সব ঋতুতেই অনন্য গ্রিস

ফিচার ডেস্ক
১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১০ আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১০

গ্রিস মানেই শুধু গ্রীষ্মের নীল সমুদ্র, সাদা-নীল বাড়ির সারি আর পর্যটকদের ভিড়। তবে এই পরিচিত ছবির বাইরেও রয়েছে এক অন্য গ্রিস। দেশটির দক্ষিণের পেলোপনিস উপদ্বীপে পাহাড়, পাইনবন, প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন, পাথরের তৈরি দুর্গনগরী, নির্জন সৈকত আর ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ জীবন মিলেমিশে তৈরি করেছে ভ্রমণের অনন্য অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে শরৎকালে পর্যটকদের ভিড় কমলে এই অঞ্চলের প্রকৃতি ও সংস্কৃতিকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ মেলে।

গ্রিসের পাহাড়ি জনপদ (ছবি: দ্যা গার্ডিয়ান)

শরতের পেলোপনিসে প্রকৃতির অন্য রূপ

পেলোপনিসের মেসিনিয়া, মানি ও লাকোনিয়া এই তিন অঞ্চল ঘিরে সাজানো যেতে পারে দীর্ঘ সড়কভ্রমণের পরিকল্পনা। যাত্রা শুরুর আদর্শ জায়গা কালামাতা। সবুজে ঘেরা এই বন্দরনগরী থেকে উপকূলীয় পথ ধরে পাহাড়ি জনপদ, ঐতিহাসিক শহর ও সমুদ্রতীরের গ্রাম ঘুরে দেখা যায়।

শরৎকালে গ্রীষ্মের তীব্র গরম অনেকটাই কমে আসে। পাহাড়ি উপত্যকায় পাইনবন, বুনো ফুল, চুনাপাথরের বাড়ি আর ছোট ছোট গ্রাম মিলে তৈরি করে শান্ত পরিবেশ। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে দীর্ঘ পথ হাঁটা, পাহাড়ি রাস্তা ধরে গাড়ি চালানো কিংবা সমুদ্রসৈকতে সময় কাটানো সবই সম্ভব।

এ সময় বিভিন্ন অঞ্চলে ফসল ঘিরে স্থানীয় উৎসবও ভ্রমণের আকর্ষণ বাড়ায়। লাকোনিয়ায় আঙুর, কমলা ও চেস্টনাট, মেসিনিয়ায় ডুমুর এবং কালামাতার আশপাশে জলপাই সংগ্রহকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ জীবনে উৎসবের আমেজ দেখা যায়।

মিস্ত্রাস ও স্পার্টা: ইতিহাসের পথে

পেলোপনিস ভ্রমণে ইতিহাসপ্রেমীদের তালিকায় রাখা যেতে পারে মিস্ত্রাস। তাইগেতুস পর্বতমালার ঢালে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক জনপদ বাইজেন্টাইন স্থাপত্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের জন্য পরিচিত। প্রাচীন প্রাসাদ, গির্জা ও পাথুরে পথ ধরে ঘুরে দেখা যায় অতীতের স্থাপত্যশৈলী।

কাছেই স্পার্টা প্রাচীন গ্রিসের অন্যতম পরিচিত নগররাষ্ট্র। আধুনিক শহরের পাশাপাশি এখানে রয়েছে প্রাচীন অ্যাক্রোপলিস ও আগোরার ধ্বংসাবশেষ। শহরে লিওনিদাসের মূর্তিও স্মরণ করিয়ে দেয় স্পার্টার সামরিক ইতিহাস ও বীরত্বের কাহিনি।

ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিতে চাইলে আশপাশের গ্রামগুলির তাভেরনা বা ঐতিহ্যবাহী সরাইখানায় থামা যেতে পারে।

গ্রিসের নির্জন সমুদ্রসৈকত এলাফোনিসোস দ্বীপ (ছবি: দ্যা গার্ডিয়ান)

মোনেমভাসিয়া: পাথরের দুর্গনগরীতে মধ্যযুগের ছোঁয়া

পেলোপনিসের অন্যতম আকর্ষণ মোনেমভাসিয়া। সমুদ্রের ধারে পাথুরে ভূখণ্ডের ওপর গড়ে ওঠা এই দুর্গনগরীর সরু গলি, মধ্যযুগীয় স্থাপত্য ও অর্থোডক্স গির্জা পর্যটকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। দুর্গপ্রাচীরের ভিতরে হাঁটতে হাঁটতে বাইজেন্টাইন ও ভেনিসীয় ইতিহাসের নানা চিহ্ন চোখে পড়ে।

