মালয়েশিয়ার বুকিত তিঙ্গির সবুজ পাহাড়ের মাঝে গড়ে উঠেছে ফ্রেঞ্চ ভিলেজ, যা কোলমার ট্রপিকালে নামেও পরিচিত। ফ্রান্সের ছোট কোনো গ্রামের আবহ মনে করিয়ে দেওয়া এই পর্যটনকেন্দ্রে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা, পাথর বিছানো রাস্তা এবং শান্ত-নিরিবিলি প্রাকৃতিক পরিবেশ। ভিন্নধর্মী স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার জন্য মালয়েশিয়ার এই পাহাড়ি গন্তব্যটি ভ্রমণপ্রেমীদের আকর্ষণ করছে।
মালয়েশিয়া ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলে বুকিত তিঙ্গির ফ্রেঞ্চ ভিলেজ ঘুরে দেখা যেতে পারে। এখানে রয়েছে দেখার মতো বিভিন্ন স্থান, সাংস্কৃতিক আয়োজন, প্রকৃতির সান্নিধ্য এবং রাত কাটানোর জন্য বেশ কিছু থাকার ব্যবস্থা। ফলে এক দিনের ভ্রমণের পাশাপাশি চাইলে এখানে অবস্থান করেও পাহাড়ি পরিবেশ উপভোগ করা যায়।
ফ্রান্সের কোলমারের আদলে তৈরি
ফ্রেঞ্চ ভিলেজ তৈরি করা হয়েছে ফ্রান্সের মনোরম মধ্যযুগীয় শহর কোলমারের আদলে। ফরাসি শিল্প, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বেরজায়া হিলসে গড়ে তোলা এই গ্রামটি চালু হয় ২০০০ সালে।
এখানকার স্থাপত্যে ইউরোপীয় শহরের পুরোনো দিনের আবহ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কাঠের কাঠামোযুক্ত ভবন, নকশাদার লোহার বারান্দা এবং ফুলে সাজানো জানালা পুরো এলাকাকে করেছে আকর্ষনীয়। আধুনিক সময়ে নির্মিত হলেও স্থাপত্যের মাধ্যমে ধরে রাখা হয়েছে ইউরোপের পুরোনো শহরের সৌন্দর্য। ফলে মালয়েশিয়ার পাহাড়ি পরিবেশে থেকেও এখানে ফ্রান্সের কোনও ছোট শহরের আবহ অনুভব করা যায়।
কুয়ালালামপুর থেকে সহজেই যাওয়া যায়
মালয়েশিয়ার পাহাং রাজ্যের বেনতং জেলায় অবস্থিত ফ্রেঞ্চ ভিলেজ। কুয়ালালামপুর থেকে সড়কপথে যেতে সময় লাগে প্রায় ৪৫ মিনিট। ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে কারাক মহাসড়ক ধরে বুকিত তিঙ্গির দিকে এগিয়ে গেলেই পৌঁছানো যায় গন্তব্যে। দর্শনার্থীদের জন্য গাড়ি রাখার ব্যবস্থাও রয়েছে।
যারা নিজেরা গাড়ি চালাতে চান না, তারা কুয়ালালামপুর থেকে বিভিন্ন ভ্রমণ আয়োজনের মাধ্যমে ফ্রেঞ্চ ভিলেজে যেতে পারেন। এসব আয়োজনে সাধারণত যাতায়াতের ব্যবস্থাও থাকে। গণপরিবহনে যেতে চাইলে বাস বা ট্রেনে প্রথমে বেনতং যেতে হবে। সেখান থেকে ভাড়ার গাড়ি নিয়ে ফ্রেঞ্চ ভিলেজে পৌঁছানো যায়। তবে এ পথে যাওয়ার আগে পরিবহনের সময়সূচি ও যাতায়াতের সংযোগ সম্পর্কে পরিকল্পনা করে নেওয়া ভালো।
কোলমার স্কয়ারে ইউরোপীয় আবহ
