যে প্রাসাদে বন্দি ছিলেন নবাব সিরাজের পরিবারের সদস্যরা

ফিচার ডেস্ক
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৫ আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৮

ঢাকার খুব কাছেই এমন একটি জায়গা আছে, যেখানে দাঁড়ালে মনে হবে কয়েক শত বছর পেছনে ফিরে গেছেন। বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে কেরানীগঞ্জের জিনজিরা এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী জিনজিরা প্রাসাদ। সময়ের আঘাতে প্রাসাদের বড় অংশ হারিয়ে গেলেও টিকে থাকা ভগ্নাংশ এখনও বহন করছে মোগল আমল থেকে বাংলার নবাবি সময়ের নানা স্মৃতি।

ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলার মোগল সুবাদার দ্বিতীয় ইবরাহিম খান ১৬৮৯ থেকে ১৬৯৭ সালের মধ্যে জিনজিরা এলাকায় একটি প্রমোদকেন্দ্র নির্মাণ করেন। পরবর্তী সময়ে সেটিই জিনজিরা প্রাসাদ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। প্রাসাদটি ছিল নদী ও পরিখাবেষ্টিত এলাকায়। ‘জিনজিরা’ নামটিও আরবি ‘জাজিরা’ শব্দ থেকে এসেছে বলে ঐতিহাসিকদের মত রয়েছে, যার অর্থ দ্বীপ বা উপদ্বীপ।

একসময় বিশাল এলাকা জুড়ে ছিল এই প্রাসাদের অস্তিত্ব। চারপাশে ছিল গাছপালা, খোলা জায়গা আর নদীর আবহ। এখন সেই চিত্র নেই। আধুনিক বসতি ও ভবনের ভিড়ে প্রাসাদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়াই কঠিন। বর্তমানে মূল স্থাপনার মাত্র দুটি ভগ্নাংশ টিকে আছে।

বর্তমানে মূল স্থাপনার মাত্র দুটি ভগ্নাংশ টিকে আছে (ছবি: সংগৃহীত)

ইতিহাসের বেদনাবিধুর অধ্যায়

জিনজিরা প্রাসাদের ইতিহাস শুধু রাজকীয় জীবন আর স্থাপত্যের গল্প নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার ইতিহাসের নানা বেদনাবিধুর অধ্যায়।

পলাশীর যুদ্ধের পর নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে এই প্রাসাদে বন্দি করে রাখা হয়েছিল বলে ইতিহাসের বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। সিরাজউদ্দৌলার মা আমেনা বেগম, স্ত্রী লুৎফুন্নেসা বেগম ও কন্যা কুদসিয়া বেগমসহ কয়েকজন নারী এখানে বন্দি ছিলেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়। ঘসেটি বেগমকেও এখানে বন্দি রাখা হয়েছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।

এ কারণে জিনজিরা বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ের স্মারক।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে জিনজিরা প্রাসাদে যাওয়া তুলনামূলক সহজ। ঢাকার সদরঘাট থেকে বুড়িগঙ্গা নদী পেরিয়ে কেরানীগঞ্জের দিকে যেতে হয়। সোয়ারীঘাট থেকে নৌকায় বুড়িগঙ্গা পার হয়ে জিনজিরা যাওয়া যায়। নৌযানের ধরন অনুযায়ী নদী পারাপারের ভাড়া সাধারণত কমই। এরপর জিনজিরা ঘাট থেকে স্থানীয় যানবাহনে প্রাসাদ এলাকায় যেতে অল্প খরচ হয়।

সব মিলিয়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে যাতায়াতের জন্য জনপ্রতি আনুমানিক ১০০ থেকে ৩০০ টাকা খরচ ধরলে দিনের ভ্রমণটি করা সম্ভব। তবে যানবাহনের ধরন ও ভাড়ার পরিবর্তনের কারণে খরচ কিছুটা কম-বেশি হতে পারে।

তবে প্রাসাদটি কোনও বড় পর্যটনকেন্দ্রের মতো সাজানো নয়। স্থানীয় বসতির ভেতর দিয়ে সরু পথ ধরে যেতে হয়। ফলে প্রথমবার গেলে স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে পথ জেনে নেওয়া সুবিধাজনক।

হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহাসিক স্থাপনা

জিনজিরা প্রাসাদের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ হলো এর বর্তমান অবস্থা। একসময় যে স্থাপনা বাংলার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী ছিল, এখন তার বড় অংশই হারিয়ে গেছে। অবশিষ্ট ভবনও জরাজীর্ণ। আশপাশে গড়ে উঠেছে আধুনিক বসতি ও নানা স্থাপনা।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসাবে জিনজিরা প্রাসাদ সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কেরানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনও বিভিন্ন সময়ে স্থাপনাটি রক্ষা ও উদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রাসাদের আশপাশে সংরক্ষণের বিষয়টি জানিয়ে সাইনবোর্ডও স্থাপন করা হয়েছে।

তবু সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ থেকেই গেছে। ইতিহাসের এই নিদর্শনকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এটি ঢাকার কাছাকাছি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ভ্রমণস্থানে পরিণত হতে পারে।

ইতিহাস দেখতে চাইলে

প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি যারা ইতিহাসের গল্প খুঁজে বেড়ান, তাদের জন্য জিনজিরা প্রাসাদ ভিন্ন ধরনের একটি ভ্রমণ অভিজ্ঞতা দিতে পারে। এখানে বড় কোনও সাজানো উদ্যান নেই, নেই চোখধাঁধানো স্থাপত্যের সারি। আছে ভগ্ন দেয়াল, পুরোনো ইট আর কয়েক শত বছরের ইতিহাস।

বুড়িগঙ্গার ওপারে গিয়ে সেই পুরোনো দেয়ালের সামনে দাঁড়ালে মনে হতে পারে, সময় অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। কিন্তু দেয়ালের গায়ে লেগে থাকা ইতিহাস এখনও হারিয়ে যায়নি। এটি বাংলার অতীতকে কাছ থেকে দেখার একটি সুযোগ।

/এমএএল/
সম্পর্কিত
ম্যানগ্রোভের সবুজে ঘেরা চর কুকরি-মুকরি
শালবনের ছায়ায় কাটুক একদিন, গন্তব্য রাজেন্দ্র ইকো রিসোর্ট
পূজার ছুটিতে ঘুরে আসুন শাড়ি, মন্দির আর ঐতিহ্যের শহর কাঞ্চীপুরমে
সর্বশেষ খবর
খেলনার চালান খুলতেই মিললো কোটি টাকার ড্রোন
খেলনার চালান খুলতেই মিললো কোটি টাকার ড্রোন
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
সশস্ত্র বাহিনীতে আধুনিক সরঞ্জাম ও মেধাভিত্তিক পদায়ন চায় সংসদীয় কমিটি
সশস্ত্র বাহিনীতে আধুনিক সরঞ্জাম ও মেধাভিত্তিক পদায়ন চায় সংসদীয় কমিটি
বাণিজ্যিক নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ
বাণিজ্যিক নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ
সর্বাধিক পঠিত
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই বিক্রয়ে বাধা নিয়ে মধ্যরাতে আসিফ নজরুলের পোস্ট
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই বিক্রয়ে বাধা নিয়ে মধ্যরাতে আসিফ নজরুলের পোস্ট
পুলিশ পরিদর্শককে কল করে এমপি বললেন ‘এসব ফাইজলামি বাদ দেন’
পুলিশ পরিদর্শককে কল করে এমপি বললেন ‘এসব ফাইজলামি বাদ দেন’
৫০৭ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল আসা গ্রাহককে কল করে যা বললেন মন্ত্রী
৫০৭ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল আসা গ্রাহককে কল করে যা বললেন মন্ত্রী
৫০৭ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল আসা গ্রাহককে মন্ত্রীর ফোন, জিএম বরখাস্ত
৫০৭ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল আসা গ্রাহককে মন্ত্রীর ফোন, জিএম বরখাস্ত
পুলিশের ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা বরখাস্ত
পুলিশের ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা বরখাস্ত