পুরান ঢাকার অলিগলি মানেই পুরনো বাড়ি, খাবারের গন্ধ আর ব্যস্ত জনজীবন। পাশাপাশি এই শহরের আনাচকানাচে ছড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের নানা অধ্যায়। তেমনই এক ঐতিহাসিক নিদর্শন নিমতলী দেউড়ি। প্রায় আড়াইশ’ বছরের পুরনো এই স্থাপনা আজও মনে করিয়ে দেয় ঢাকার নবাবি আমল এবং প্রশাসনিক ইতিহাসের কথা।
প্রাসাদ নেই, রয়ে গিয়েছে প্রবেশদ্বার
নিমতলী দেউড়ির ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে নিমতলী প্রাসাদের সঙ্গে। ১৭৬৫-৬৬ সালের দিকে নির্মিত এই প্রাসাদ ছিল ঢাকার নায়েব-এ-নাজিমদের সরকারি বাসভবন। সে সময় বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত হলেও ঢাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রম চালু ছিল। নায়েব-এ-নাজিমরা সেই প্রশাসনিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন।
একসময় নিমতলী প্রাসাদজুড়ে ছিল নানা স্থাপনা ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের আয়োজন। সময়ের সঙ্গে মূল প্রাসাদটি হারিয়ে গেলেও তার প্রবেশদ্বারটি টিকে রয়েছে। সেই প্রবেশদ্বারই আজ নিমতলী দেউড়ি নামে পরিচিত।
স্থাপত্যে চোখে পড়বে অন্য সময়ের ছাপ
নিমতলী দেউড়ির অন্যতম আকর্ষণ এর প্রাচীন স্থাপত্য। তিনতলাবিশিষ্ট এই ভবনের মাঝখানে রয়েছে খিলানযুক্ত প্রবেশপথ। স্থাপত্যে ইউরোপীয় গথিক রীতির প্রভাবও লক্ষ করা যায়। চারপাশের বারান্দা এবং আটকোণা খিলানযুক্ত জানালা স্থাপনাটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।
একসময় দেউড়ির উপরের তলায় ছিল নহবতখানা। সেখান থেকে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে নায়েব-এ-নাজিমের আগমনের ঘোষণা দেওয়া হতো বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। আজ সেই পুরনো জৌলুস না থাকলেও স্থাপনাটি অতীতের স্মৃতি বহন করে চলেছে।
এখন এখানে রয়েছে ঐতিহ্য জাদুঘর
বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির উদ্যোগে সংস্কারের পর ২০১৮ সালে এখানে ঐতিহ্য জাদুঘর চালু করা হয়। জাদুঘরে বাংলার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস এবং ঢাকার নবাবি আমলের নানা নিদর্শন তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ থাকলে এখানে এসে পুরনো ঢাকার প্রশাসনিক কাঠামো, নায়েব-এ-নাজিমদের জীবনযাপন এবং শহরের অতীত সম্পর্কে জানার সুযোগ মিলতে পারে। তাই ঢাকার ইতিহাসকে আরও কাছ থেকে বোঝার জন্য জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে যাবেন?
পুরান ঢাকার চানখাঁরপুল ও বঙ্গবাজারের কাছাকাছি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির প্রাঙ্গণে অবস্থিত। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে রিকশা, সিএনজি বা অন্যান্য যানবাহনে চানখাঁরপুল কিংবা বঙ্গবাজার এলাকায় পৌঁছে সেখান থেকে গন্তব্যে যাওয়া যায়।
পুরান ঢাকার পরিচিত দর্শনীয় স্থানগুলির বাইরে একটু অন্য রকম অভিজ্ঞতার জন্য নিমতলী দেউড়ি ইতিহাসনির্ভর ছোট্ট ভ্রমণের উপযুক্ত স্থান। এখানে দাঁড়িয়ে মনে হবে, শহর বদলেছে, হারিয়ে গিয়েছে বহু স্থাপনা, কিন্তু একটি প্রাচীন প্রবেশদ্বার আজও অতীতের গল্প বলে চলেছে।