হিমালয়ের মনোরম উপত্যকা, পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি সুড়ঙ্গ আর নদীর অনেক উঁচুতে নির্মিত রেলসেতু ট্রেনের জানালা দিয়ে এমন দৃশ্য দেখতে দেখতে যাত্রা করার অভিজ্ঞতা যে কোনও ভ্রমণপিপাসুর কাছেই বিশেষ আকর্ষণীয়। ভারতের জম্মু থেকে শ্রীনগর পর্যন্ত বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে চড়ে কাশ্মীর যাওয়ার পথে উপভোগ করা যায় এমনই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। তাই কাশ্মীর ভ্রমণের পরিকল্পনা করলে শুধু স্থান নয়, এই রেলযাত্রাকেও রাখতে পারেন ভ্রমণতালিকায়।
সম্প্রতি চেনাব নদীর ওপর নির্মিত বিশ্বের সর্বোচ্চ রেলসেতু পেরিয়ে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার গতিতে চলেছে এই বন্দে ভারত এক্সপ্রেস। কাটরা-বানিহাল রেলপথে অনুমোদিত গতিসীমা বাড়ানোর পর এই গতি অর্জন করেছে ট্রেনটি।
বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্যও কাশ্মীর ভ্রমণে এই রেলপথ হতে পারে আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা। তবে মনে রাখতে হবে, বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে চড়ার আগে ভারতের জম্মু বা অন্য কোনও সংযোগস্থলে পৌঁছাতে হবে। বাংলাদেশ থেকে এই ট্রেন সরাসরি চলাচল করে না।
কাশ্মীরগামী বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের রুট
জম্মু তাওয়ি থেকে শ্রীনগর পর্যন্ত প্রায় ২৬৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয় বন্দে ভারত এক্সপ্রেস। যাত্রায় সময় লাগে আনুমানিক পাঁচ ঘণ্টা। পথে গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলোর মধ্যে রয়েছে শ্রী মাতা বৈষ্ণোদেবী কাটরা, রিয়াসি ও বানিহাল। এই রেলপথ উধমপুর-শ্রীনগর-বারামুল্লা রেল লিঙ্কের (ইউএসবিআরএল) অংশ, যা কাশ্মীর উপত্যকাকে ভারতের বিস্তৃত রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
এই যাত্রার অন্যতম আকর্ষণ চেনাব রেলসেতু। নদীর তলদেশ থেকে প্রায় ৩৫৯ মিটার উঁচুতে অবস্থিত সেতুটি বিশ্বের সর্বোচ্চ রেলসেতু হিসাবে পরিচিত। এ ছাড়া রয়েছে ভারতের প্রথম কেবল-স্টেড রেলসেতু অঞ্জি খাদ সেতু। হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডের মধ্যে তৈরি সুড়ঙ্গ পেরিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও এই যাত্রাকে করে তোলে ব্যতিক্রমী।
বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের সময়সূচি
জম্মু তাওয়ি ও শ্রীনগরের মধ্যে বর্তমানে দুই জোড়া বন্দে ভারত এক্সপ্রেস পরিষেবা রয়েছে। ভারতীয় রেলের প্রকাশিত সময়সূচি অনুযায়ী, ট্রেনগুলোর সময় নিচে দেওয়া হলো।
ভারতীয় রেলের প্রকাশিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২৬৪০১ নম্বর ট্রেনটি সকাল ৬টা ২০ মিনিটে জম্মু তাওয়ি থেকে ছেড়ে সকাল ১১টা ১০ মিনিটে শ্রীনগরে পৌঁছায়। ফিরতি পথে ২৬৪০২ নম্বর ট্রেনটি শ্রীনগর থেকে দুপুর ২টায় ছেড়ে সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে জম্মু তাওয়িতে পৌঁছায়। অন্যদিকে, ২৬৪০৩ নম্বর ট্রেনটি জম্মু তাওয়ি থেকে দুপুর ১টা ২০ মিনিটে ছেড়ে সন্ধ্যা ৬টায় শ্রীনগরে পৌঁছায়। এর ফিরতি ট্রেন ২৬৪০৪ নম্বরটি শ্রীনগর থেকে সকাল ৮টায় ছেড়ে দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে জম্মু তাওয়িতে পৌঁছায়।
প্রকাশিত সূচি অনুযায়ী, ২৬৪০১ ও ২৬৪০২ নম্বর ট্রেন মঙ্গলবার এবং ২৬৪০৩ ও ২৬৪০৪ নম্বর ট্রেন বুধবার চলাচল করে না। যাত্রার আগে ভারতীয় রেলের সরকারি বুকিং ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট দিনের সময়সূচি ও আসনের প্রাপ্যতা যাচাই করে নেওয়া উচিত।
টিকিটের ভাড়া কত?
