পাহাড়ঘেরা নীল হ্রদ, বরফশীতল পানি আর তার তলায় লুকিয়ে থাকা শত বছরের ইতিহাস। কিরগিজস্তানের ইসিক-কুল যেন প্রকৃতি ও রহস্যে ঘেরা শহর। মধ্য এশিয়ার এই বিশাল হ্রদের গভীরে ডুবে আছে এক প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষ। একসময় এই শহর ছিল চীন ও ইউরোপকে যুক্ত করা ঐতিহাসিক সিল্ক রোডের গুরুত্বপূর্ণ একটি জনপদ।
শত শত বছর ধরে পানির নিচে থাকা শহরটির নাম কী ছিল, সেখানে কত মানুষ বসবাস করতো কিংবা ঠিক কী কারণে শহরটি হ্রদের তলায় চলে গেলো- এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরোপুরি মেলেনি। ফলে ইতিহাসপ্রেমী ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে ইসিক-কুলের এই পানির নিচের শহর হয়ে উঠেছে বিশেষ আগ্রহের বিষয়।
সম্প্রতি প্রায় ২০ জন বিজ্ঞানীর একটি দল হ্রদের তলদেশে অনুসন্ধান শুরু করেছেন। স্বেচ্ছাসেবী ডুবুরি এলিজাভেতা বোদ্রোভাও এই অভিযানে অংশ নিয়েছেন। ঠান্ডা পানির নিচে নেমে গবেষকেরা প্রাচীন জনপদের সীমানা, স্থাপনা ও দৈনন্দিন জীবনের নানা নিদর্শন খুঁজে দেখছেন।
২০২৪ সালে শুরু হওয়া এই গবেষণা প্রকল্পে অর্থায়ন করছে রুশ বিজ্ঞান একাডেমি। উনিশ শতক থেকেই এই প্রত্নস্থলের অস্তিত্ব গবেষকদের জানা ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতেই রাশিয়া ও কিরগিজস্তানের গবেষকেরা পরিকল্পিতভাবে এর অনুসন্ধান শুরু করেছেন।
সিল্ক রোডের গুরুত্বপূর্ণ জনপদ
প্রাচীন সিল্ক রোড ছিল চীন থেকে ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশাল বাণিজ্যপথ। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই পথ দিয়ে পণ্য, মানুষ, সংস্কৃতি ও জ্ঞান এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল।
ইসিক-কুলের তলায় থাকা জনপদটি সেই ঐতিহাসিক পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে অবস্থিত ছিল বলে ধারণা করা হয়। গবেষকদের মতে, শহরটি কারাখানিদদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় গড়ে উঠেছিল। মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল শাসন করা এই তুর্কি রাজবংশ নবম শতক থেকে ত্রয়োদশ শতকের শুরুর দিক পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল।
গবেষকদের ধারণা, শহরটির আয়তন প্রায় পাঁচ বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। তবে এর প্রকৃত নাম ও জনসংখ্যা সম্পর্কে এখনও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
মিলেছে মসজিদ বা গণস্নানাগারের ধ্বংসাবশেষ
পানির নিচে অনুসন্ধান চালিয়ে গবেষকেরা দুটি প্রাচীন কবরস্থানের চিহ্ন পেয়েছেন। এগুলো ওই অঞ্চলে ইসলামের প্রাথমিক বিস্তারের সময়কার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া পাওয়া গেছে অলংকরণ করা একটি বড় ভবনের ধ্বংসাবশেষ। ভবনটি মসজিদ, গণস্নানাগার কিংবা ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে এর স্থাপত্য থেকে সে সময়কার নগরজীবন ও সামাজিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশা করছেন গবেষকেরা।
হ্রদের তলা থেকে উঠে আসছে পুরোনো নিদর্শন
গবেষণার সময় ডুবুরিদের হাতে এসেছে প্রাণীর হাড় ও মাটির পাত্রের ভাঙা অংশ। প্রাণীর হাড় বিশ্লেষণ করে সে সময়ের মানুষের খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যবহৃত প্রাণীদের বয়স সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করছেন গবেষকেরা।
