বিদেশের কোনও শহরে পৌঁছে বিমানবন্দর থেকেই অনেক সময় সেই দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও পরিকাঠামো সম্পর্কে প্রথম ধারণা পাওয়া যায়। ভারতের দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবার এক বিদেশি পর্যটকের নজর কেড়েছে। বিমানবন্দরের গোছানো ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে দেওয়ালে থাকা শিল্পকর্ম সবকিছুই মুগ্ধ করেছে তাঁকে। এমনকি ইউরোপের অধিকাংশ বিমানবন্দরের তুলনায় দিল্লি বিমানবন্দরকে বেশি সুশৃঙ্খল বলেও মন্তব্য করেছেন ওই পর্যটক।
ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এসকেলেটর দিয়ে নামার সময় বিমানবন্দরের দেওয়ালে একটি বিশেষ শিল্পকর্ম দেখতে পান ওই নারী। দিল্লি বিমানবন্দরের টার্মিনাল ৩-এর আগমন ও অভিবাসন হলে অবস্থিত এই শিল্পস্থাপনার নাম ‘ক্যানিয়ন ওয়াল অব মুদ্রাস’।
দেওয়ালে সারি সারি হাতের ভঙ্গি দেখে কৌতূহলী হয়ে ওঠেন তিনি। ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, “দেওয়ালে ছোট ছোট হাতের ছবি রয়েছে।” এরপর ভারতীয় দর্শকদের কাছে ওই হাতের ভঙ্গিগুলোর অর্থ জানতে চান তিনি। মন্তব্যের ঘরে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ারও অনুরোধ জানান।
ভিডিওটির ক্যাপশনে ওই নারী লেখেন, “দিল্লি বিমানবন্দরটি সত্যিই খুব সুন্দর! সত্যি বলতে, ইউরোপের অধিকাংশ বিমানবন্দরের তুলনায় এখানকার ব্যবস্থাপনা অনেক বেশি সুশৃঙ্খল।”
তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিমানবন্দরও যে কোনও দেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরারও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে তা এই বিমানবন্দরকে দেখে নতুন করে উপলব্ধি হয়।
ওই পর্যটকের প্রশ্নের জবাবে মন্তব্যের ঘরে হাতের ভঙ্গিগুলোর সাংস্কৃতিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন অনেকে। এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “এই হাতের ভঙ্গিগুলোকে বৈদিক মুদ্রা বলা হয়। প্রাচীন হিন্দু বৈদিক গ্রন্থের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। ভারতের ঐতিহ্যবাহী শাস্ত্রীয় নৃত্যেও এ ধরনের হাতের ভঙ্গি দেখা যায়। শরীরের পাঁচটি উপাদান বায়ু, অগ্নি, জল, ভূমি ও আকাশের সঙ্গে আঙুলগুলোর সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয়। ধ্যানের সময়ও স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত রাখার উদ্দেশে এসব মুদ্রা ব্যবহার করা হয়।”
অন্য এক ব্যবহারকারীর কথায়, “এগুলো মুদ্রা। ভারতের প্রায় সব ধরনের নৃত্যশৈলীতেই এর ব্যবহার রয়েছে। প্রতিটি মুদ্রার আলাদা নাম ও অর্থ আছে।”
আরেকজনের মতে, এই হাতের ভঙ্গিগুলো শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রতীক।
দিল্লি বিমানবন্দরের ‘ক্যানিয়ন ওয়াল অব মুদ্রাস’ নান্দনিক একটি দেওয়ালচিত্রের মাধ্যমে ভারতীয় শিল্প ও সংস্কৃতিকে বিশেষভাবে উপস্থাপন করেছে। প্রায় ২৪০ মিটার দীর্ঘ এই শিল্পস্থাপনায় রয়েছে ফাইবারগ্লাস ও স্পান কপার দিয়ে তৈরি ৯টি বিশাল হাতের ভাস্কর্য। প্রতিটি হাতের উচ্চতা প্রায় ২ দশমিক ৭৫ মিটার এবং ওজন প্রায় ১৫০ কেজি।
দেওয়াল থেকে প্রায় তিন মিটার উচ্চতায় স্থাপন করা হয়েছে ভাস্কর্যগুলো। এর পেছনে রয়েছে তামার প্রলেপ দেওয়া অ্যালুমিনিয়ামের ৬৭৫টি চাকতি, যা পুরো স্থাপনাকে দিয়েছে আকর্ষণীয় চেহারা।
৯টি মুদ্রায় ভারতীয় ঐতিহ্যের ছোঁয়া
এই শিল্পস্থাপনায় তুলে ধরা হয়েছে অভয়, বরদ, আকাশ, ময়ূর, চতুর, ত্রিপতাক, প্রাণ, ত্রিশূল ও প্রাণায়াম- এই ৯টি মুদ্রা। নৃত্য, যোগব্যায়াম ও অন্যান্য শিল্পমাধ্যমে হাতের ভঙ্গির যে বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে, তা তুলে ধরাই এই শিল্পকর্মের অন্যতম উদ্দেশ্য।
ভারতে আগত দেশি-বিদেশি পর্যটকদের শান্তি ও সৌহার্দ্যের বার্তা দিয়ে স্বাগত জানানোর ভাবনা থেকেই সাজানো হয়েছে এই স্থাপনা। এর মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে আন্তর্জাতিক যাত্রীদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
নান্দনিক নকশা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কারণে ‘ক্যানিয়ন ওয়াল অব মুদ্রাস’ দিল্লি বিমানবন্দরের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। বিদেশি পর্যটকের চোখে পড়া এই শিল্পকর্ম যাত্রাপথে দেখা শিল্প, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির অভিজ্ঞতাকে স্মরণীয় করে তুলতে পারে।