এলাফোনিসোস: ফিরোজা জল আর নির্জন সৈকত

দুর্গনগরী ঘোরার পর সমুদ্রসৈকতে সময় কাটাতে চাইলে যাওয়া যায় এলাফোনিসোস দ্বীপে। পুন্তা থেকে ফেরিতে প্রায় ১০ মিনিটের পথ। দ্বীপের সিমোস সৈকত সোনালি বালি, বালিয়াড়ি ও স্বচ্ছ ফিরোজা জলের জন্য পরিচিত। গ্রীষ্মের ব্যস্ত পর্যটন মৌসুমের বাইরে সৈকত তুলনামূলক শান্ত থাকে। সমুদ্রের ধারে অবসর কাটানো, ছবি তোলা কিংবা উপকূলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য এটি অনন্য।

মানি উপদ্বীপ: পাথরের টাওয়ার ও নীল সমুদ্র

পেলোপনিসের দক্ষিণ প্রান্তে মানি উপদ্বীপের বিশেষত্ব তার রুক্ষ পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, বিচ্ছিন্ন গ্রাম এবং পাথরের তৈরি টাওয়ার-বাড়ি। অতীতে বিভিন্ন গোত্রের সংঘাত ও আত্মরক্ষার প্রয়োজনে নির্মিত এই টাওয়ারগুলি আজও অঞ্চলের ইতিহাসের সাক্ষী।

ভাথিয়া গ্রামের পাথরের টাওয়ারগুলি মানির অন্যতম পরিচিত দৃশ্য। পাহাড়ের উপর ঘন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িগুলি এই অঞ্চলের স্থাপত্য ও অতীত জীবনযাত্রার পরিচয় বহন করে। কিছু পুরনো ভবন পরিত্যক্ত, আবার কিছু সংস্কার করে অতিথিশালায় রূপান্তরিত হয়েছে।

উপকূল ধরে এগোলে গেরোলিমেনাসের মতো ছোট সমুদ্রতীরবর্তী জনপদে পৌঁছনো যায়। এখান থেকে মানির পূর্ব ও পশ্চিম উপকূল ঘুরে দেখা সুবিধাজনক। স্থানীয় হোটেল ও সরাইখানায় সামুদ্রিক খাবারের পাশাপাশি উপভোগ করা যায় শান্ত উপকূলীয় পরিবেশ।

গ্রামীণ ঐতিহ্য ও স্থানীয় সংস্কৃতির টান

মানি, মেসিনিয়া ও লাকোনিয়ার গ্রামগুলির আকর্ষণ শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানকার ঐতিহ্যবাহী খাবার, স্থানীয় বাজার, পারিবারিক সরাইখানা ও লোকসংস্কৃতিও ভ্রমণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মানি অঞ্চলের মিরালোগিয়া নামে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী শোকগাথা গ্রিক লোকসংস্কৃতির এক বিশেষ নিদর্শন। অতীতে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় নারীরা এই শোকগাথা গাইতেন। আধুনিক জীবনযাত্রায় এই প্রথা ক্রমশ বিরল হয়ে এলেও অঞ্চলটির সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এর গুরুত্ব রয়েছে।

মেসিনিয়ার গ্রামগুলিতে স্থানীয় উৎসবের সময় ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত ও কালামাতিয়ানোস নাচের আসর বসে। পরিবার ও প্রতিবেশীদের অংশগ্রহণে এই অনুষ্ঠানগুলি গ্রামীণ জীবনের প্রাণবন্ত ছবি তুলে ধরে।

মেসিনিয়া: জলপ্রপাত, বন ও অ্যাডভেঞ্চার

প্রকৃতি ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য মেসিনিয়া বিশেষ আকর্ষণীয়। কালামাতা থেকে পিলোসের দিকে এগোলে পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ধীরে ধীরে বদলে যায় সবুজ বন ও উপকূলীয় সমতলে। এই অঞ্চলে রয়েছে প্রাচীন প্রত্নস্থল, নির্জন সৈকত এবং জলপ্রপাত।

পলিলিমনিও জলপ্রপাত ও তার আশপাশের প্রাকৃতিক জলাধারগুলি মেসিনিয়ার উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ। পাইনবনে ঘেরা পথ ধরে হেঁটে সেখানে পৌঁছনো যায়। আবহাওয়া ও স্থানীয় নিরাপত্তাবিধি অনুকূলে থাকলে এই অঞ্চল প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানোর সুযোগ দেয়।

কী ভাবে সাজাবেন ভ্রমণ পরিকল্পনা?