ফ্রেঞ্চ ভিলেজে ঢুকলেই চোখে পড়বে রঙিন ভবন, ইউরোপীয় ধাঁচের স্থাপত্য এবং পাথর বিছানো পথ। এর কেন্দ্রীয় স্থান কোলমার স্কয়ার। চারপাশে মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় স্থাপত্যের আদলে তৈরি ভবনগুলো ঘিরে এখানে তৈরি হয়েছে মনোরম পরিবেশ। হাঁটাহাঁটি, ছবি তোলা কিংবা কিছুটা সময় বসে চারপাশের পরিবেশ উপভোগের জন্য জায়গাটি বেশ আকর্ষণীয়।
গ্রামের উঁচু অংশের একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকেও আশপাশের পাহাড় ও পুরো এলাকার দৃশ্য দেখা যায়। সবুজে ঘেরা পাহাড়ি পরিবেশের সঙ্গে রঙিন স্থাপনাগুলোর দৃশ্য ওপর থেকে আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
জাপানি বাগানে ভিন্ন অভিজ্ঞতা
ফ্রেঞ্চ ভিলেজ থেকে অল্প সময়ের গাড়ি যাত্রায় পৌঁছানো যায় জাপানি চা-বাগানে। এখানে রয়েছে কোই মাছের পুকুর, ঐতিহ্যবাহী চা ঘর এবং সবুজে ঘেরা বাগান। শান্ত পরিবেশে হাঁটাহাঁটির পাশাপাশি চাইলে জাপানি চা-অনুষ্ঠানের অভিজ্ঞতাও নেওয়া যায়।
পরিবার নিয়ে ভ্রমণ করলে খরগোশ উদ্যানেও যাওয়া যেতে পারে। এখানে খরগোশসহ বিভিন্ন ছোট প্রাণী দেখার সুযোগ রয়েছে। শিশুদের নিয়ে কিছুটা সময় কাটানোর জন্য জায়গাটি আকর্ষণীয় হতে পারে। আর প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য রয়েছে উদ্ভিদ উদ্যান। নানা ধরনের বিদেশি উদ্ভিদ, ফুল এবং সবুজে ঘেরা হাঁটার পথ মিলিয়ে জায়গাটি বেশ শান্ত ও মনোরম।
ঘোড়ায় চড়া থেকে পাহাড়ি পথে হাঁটা
ফ্রেঞ্চ ভিলেজে দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বিনোদনমূলক আয়োজনও। পাথর বিছানো পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে ইউরোপীয় ধাঁচের ভবন ও ফুলে সাজানো জানালাগুলো কাছ থেকে দেখা যায়।
কেন্দ্রীয় চত্বরে বিভিন্ন সময়ে সাংস্কৃতিক পরিবেশনার আয়োজন করা হয়। গান, নাচ ও ফরাসি ঐতিহ্যের বিভিন্ন উপাদান তুলে ধরা এসব আয়োজন ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় যোগ করে ভিন্ন মাত্রা। কাছের বেরজায়া পাহাড়ের ঘোড়ার পথে ঘোড়ায় চড়ার সুযোগও রয়েছে। চাইলে ফরাসি ভাবধারার শিল্পকর্ম তৈরির কর্মশালায় অংশ নেওয়া যায়। আর প্রকৃতির আরও কাছে যেতে চাইলে আশপাশের পাহাড়ি পথে হালকা হাঁটা বা পদভ্রমণ করতে পারেন।
ফরাসি খাবারের স্বাদও মিলবে
ভ্রমণের সঙ্গে খাবারের অভিজ্ঞতাও জড়িয়ে থাকে। ফ্রেঞ্চ ভিলেজে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের খাবারের আয়োজন। ফরাসি খাবারের স্বাদ নিতে যেতে পারেন লা সিগনোগ রেস্তোরাঁয়। এখানে ফরাসি খাবারের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ওয়াইন পাওয়া যায়। বিশেষ কোনো আয়োজন কিংবা সন্ধ্যার খাবারের জন্য জায়গাটি বেছে নিতে পারেন।
