পাহাড়ের সবুজ, নীল জলরাশি আর ঝরনার ছুটে চলা স্রোত- প্রকৃতির এই তিন রূপ একসঙ্গে দেখতে চাইলে চলে যেতে পারেন চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের মহামায়া লেক। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা এই জলাধার প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত একটি আকর্ষণীয় ভ্রমণস্থান।
মীরসরাই উপজেলার ৮ নম্বর দুর্গাপুর ইউনিয়নের ঠাকুরদীঘি বাজার থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পূর্বে মহামায়া লেকের অবস্থান। প্রায় ১১ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত লেকটির চারপাশ ঘিরে রয়েছে পাহাড়, সবুজ বন আর ঝরনা।
লেকের জলে নৌভ্রমণ
মহামায়ার অন্যতম আকর্ষণ লেকের নীলচে জলরাশিতে নৌভ্রমণ। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে লেকের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা যায়। নৌকায় যেতে যেতে একদিকে পাহাড়ের সারি, অন্যদিকে শান্ত জলের রূপে পুরো যাত্রাটিই হয়ে ওঠে উপভোগ্য।
বড় নৌকায় পুরো লেক ঘুরতে প্রায় ২ হাজার টাকা এবং ঝরনা এলাকায় যেতে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হয়। তবে নৌকার আকার, সময় ও মৌসুমভেদে ভাড়া পরিবর্তিত হতে পারে।
আছে কায়াকিংও
যারা একটু অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করেন, তাদের জন্য রয়েছে কায়াকিংয়ের সুযোগ। ৩০ মিনিট ও এক ঘণ্টার বিভিন্ন কায়াকিং প্যাকেজ রয়েছে এখানে। লেকের শান্ত পানিতে কায়াকিং করতে করতে চারপাশের পাহাড়ি দৃশ্য উপভোগ করা যায়।
ঝরনার টানে
মহামায়া লেকের পাশাপাশি এখানকার ঝরনাও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। বর্ষায় পাহাড়ি ঝরনায় পানির প্রবাহ বাড়লে চারপাশের প্রকৃতি আরও সতেজ হয়ে ওঠে। তবে ঝরনার পথে যেতে গিয়ে নির্জনতা বাড়তে পারে, তাই দলবদ্ধভাবে যাওয়া এবং স্থানীয় নির্দেশনা মেনে চলা নিরাপদ।
কীভাবে যাবেন?
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে মীরসরাইয়ের ঠাকুরদীঘি বাজার এলাকায় নেমে সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা স্থানীয় পরিবহনে মহামায়া লেকের দিকে যাওয়া যায়। ঠাকুরদীঘি বাজার থেকে জায়গাটি প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। মহামায়া রাবার ড্যাম সড়কের সঙ্গে জাতীয় মহাসড়ক এন-এর সংযোগ এবং স্থানীয় সিএনজি ব্যবহার করে যাওয়া যায়।
কখন যাবেন?
বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে মহামায়ার প্রকৃতি সবচেয়ে সবুজ হয়ে ওঠে। পাহাড়ি ঝরনায় পানির প্রবাহও তখন বাড়ে। তবে অতিবৃষ্টির সময় পাহাড়ি পথ ও ঝরনার আশপাশে সতর্ক থাকা জরুরি।
শীতের সময় আকাশ পরিষ্কার থাকায় লেক ও পাহাড়ের দৃশ্য উপভোগ করা যায়। পরিবার, বন্ধু কিংবা ছোট দলের সঙ্গে একদিনের ভ্রমণের জন্য জায়গাটি বেশ উপযোগী।
প্রকৃতির সৌন্দর্যে কিছুটা ভাটা
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি মহামায়া লেক বর্তমানে কিছু পরিবেশগত সমস্যার মুখেও পড়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে লেকের বড় অংশে কচুরিপানা ছড়িয়ে পড়া এবং বিভিন্ন জায়গায় আবর্জনা জমে থাকার কথা উঠে এসেছে। এতে নৌভ্রমণ ও পর্যটকদের অভিজ্ঞতাও ব্যাহত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পর্যটন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাই লেকের পানি, পাহাড়, ঝরনা ও আশপাশের পরিবেশ রক্ষা করাও জরুরি। নইলে যে সৌন্দর্যের টানে পর্যটকেরা মহামায়ায় আসেন, সেই সৌন্দর্যই একসময় হারিয়ে যেতে পারে।
একদিনের ভ্রমণে যা মনে রাখবেন
মহামায়া ভ্রমণে যাওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে প্রবেশ ফি, নৌকা ও কায়াকিংয়ের বর্তমান ভাড়া জেনে নেওয়া ভালো। কারণ সময় ও ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী এসব খরচ পরিবর্তিত হতে পারে।
সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি ও প্রয়োজনীয় খাবার রাখা ভালো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- লেক বা পাহাড়ে প্লাস্টিক ও আবর্জনা না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে।
পাহাড়ের কোলে শান্ত জলরাশি, নৌকার দুলুনি আর ঝরনার শব্দে মহামায়া লেক হচ্ছে প্রকৃতির কাছে একদিনের জন্য হারিয়ে যাওয়ার সুন্দর একটি ঠিকানা।