কালামাতাকে কেন্দ্র করে পেলোপনিসের দক্ষিণাঞ্চল ঘুরে দেখার জন্য কয়েক দিন সময় হাতে রাখা ভালো। কালামাতা থেকে স্পার্টা ও মিস্ত্রাস, সেখান থেকে মোনেমভাসিয়া, এলাফোনিসোস ও গিথিও হয়ে মানি উপদ্বীপ ঘুরে আবার মেসিনিয়ার পিলোসের দিকে যাওয়ার পরিকল্পনা করা যায়। তবে দূরত্ব ও দর্শনীয় স্থানগুলিতে সময় দেওয়ার কথা মাথায় রেখে রুট সাজানো জরুরি।

গ্রিসের পরিচিত দ্বীপগুলির বাইরে নতুন গন্তব্য খুঁজছেন যারা, তারা ঘুরে দেখতে পারেন পেলোপনিস। এখানে ইতিহাসের নিদর্শন, পাহাড়ি গ্রাম, স্বচ্ছ সমুদ্র, স্থানীয় খাবার ও জীবন্ত লোকসংস্কৃতি সব মিলিয়ে তৈরি হয় এমন এক ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা, যার স্বাদ শুধু গ্রীষ্মে নয়, বছরের বিভিন্ন ঋতুতেই উপভোগ করা যায়।

সূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান

 

/এমএএল/
সম্পর্কিত
নদী, বন আর ডলফিনের দেশ ঢাংমারী
দুই বছরের প্রকল্প ৯ বছর পার, অবশেষে খুলছে ওসমানী উদ্যানের দুয়ার
লেক কোমোর ধারে পুরোনো ভিলায় ফিরেছে আদি জৌলুশ
সর্বশেষ খবর
শাওমি ফোনে এত বিজ্ঞাপন কেন দেখায়, বন্ধ করবেন যেভাবে
শাওমি ফোনে এত বিজ্ঞাপন কেন দেখায়, বন্ধ করবেন যেভাবে
শজিমেক হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে আগুন
শজিমেক হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে আগুন
রান্নার সরঞ্জাম ও মানবদেহে লুকিয়ে স্বর্ণ পাচার: একদিনে ৫ কোটি টাকার স্বর্ণ জব্দ
রান্নার সরঞ্জাম ও মানবদেহে লুকিয়ে স্বর্ণ পাচার: একদিনে ৫ কোটি টাকার স্বর্ণ জব্দ
পদত্যাগ নিয়ে রাতভর নাটকীয়তার পর সকালে ইশরাকের ‘ইউটার্ন’
পদত্যাগ নিয়ে রাতভর নাটকীয়তার পর সকালে ইশরাকের ‘ইউটার্ন’
সর্বাধিক পঠিত
সৌদিতে নজরুলের মৃত্যুদণ্ডের খবর শুনে ফুফুর মৃত্যু, কী ঘটেছিল জানালেন বাবা-মা
সৌদিতে নজরুলের মৃত্যুদণ্ডের খবর শুনে ফুফুর মৃত্যু, কী ঘটেছিল জানালেন বাবা-মা
শাহজালাল বিমানবন্দরের এমন রূপ কেউ কখনও দেখেননি আগে 
শাহজালাল বিমানবন্দরের এমন রূপ কেউ কখনও দেখেননি আগে 
সেনা সদস্যদের জীবনমান আরও উন্নত করতে ‘ওয়ান র‍্যাংক ওয়ান পেনশন’ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন
সাভার ক্যান্টনমেন্টে প্রধানমন্ত্রী  সেনা সদস্যদের জীবনমান আরও উন্নত করতে ‘ওয়ান র‍্যাংক ওয়ান পেনশন’ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন
মধ্যরাতে প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের স্ট্যাটাস, কথা বলেছেন পদত্যাগ নিয়ে
মধ্যরাতে প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের স্ট্যাটাস, কথা বলেছেন পদত্যাগ নিয়ে
‘আমি সাধারণ বিদেশি নই’: দেশ ছাড়ার নোটিশকে চ্যালেঞ্জ নায়ক ইমরান খানের
‘আমি সাধারণ বিদেশি নই’: দেশ ছাড়ার নোটিশকে চ্যালেঞ্জ নায়ক ইমরান খানের