হালকা খাবার ও পানীয়ের জন্য রয়েছে লা ফ্লাম। কাঠের আগুনে তৈরি পিৎজা, তাজা বেকারি খাবার এবং কফির জন্য পরিচিত এই ক্যাফেতে আরাম করে কিছুটা সময় কাটানো যায়। অন্যদিকে লে ব্লাসনে সকালের নাশতা ও বিভিন্ন ধরনের বাফে খাবারের আয়োজন থাকে। পরিবার বা দলবদ্ধভাবে খাওয়ার জন্যও জায়গাটি উপযোগী।
ফ্রেঞ্চ ভিলেজের বাইরে স্থানীয় মালয়েশীয় খাবারের স্বাদ নিতে চাইলে গাড়ি নিয়ে বেনতং শহরের দিকে যাওয়া যেতে পারে। এতে ভ্রমণের খাবারের অভিজ্ঞতায় যুক্ত হবে স্থানীয় স্বাদের বৈচিত্র্য।
রাত কাটানোর ব্যবস্থাও রয়েছে
শুধু দিনের ভ্রমণ নয়, চাইলে ফ্রেঞ্চ ভিলেজে রাত কাটিয়েও পাহাড়ি পরিবেশ উপভোগ করা যায়। কোলমার ট্রপিকালে বেরজায়া হিলসে রয়েছে সাজানো কক্ষ ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। গ্রামের কাছাকাছি থেকে এর পরিবেশ উপভোগ করতে চাইলে এটি বেছে নিতে পারেন।
আরও বিলাসবহুল ও শান্ত পরিবেশে থাকতে চাইলে রয়েছে দ্য শাতো স্পা অ্যান্ড ওয়েলনেস রিসোর্ট। পাহাড়ি দৃশ্যের পাশাপাশি এখানে স্পা ও আরাম-আয়েশের বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে। কাছাকাছি বেরজায়া হিলস রিসোর্টেও থাকার সুযোগ রয়েছে। সেখানে শান্ত পরিবেশে সময় কাটানোর পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বিনোদনমূলক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া যায়।
ভ্রমণের আগে কিছু প্রস্তুতি জরুরি
ফ্রেঞ্চ ভিলেজ পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় ভ্রমণের আগে আবহাওয়ার খবর জেনে নেওয়া ভালো। বিশেষ করে সন্ধ্যার দিকে ঠান্ডা অনুভূত হতে পারে, তাই সঙ্গে হালকা গরম পোশাক রাখা প্রয়োজন। পাথর বিছানো পথে দীর্ঘ সময় হাঁটতে হতে পারে বলে আরামদায়ক জুতা পরাও জরুরি।
সকালে পৌঁছাতে পারলে তুলনামূলক কম ভিড়ের মধ্যে ঘোরাঘুরি করা যায় এবং শান্ত পরিবেশ উপভোগের সুযোগ মেলে। পাশাপাশি জনপ্রিয় বিনোদনমূলক আয়োজন ও থাকার জায়গাগুলো সপ্তাহান্তে পূরণ হয়ে যায়। তাই ভ্রমণের আগে প্রয়োজনীয় প্রবেশের টিকিট এবং থাকার ব্যবস্থা করে নেওয়া সুবিধাজনক।
মালয়েশিয়ার পাহাড়ি প্রকৃতি, ইউরোপীয় স্থাপত্য, ফরাসি সংস্কৃতির আবহ এবং নানা ধরনের বিনোদনের সমন্বয়ে ফ্রেঞ্চ ভিলেজ বুকিত তিঙ্গি হয়ে উঠেছে ভিন্নধর্মী এক পর্যটন স্থান। একই ভ্রমণে পাহাড়ের সবুজ, ইউরোপীয় স্থাপত্য ও নানা সংস্কৃতির স্বাদ নিতে চাইলে জায়গাটি ভ্রমণতালিকায় রাখতে পারেন।