প্রদত্ত ভাড়ার তথ্য অনুযায়ী, এই রুটে এসি চেয়ার কারের টিকিটের মূল্য ৭২০ ভারতীয় রুপি এবং এক্সিকিউটিভ চেয়ার কারের ভাড়া ১,৩৩০ রুপি। বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক হিসাব করলে এসি চেয়ার কার প্রায় ৯১৫ টাকা ও এক্সিকিউটিভ চেয়ার কার প্রায় ১,৬৯০ টাকা।
এই হিসাব আনুমানিক, বিনিময় হার ও বুকিংয়ের সময় অনুযায়ী টাকার পরিমাণ পরিবর্তিত হতে পারে। টিকিট কাটার আগে সরকারি রেল বুকিং ব্যবস্থায় প্রকৃত ভাড়া যাচাই করুন। এই ভাড়ার মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যাতায়াত, থাকা-খাওয়া কিংবা কাশ্মীরের অন্যান্য জায়গায় ঘোরার খরচ অন্তর্ভুক্ত নয়।
কাশ্মীরে কোথায় কোথায় ঘুরবেন?
১. শ্রীনগর: কাশ্মীর ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ শ্রীনগর। ডাল লেকে শিকারা নৌকায় ভ্রমণ, মুঘল আমলের বাগান ঘুরে দেখা এবং পুরোনো শহরের বাজারে কেনাকাটা—সব মিলিয়ে এখানে কাটাতে পারেন কয়েকটি সুন্দর দিন। আশপাশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে যাওয়ার জন্যও শ্রীনগরকে মূল ঘাঁটি হিসেবে বেছে নেওয়া যায়।
২. কাটরা: শ্রী মাতা বৈষ্ণোদেবী মন্দিরে তীর্থযাত্রার অন্যতম প্রবেশদ্বার কাটরা। ধর্মীয় ভ্রমণের পাশাপাশি স্থানীয় বাজার ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে। কাশ্মীর ভ্রমণের সঙ্গে বৈষ্ণোদেবী মন্দির দর্শন যুক্ত করতে চাইলে কাটরায় সময় রাখতে পারেন।
৩. পাটনিটপ: সবুজ তৃণভূমি, পাইনগাছের বন এবং পাহাড়ের দৃশ্যের জন্য পরিচিত পাটনিটপ। প্রকৃতির মাঝে সময় কাটাতে চাইলে এই জায়গাটি ভ্রমণতালিকায় রাখতে পারেন। তবে এখানে যেতে আলাদা সড়কপথে যাত্রা করতে হবে।
৪. পহেলগাম: মনোরম উপত্যকা, নদী আর পাইনগাছে ঘেরা পাহাড়ি পরিবেশের জন্য পরিচিত পহেলগাম। এখানে বিটাব ভ্যালি ও আরু ভ্যালি ঘুরে দেখতে পারেন। তবে স্থানীয় বিধিনিষেধ ও আবহাওয়ার কারণে যাতায়াতের সুযোগ বদলাতে পারে।
৫. গুলমার্গ: বিস্তীর্ণ তৃণভূমি, পাহাড়ি দৃশ্য এবং গন্ডোলা কেবল কারের জন্য পরিচিত গুলমার্গ। হিমালয়ের সৌন্দর্য উপভোগ করা ও প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানোর জন্য এটি জনপ্রিয় গন্তব্য। শীতকালে বরফে ঢাকা পাহাড় যেমন পর্যটকদের আকর্ষণ করে, তেমনই অন্য ঋতুতেও এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।
বাংলাদেশ থেকে কাশ্মীর যেতে কী মনে রাখবেন?
২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভারতীয় ট্যুরিস্ট ভিসার আবেদন পুনরায় চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তবে আবেদন, অ্যাপয়েন্টমেন্ট ও ভিসা প্রদানের বর্তমান অবস্থা যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট ভিসা কেন্দ্রের মাধ্যমে যাচাই করে নিন।
কাশ্মীর ভ্রমণের পরিকল্পনা করার সময় বাংলাদেশের যাত্রাস্থল থেকে ভারতের প্রবেশপথ বা সংযোগস্থল পর্যন্ত যাতায়াত, জম্মু বা শ্রীনগরে হোটেল, স্থানীয় পরিবহন এবং দর্শনীয় স্থানে প্রবেশের খরচ আলাদা করে হিসাব করুন। পাশাপাশি পাহাড়ি অঞ্চলের আবহাওয়া, স্থানীয় নিরাপত্তা নির্দেশনা ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোর প্রবেশসংক্রান্ত নিয়ম জেনে নিন।
কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি বিশ্বের সর্বোচ্চ রেলসেতু পেরিয়ে বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে ভ্রমণ হতে পারে এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। তবে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার আগে ট্রেনের সময়সূচি, ভাড়া, ভিসা ও স্থানীয় যাতায়াতের সর্বশেষ তথ্য যাচাই করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
সূত্র: এনডিটিভি