করোনাভাইরাস সংকটে বিশ্ব পর্যটনের খতিয়ান

Send
ড. সন্তোষ কুমার দেব
প্রকাশিত : ১০:০০, মে ২৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:০৮, মে ২৪, ২০২০

বিশ্ব পর্যটনবিশ্বের বৃহৎ শিল্পগুলোর মধ্যে পর্যটন অন্যতম। ২০০২ ও ২০০৪ সালে সার্স ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় পর্যটনে ধস নেমেছিল। এ কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জিডিপিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এর মধ্যে চীনে ২৫ শতাংশ, হংকংয়ে ৪১ শতাংশ ও সিঙ্গাপুরে ২৫ শতাংশ জিডিপি হ্রাস পেয়েছিল।

করোনাভাইরাস মহামারির প্রকোপে সারা পৃথিবীর পর্যটন শিল্প ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, কোভিড-১৯ সংকটে বিশ্ব পর্যটনে ক্ষতির মাত্রা সার্স ভাইরাসের সময়ের তুলনায় ১০ গুণ বেশি হতে পারে। জীবাণুটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার কারণে বিশ্ব পর্যটন মারাত্মক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। একইসঙ্গে এই শিল্প সংশ্লিষ্ট নানান শ্রেণিপেশার মানুষ পথে বসার দ্বারপ্রান্তে।

বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) তথ্যানুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই শিল্পের অবদান ৮ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০১৯ সালে পর্যটন শিল্প বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ২ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার অবদান রাখে, যা বিশ্ব জিডিপির ১০ দশমিক ৩ শতাংশ । পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করে ১৫৬ কোটি পর্যটক, অর্থাৎ প্রতি ৭ জনের একজন পর্যটক।

করোনার প্রভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে বিশ্ব পর্যটন শিল্প। আর পর্যটন শিল্প বিপর্যয়ের মুখে পড়ায় অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পতিত হচ্ছে গোটা পৃথিবী। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে ১১০ কোটি পর্যটক কমে যেতে পারে এবং ৯১০ বিলিয়ন ডলার থেকে ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার জিডিপি অবদান হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থার (ইউএনডব্লিউটিও) তথ্য মতে, এই শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত ১০-১২ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সারাবিশ্বে ৩৩ কোটি লোক পর্যটন শিল্পে কাজ করে। এক্ষেত্রে প্রতি ১০ জনে একজনের কর্মসংস্থান হয় এই খাতে। কিন্তু গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি ৪ জনে একজনের কর্মসংস্থান হয়েছে পর্যটনে।

আশা করা হয়েছিল, ২০২০ সালে বিশ্বে পর্যটকের সংখ্যা ৩-৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে ২০১৯ সালের তুলনায়। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রভাবে তাতে এখন উল্টো চিত্র। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চে ৬ কোটি ৭০ লাখ পর্যটক হ্রাস পেয়েছে, যা শতকরা ২২ শতাংশ এবং ৮০০ কোটি ডলার আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

করোনা পরিস্থিডুতে এশিয়া প্যাসিফিক দেশগুলোতে ৩৫ শতাংশ, ইউরোপে ১৯ শতাংশ, আমেরিকায় ১৫ শতাংশ, আফ্রিকায় ১৩ শতাংশ পর্যটকের আগমন হ্রাস পেয়েছে। কোভিড-১৯ রোগের প্রভাব যদি দীর্ঘায়িত হয় ২০২০ সালে সমগ্র বিশ্বে ৬০-৮০ শতাংশ পর্যটক হ্রাস পেতে পারে।

বিশ্ব পর্যটন সংস্থা জানাচ্ছে, গত ২০ মার্চ ৯৬ শতাংশ পর্যটন কেন্দ্রে পর্যটক আগমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কোভিড-১৯ প্রকোপ থেকে মুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে ৭ মে থেকে বিশ্বের শতভাগ পর্যটন গন্তব্যে বেড়ানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সমিতির (আইএটিএ) তথ্য অনুযায়ী, সারাবিশ্বে প্রায় ২০ লাখ ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এর সম্ভাব্য আর্থিক লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৩১৪ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে এশিয়া প্যাসিফিকে ১১৩ বিলিয়ন ডলার। এভিয়েশন খাতে ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে ৫৫ শতাংশ আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান জাানিয়েছে, ২০২০ সালে ইতালিতে পর্যটন খাতে ৯৫ শতাংশ এবং স্পেনে ৭৭ শতাংশ আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। করোনার প্রভাবে ২০২০ সালে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে ইন্দোনেশিয়ায় ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ , চীনে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ, ভিয়েতনামে ১০ শতাংশ, থাইল্যান্ডে ৯ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ, হংকংয়ে ৮ শতাংশ ও জাপানে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ আন্তর্জাতিক পর্যটক হ্রাস পেতে পারে।

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে একইরকম স্থবির চিত্র। দেশীয় অর্থনীতিতে পর্যটনের অবদান ৪ দশমিক ৪ শতাংশ, যার মুখ্য অংশ অভ্যন্তরীণ পর্যটন থেকে আসে। করোনার প্রভাবে বাংলাদেশের হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, ট্যুর অপারেটর, ট্রাভেল এজেন্সি, এয়ার ট্রাভেলসহ পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে। এ কারণে প্রায় ৯ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কা ও পর্যটন খাত সংশ্লিষ্ট ৩ লাখ ৯ হাজার মানুষের চাকরি ঝুঁকির মুখে। প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশন (পাটা) এসব তথ্য জানিয়েছে।

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) তথ্যানুযায়ী, করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশের ভ্রমণ ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে পর্যটন খাতকে পুনরায় উজ্জীবিত করতে বেশকিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। বড় অঙ্কের প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়ার পাশাপাশি সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।

পর্যটন সংশ্লিষ্ট পণ্যে স্বল্প সময়ের জন্য কর ও সম্পূরক শুল্ক মওকুফ করার পাশাপাশি সংকট ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যটন পুনরুদ্ধার কৌশল নির্ধারণ করা যেতে পারে। পর্যটনকে পুনরায় ব্র্যান্ডিং করতে নতুন মাত্রার ভার্চুয়াল ট্যুরিজমকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

করোনাভাইরাস পরবর্তী সময়ে পর্যটকদের আচরণগত পরিবর্তন নির্ধারণ করে তাদের প্রত্যাশিত গুণগতমানের সেবা নিশ্চিত করা চাই। পর্যটন শিল্পে চাহিদা ও যোগানের মধ্যে যে অসামঞ্জস্যতা আছে, গবেষণার মাধ্যমে তা খুঁজে বের করতে হবে। পর্যটকদের চাহিদা অনুযায়ী স্বাস্থ্যসম্মত সেবা প্রদান করে তাদের সন্তুষ্টি নিশ্চিত করতে পারলে আগামী দিনে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পর্যটন শিল্প বাঁচিয়ে রাখাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। এটি মোকাবিলা করার জন্য বিশ্ব পর্যটন সংস্থা নির্দেশিত দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পদক্ষেপের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কোভিড-১ সংকট থেকে উতরে উঠে অর্থনৈতিক মন্দা ও পর্যটন বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে নতুন আলোয় আলোকিত হবে পর্যটন শিল্প, একইসঙ্গে সমৃদ্ধির যাত্রায় এগিয়ে যাবে দেশ।

ড. সন্তোষ কুমার দেবলেখক: পর্যটন বিশেষজ্ঞ ও সহযোগী অধ্যাপক (ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)। ইমেইল: [email protected]

/জেএইচ/
টপ