শহীদ সিরাজ লেকে দারুণ ভালোলাগা

Send
নাকিবুল আহসান নিশাদ
প্রকাশিত : ১৮:৩০, জানুয়ারি ১৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪১, জানুয়ারি ১৬, ২০২০

পাখির চোখে শহীদ সিরাজ লেকমেঘালয় পাহাড় সংলগ্ন শহীদ সিরাজ লেক বাংলাদেশের অন্যতম নয়নাভিরাম পর্যটন গন্তব্য। এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন হ্রদের পাড়ে ভিড় জমান দেশ-বিদেশের অনেক পর্যটক। পাশেই মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সিরাজের সমাধি। তার নামে এই লেকের নামকরণ হয়েছে।

শহীদ সিরাজ লেক মূলত টেকেরঘাট চুনাপাথর খনিজ প্রকল্পের পরিত্যক্ত একটি কোয়ারি। ১৯৪০ সাল থেকে এখানে চুনাপাথর সংগ্রহ করে সিলেটের ছাতক উপজেলার সুরমা নদীর তীরে আসাম বেঙ্গল সিমেন্ট কোম্পানির কারখানায় পাঠানো হতো। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর এই কোয়ারির সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

শহীদ সিরাজ লেকের পাশে কোয়ারিতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি১৯৬০ সালে টেকেরঘাটে ৩২৭ একর জমিতে চুনাপাথরের সন্ধান পায় বাংলাদেশ রসায়ন শিল্প সংস্থা (বিসিআইসি)। ১৯৬৬ সালে মাইনিংয়ের মাধ্যমে এখান থেকে পাথর উত্তোলন করা হয়। পরে লোকসান দেখিয়ে কোয়ারিটি বন্ধ করে দেয় বিসিআইসি। এরপর দীর্ঘদিন ধরে পানি জমে এই জায়গা পরিণত হয় লেকে।

মেঘালয় পাহাড়, সবুজ বনানী, উঁচু-নিচু টিলা এখানকার সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। বর্ষাকালে লেকের পানি কিছুটা ঘোলাটে হলেও শীত মৌসুমে তা নীলাভ বর্ণ ধারণ করে। লেকের এই রূপ পর্যটকদের বিমোহিত করে।

শহীদ সিরাজ লেকগাঢ় নীল রঙের পানি থাকায় শহীদ সিরাজ হ্রদকে ‘নীলাদ্রি লেক’ নামে ডাকা হয়। এ নামেই এটি বেশি পরিচিত। লেকের পাশে কোয়ারিতে ব্যবহৃত কয়েক দশকের পুরনো লোহার যন্ত্রপাতি ও ন্যারোগেজ রেললাইন এখানকার সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। দেখে মনে হয় প্রাচীন কোনও নগরের পাশে নীলাভ জলের আভা!

সম্প্রতি এলাকাটির খুব কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে একটি শিমুল বাগান। এর ওপর দিয়েই বয়ে গেছে মোহনীয় যাদুকাটা নদী। লেক, পাহাড়, নদী আর হাওরের এই মিতালী পর্যটকদের মন ভরিয়ে দেয় দারুণ ভালোলাগায়! দিগন্তে মেশা সবুজ ধানের মাঠকে মনে হবে প্রকৃতির সাজানো মনোরম আঙিনা। 

শহীদ সিরাজ লেকশহীদ সিরাজের বীরত্ব
১৯৫২ সালে কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার ছিলনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সিরাজুল ইসলাম। মকতুল হোসেন ও গফুরুন্নেছা দম্পতির ছেলে। তার ছোট দুই বোন ছিল। ১৯৭১ সালে সিরাজ ছিলেন ঊনিশ বছরের টগবগে তরুণ। তখন পড়তেন কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজের বিএ প্রথম বর্ষে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে অস্ত্র হাতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। গ্রামের কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। ছেলের এমন সিদ্ধান্ত কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না সিরাজের বাবা-মা।

জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে একদিন বাড়ির সামনে দিয়ে ইটনা সদরের দিকে চলে যাওয়া পথে হাঁটা শুরু করেন সিরাজ। তার বাবা দৌড়ে এসে সেই সড়কে দাঁড়িয়ে ছেলের চলে যাওয়া দেখছিলেন। যতক্ষণ প্রিয় পুত্র সিরুকে দেখা যায় ততক্ষণ তিনি সেখানেই নিশ্চল দাঁড়িয়েছিলেন। পরে দৃষ্টিসীমায় সিরু মিলিয়ে যাওয়ার পর তিনি ধপ করে মাটিতে বসে পড়েন। হয়তো তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এটাই ছিল সিরাজকে তার শেষ দেখা। ১৯৭১ সালের আগস্টে সাচনা বাজার দখল করতে গিয়ে আরও সাত মুক্তিসেনার সঙ্গে প্রাণ হারান বীরযোদ্ধা সিরাজ।

শহীদ সিরাজ লেকে কয়েকজন ভ্রমণপ্রেমীযেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সড়কপথে সুনামগঞ্জ যাওয়া যায়। এরপর মোটরসাইকেল বা সিএনজিতে চড়ে (জনপ্রতি ১০০ টাকা) তাহিরপুর উপজেলা অথবা লাউড়েরগড় যেতে হয়। কেউ চাইলে পায়ে হেঁটে লাউড়েরগড় যেতে পারেন। সেখান থেকে হেঁটে এগোলেই যাদুকাটা নদী ও বারেক টিলা। এরপর মোটরসাইকেল ভাড়া করে সীমান্ত দিয়ে টেকেরঘাট, ভাড়া জনপ্রতি ৭০-৮০ টাকা। বর্ষায় তাহিরপুর থেকে নৌকায় যাওয়ার ভাড়া জনপ্রতি ৬০-৭০ টাকা। এজন্য সময় লাগবে দুই ঘণ্টা। শুষ্ক মৌসুমে জনপ্রতি ১০০ টাকা ভাড়ায় মোটরসাইকেলে চড়ে টেকেরঘাট যাওয়া যায়।

ছবি: লেখক

/জেএইচ/
টপ