ও যাত্রীর সংখ্যার ওপর নির্ভর করবে। দলবদ্ধভাবে গেলে রিজার্ভ গাড়ির খরচ ভাগ করে নেওয়া সুবিধাজনক হতে পারে।
ঢাকা থেকে নৌপথেও বরিশাল যাওয়া যায়। রাতের লঞ্চে গিয়ে ভোরে বরিশাল পৌঁছে সেখান থেকে সড়কপথে সাতলার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার পরিকল্পনাও করা যায়। এতে সকালে বিলের সৌন্দর্য দেখার সুযোগ পাওয়া সহজ হয়।
একদিনের ভ্রমণে কত খরচ হতে পারে?
ঢাকা থেকে বাসে যাওয়া-আসা, বরিশাল থেকে সাতলা পর্যন্ত স্থানীয় যাতায়াত এবং বিলে নৌকা ভাড়া মিলিয়ে জনপ্রতি আনুমানিক ১ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা বাজেট ধরে রাখা যেতে পারে। তবে দলবদ্ধভাবে গেলে গাড়ি ও নৌকার ভাড়া ভাগ করে নেওয়ার কারণে খরচ কমে। খাবার, ব্যক্তিগত কেনাকাটা বা রাতে থাকার খরচ এই হিসাবের মধ্যে ধরা হয়নি।
আর যারা বরিশালে এক রাত থেকে পরদিন ভোরে সাতলা যেতে চান, তাদের থাকার খরচ আলাদাভাবে যোগ করতে হবে। ভ্রমণের আগে বাস, লঞ্চ, স্থানীয় যানবাহন ও নৌকার বর্তমান ভাড়া জেনে নেওয়াই ভালো।
প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে গিয়ে প্রকৃতির ক্ষতি নয়
সাতলা বিল শুধু পর্যটনকেন্দ্র নয়, স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও জলাভূমির পরিবেশের সঙ্গেও যুক্ত। সাম্প্রতিক সময়ে পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য নিয়ে স্থানীয়ভাবে উদ্বেগের কথাও উঠে এসেছে। তাই ভ্রমণের সময় প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট বা কোনও ধরনের বর্জ্য বিলে না ফেলা এবং অকারণে শাপলা না ছেঁড়াই সচেতন পর্যটকের দায়িত্ব।
ভোরের কুয়াশা, শান্ত পানির ওপর ভেসে থাকা লাল শাপলা আর ছোট নৌকার ছলাৎছল শব্দ সব মিলিয়ে সাতলা বিল হতে পারে প্রকৃতির কাছাকাছি একটি অসাধারণ ভ্রমণ অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে যারা শহরের ব্যস্ততা থেকে একদিনের জন্য দূরে গিয়ে গ্রামবাংলার জলাভূমির সৌন্দর্য দেখতে চান, তাদের জন্য শরৎকালের সাতলা বিল হতে পারে দারুণ এক স্থান।









