ট্রাভেলগদারুচিনি দ্বীপের দেশে

Send
শান্তনু চৌধুরী
প্রকাশিত : ২২:৪৫, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৫১, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২০

সেন্টমার্টিন দ্বীপবছর শেষের ছুটি। যান্ত্রিক নগর ছেড়ে কয়েকদিনের জন্য প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন যাচ্ছি। সেই যাত্রাপথ আর দ্বীপের গল্প নিয়েই দারুচিনি দ্বীপের দেশে লেখাটা। আরামবাগ থেকে শুরু হলো টেকনাফের দিকে আমাদের যাত্রা। ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে টিকিট কাটা গেলেও মূলত টেকনাফ যেতে হলে আরামবাগ বা সায়দাবাদ আসা চাই। এসি ও নন-এসি বিভিন্ন ধরনের গাড়ি রয়েছে। ভাড়া ৯০০ থেকে ১৮০০ টাকা পর্যন্ত। আমরা বেছে নিলাম এসি বাস। রাত আটটায় গাড়ি ছাড়লো।

আধো ঘুম, আধো জাগরণের পর ১২ ঘণ্টার জার্নি শেষে নামলাম টেকনাফের দমদমিয়া এলাকায়। সেখানে টংঘরের দোকানে বসে সেরে নিলাম সকালের নাশতা। এখান থেকে কয়েকটি ঘাটের দিকে সেন্টমার্টিন যাওয়ার জাহাজগুলোর অবস্থান। আমরা কেয়ারি ক্রুজ অ্যান্ড ডাইনিংয়ের দ্বিতীয় তলার টিকিট নিলাম। ভাড়া পড়লো আসা-যাওয়া জনপ্রতি দেড় হাজার টাকা। তবে অঙ্কটা নির্দিষ্ট নয়। দরদাম করে কমানোর সুযোগ আছে। তাছাড়া এসি কেবিন না নিলে আরও কম ভাড়ায় যাওয়া যায়।

টিকিট কাটার পর নিতে হলো গেট পাস। পানির ওপর কাঠের তৈরি করিডোরের মতো প্রায় ২০০ মিটার লম্বা ব্রিজ। সেটি পেরিয়ে উঠলাম জাহাজে। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজ যেন স্বাগত জানালো। চারদিকে অপরূপ পরিবেশ। সবুজের সমারোহ। দূরে আরও জাহাজ চোখে পড়লো। একে একে লোকজনে ভরে উঠছে আমাদের জাহাজ। দ্বিতল জলযানটি ছাড়লো সকাল ৯টার কিছুক্ষণ পর। মন নেচে উঠলো।

টেকনাফে নদীর পাশে পাহাড়জাহাজ ছাড়ার পর সকালের রোদে নাফ নদী ধরে সেন্টমার্টিন যাত্রা ছিল বেশ উপভোগ্য। টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনের দূরত্ব প্রায় ৪২ কিলোমিটার। ২৫ কিলোমিটার নাফ নদী আর বাকি ১৭ কিলোমিটার খোলা সাগর। পথটুকু পাড়ি দিতে লাগে প্রায় আড়াই ঘণ্টা। মূলত এটি কোনও নদী নয়, বঙ্গোপসাগরের বর্ধিত অংশ। তবুও এর স্থায়ী পরিচয় নাফ নদী। এর পানি সাগরের মতোই লবণাক্ত। নদী মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে দু’ভাগ করেছে। পশ্চিম পাড়ে বাংলাদেশের টেকনাফ উপজেলা এবং পূর্ব পাড়ে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের আকিয়াব। ভেবেছিলাম শুধু জল দেখা হবে, টেকনাফে অনেক পাহাড়ও চোখে পড়লো। নদীর কোল ঘেঁষে আছে গাছের সারি, জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য আর নীল আকাশ। সব মিলিয়ে অপূর্ব।

জাহাজের পিছু পিছু খাবারের লোভে উড়ে আসছে গাঙচিল। একসময় জাহাজ পেরিয়ে গেলো শাহ পরীর দ্বীপের শেষ অংশ বদর মোকাম চর। সাগরের নীলাভ জল মন ভিজিয়ে দিলো। এত অপরূপ বাংলা! কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে নাফ নদী ও ওপারে মিয়ানমার সীমান্তের সৌন্দর্য দেখছে। সাগরের হাওয়ায় ভেসে যেতে লাগলো মন।