অন্যদিকে মাটির তৈরি পাত্রগুলো থেকে এগুলোর সময়কাল, উৎপাদনস্থল এবং তৈরির পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উদ্ধার হওয়া তুলনামূলক ভালো অবস্থায় থাকা নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে শিশুর ব্যবহৃত একটি মাটির পাত্র, যা স্থানীয়ভাবে ‘তুভাক’ নামে পরিচিত। গবেষকদের মতে, এ ধরনের পাত্র মধ্য এশিয়া ও ককেশাস অঞ্চলে এখনও ব্যবহৃত হয়। ফলে এটি শুধু একটি পুরোনো বস্তু নয়, বরং সেই সময়কার মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রারও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
পম্পেইয়ের সঙ্গে তুলনা
পানির নিচে হারিয়ে যাওয়া শহরটির গবেষণাকে প্রাচীন রোমান নগরী পম্পেইয়ের অনুসন্ধানের সঙ্গে তুলনা করছেন গবেষকেরা। খ্রিস্টীয় ৭৯ সালে ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে পম্পেই শহর চাপা পড়ে যায়। ফলে শহরটির অনেক স্থাপনা ও ব্যবহার্য জিনিস দীর্ঘদিন প্রায় অক্ষত অবস্থায় সংরক্ষিত ছিল।
ইসিক-কুলের শহরটিও প্রকৃতির কোনও আকস্মিক পরিবর্তনের কারণে পানির নিচে হারিয়ে গিয়ে থাকতে পারে। ফলে হ্রদের তলদেশে থাকা প্রতিটি স্থাপনা ও নিদর্শন গবেষকদের কাছে একটি সময়কালের জীবনযাত্রার জানালা হিসেবে কাজ করছে।
কীভাবে তলিয়ে গেলো শহর?
ইসিক-কুলের পানির নিচে শহরটি কীভাবে চলে গেলো, সেটিই এখনও সবচেয়ে বড় রহস্য। গবেষকদের একটি ধারণা হলো, পাহাড়ধসের কারণে জনপদটি হ্রদের তলায় চলে যেতে পারে।
আরেকটি সম্ভাবনা হলো ভূমিকম্পের পর প্রাকৃতিকভাবে একটি বাঁধ তৈরি হয়েছিল। এতে পানির গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে ধীরে ধীরে জনপদটি প্লাবিত হতে পারে। রুশ বিজ্ঞান একাডেমির ভূতত্ত্ববিদ আন্দ্রেই স্ট্রেলনিকভের ধারণা, অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো বড় ভূমিকম্পজনিত বিপর্যয়ই শহরটি ডুবে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণ।
তবে নিশ্চিতভাবে কী ঘটেছিল, তা এখনও জানা যায়নি। গবেষণা যত এগোবে, নতুন নতুন নিদর্শন হয়তো সেই রহস্যের জট খুলবে।
পর্যটকদের জন্য কেন আকর্ষণীয়
কিরগিজস্তান ভ্রমণে ইসিক-কুল এমনিতেই অন্যতম আকর্ষণীয় জায়গা। চারপাশের পাহাড়, নীল জল আর বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্য হ্রদটি পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। তার সঙ্গে যদি যুক্ত হয় পানির নিচে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন একটি শহরের গল্প, তাহলে জায়গাটির আকর্ষণ আরও বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ থেকে কিরগিজস্তান ভ্রমণে যারা প্রকৃতির পাশাপাশি ইতিহাস ও অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করেন, তাদের জন্য ইসিক-কুল হতে পারে ভিন্নধর্মী একটি স্থান। তবে পানির নিচে থাকা প্রত্নস্থলটি সাধারণ পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত কি না এবং ডুব দিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় যাওয়ার অনুমতি রয়েছে কি না, তা ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জেনে নেওয়া জরুরি।
প্রকৃতি, ইতিহাস ও রহস্যঘেরা ইসিক-কুলের পানির নিচের এই হারানো শহর হয়ে উঠেছে মধ্য এশিয়ার অন্যতম কৌতূহলোদ্দীপক প্রত্নস্থল। গবেষকদের অনুসন্ধান হয়তো একদিন তুলে ধরবে সেই শহরের মানুষের জীবন, সংস্কৃতি এবং হারিয়ে যাওয়ার প্রকৃত ইতিহাস।