জাহাজের পিছু পিছু উড়ে বেড়ানো গাঙচিলএকসময় দেখলাম নাফ নদীর পাড় ঘেঁষে মিয়ানমারের সঙ্গে কাঁটাতারের সীমান্ত। সাগরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে জাহাজ। সাগর ও নদীর পানির ভিন্ন দুই রঙ, কী বিচিত্র লীলা! মাঝে মধ্যে আমরা জাহাজের ভেতরে ঢুকে খানিক বিশ্রাম নিয়েছি। সাগরের নীল জলে সাদা ফেনার খেলা। সাগর ও নাফ নদীর মোহনায় জেলে নৌকা দেখা যাচ্ছিল।

দীর্ঘ ক্লান্তিহীন ভ্রমণ শেষে নামলাম প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের ঘাটে। জাহাজ থেকে নামার পর আগে থেকে ভাড়া করা রিসোর্টে যাওয়ার জন্য টমটম নিলাম। ভাড়া পড়লো ১০০ টাকা। রিসোর্টের পাশেই সৈকত। দেখে মন জুড়িয়ে গেলো। বেরিয়ে পড়লাম ঘুরতে। অবশেষে দারুচিনি দ্বীপের দেশে!

সেন্টমার্টিন দ্বীপে প্রবাল পাথরপ্রায় ২৫০ বছর আগে আরব ব্যবসায়ীরা প্রথম এই দ্বীপে আসেন। তারা এর নাম দেন ‘জিঞ্জিরা’। পরবর্তী সময়ে পর্তুগিজ জলদস্যুরা দ্বীপটির নাম রাখে ‘সিনামন আইল্যান্ড’, বাংলায় দারুচিনি দ্বীপ। ব্রিটিশ শাসনামলে চট্টগ্রামের ডিসি মার্টিনের নামে এর নামকরণ হয় ‘সেন্টমার্টিন দ্বীপ’। এখানকার অধিবাসীদের আগমন ঘটে বহু বছর আগে। টেকনাফ থেকে কিছুসংখ্যক জেলে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে এসে দ্বীপটির সন্ধান পায়। এরপর তারা স্থায়ী বসতি গড়ে। শুরুতে সাতটি পরিবার ছিল বলে জানা যায়। পরে এসব পরিবারের সূত্রেই আসতে থাকে আরও লোক। বর্তমানে দ্বীপটিতে প্রায় সাত হাজার লোকের বসবাস।

সেন্টমার্টিন দ্বীপপুরো দ্বীপে নয়টি গ্রাম, একটাই ইউনিয়ন। পর্যটকদের নিরাপত্তা এখানকার মানুষের অগ্রাধিকার বিষয়। তাই যে কেউ অবাধে যেকোনও সময় ঘুরতে পারেন সাগরপাড়ে। জীবিকা বলতে মাছ ধরা, ধানচাষ, তরমুজ চাষ ও নারিকেল। নারিকেল গাছবেষ্টিত এ দ্বীপে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা বেড়াতে আসে। পর্যটকদের জন্য রয়েছে বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল হোটেল।

দ্বীপটি দেখলে মনপ্রাণ জুড়িয়ে যায়। প্রবাল পাথরের ওপর দিয়ে হাঁটার অনুভূতি অন্যরকম। দূরে জেলে নৌকার দেখা মেলে। দ্বীপের কয়েকটি জায়গা থেকে সাইকেল ভাড়া নেওয়া যায় ঘণ্টাপ্রতি ৬০-৮০ টাকায়। সাইকেল নিয়ে সৈকতে ঘোরা যাবে। বিকালে দ্বীপ ঘুরতে বের হই। হাঁটতেই ভালো লাগে বেশি। ঘুরতে ঘুরতে হুমায়ুন আহমেদের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি সমুদ্র বিলাসের সামনে গেলাম। প্রয়াত নন্দিত এই কথাসাহিত্যিক এটি গড়ে তুলেছিলেন।

সমুদ্র বিলাসঘুরতে ঘুরতেই বেলা গড়িয়ে গোধূলি। অনেকে বেলাশেষে সাগরপাড়ে নিজেকে দেখবেন বলে ভিড় করছেন। সূর্যাস্তের ক্ষণ ঘনিয়ে আসছে। আমরা দারুণ উচ্ছ্বাসে সূর্যাস্ত দেখছি। বলে রাখা ভালো, রাতে সৈকতে বসে সাগরের গর্জন শোনার মধ্যে আছে অন্যরকম আনন্দ।

/জেএইচ/
টপ