স্বর্গরাজ্যে ঝরনা দর্শন

Send
শফিকুর রহমান শান্তনু
প্রকাশিত : ১৯:২৩, জুলাই ১২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৪৫, জুলাই ১২, ২০২০

বোরহিল ঝরনা থেকে বাংলাদেশের সীমান্তকেউ ঘোরাঘুরির কথা বললে সহসা না করতে পারি না। ছোট ভাই নাট্যকার সাজিন আহমেদ বাবুকে নিয়ে একরাতে উঠে পড়লাম সিলেটের বাসে। খুব ভোরে সিলেট পৌঁছে চলে এলাম ডাউকি পোর্টে।
২০-২৫ মিনিটের মধ্যেই দুই দেশের ইমিগ্রেশনে আনুষ্ঠানিকতা শেষের পর একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে ফেললাম। প্রথমে চেয়েছিলাম, একবারে তিন-চার দিনের জন্য গাড়ি নেবো। কিন্তু ইমিগ্রেশন অফিসের পাশে থাকা ট্যাক্সিচালকরা একজোট হয়ে আছে মনে হলো। একজন অন্যজনের চেয়ে ভাড়া বেশি চায়। তাছাড়া তাদের সুবিধামতো রুটের পরিকল্পনা জানাচ্ছে।
এ সময় পেছন থেকে দুই তরুণ ডাক দিলো। তারাও মেঘালয় ঘুরে দেখতে এসেছে। আমাদের মতোই তিন-চার দিনে ঘুরে দেখার ইচ্ছা তাদের। দু’জনই বুয়েট থেকে পাস করে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানিতে চাকরি করছে। একজনের নাম পঙ্কজ, অন্যজন প্রদীপ। পরিচয় পর্ব শেষে তারা প্রস্তাব দিলো, একসঙ্গে ঘোরা যায় কিনা। তাহলে খরচ কমে আসবে। আমি সাজিনের দিকে তাকালাম। ও চোখের ইশারায় জানালো, আমি যা ভালো মনে করি। তাদের সঙ্গে কথা বলে বেশ স্বতঃস্ফূর্ত মনে হয়েছে। তাই দেরি না করে প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলাম। একটু হেঁটে ডাউকি বাজার থেকে ট্যাক্সি নেওয়ার পরামর্শ দিলো তারা।
আমরা হাঁটা শুরু করতেই ট্যাক্সিচালকদের একটু টনক নড়লো। কয়েকজন আমাদের কাছে এগিয়ে এলো। দামে বনে যাওয়ায় একজনকে ঠিক করে নিলাম সেদিনের জন্য। সে আমাদের চারটি স্পট দেখিয়ে স্নোনেংপেডেং ভিলেজে নামিয়ে দেবে বিকালে।
গাড়িতে উঠে বসলাম। ডাউকি বাজার থেকে ডলারকে রুপিতে বদলে সিম কিনে বোরহিল ঝরনা দেখতে চলে গেলাম। ততক্ষণে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। প্রথমে ভেবেছিলাম, বৃষ্টি একটু কমলে গাড়ি থেকে নামবো। কিন্তু বৃষ্টির গতি ক্রমে বাড়ছে। আমাকে বাসা থেকে বলে দেওয়া হয়েছে বৃষ্টিতে না ভেজার জন্য। একটু ভিজলেই আমার জ্বর আসে। হাসির মতো বৃষ্টিতে ভেজাও যে সংক্রামক তা জানা ছিল না! বৃষ্টির স্বর্গীয় রূপ দেখে লোভ সামলাতে না পেরে রেইনকোট পরে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম। আমার দেখাদেখি অন্যরাও নামলো। ভরপুর বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই বৃষ্টি কমে এলো।
ক্রাং সুরি ঝরনাগাড়ি ঘুরিয়ে এলাম উমক্রেম ঝরনায়। এখানে নেমে কয়েকটা ছবি তুলে আমরা রওনা দিলাম ক্রাং সুরি ঝরনার দিকে। যেতে যেতে পথের দু’পাশ দেখে মুগ্ধ না হওয়ার কোনও উপায় নেই! ক্রাং সুরি ঝরনা পৌঁছাতেই দুপুর। গত রাতের ভ্রমণের ধকল এবং আজকের ঘোরাফেরার ক্লান্তিতে খিদেয় পেট চো-চো করছে। এক ধাবায় গিয়ে খাবার অর্ডার করে জানতে চাইলাম, কতক্ষণ লাগবে?

খাসিয়া তরুণী গালে টোল পড়া হাসি দিয়ে বললো, ‘১০ মিনিট!’

১৫ মিনিট পরে আবারও জিজ্ঞেস করা হলো, আর কতক্ষণ?
আবারও খাসিয়া তরুণী হাসিতে টোল ফেলে উত্তর দিলো, ‘১০ মিনিট!’
সময়মতো খাবার না পেয়ে মেজাজ তিরিক্ষি। সাজিন বলল, ‘ভাই, একটা ব্যাপার খেয়াল করেছেন? এরা এককথার মানুষ! ১৫ মিনিট আগেও বলছে ১০ মিনিট। এখনও বলছে তাই। কথার নড়চড় নাই। এটা কিন্তু ইতিবাচক!’

অবশেষে শেষ হলো কাঙ্ক্ষিত ১০ মিনিট! দুটো চিকেন থালি ও দুটো ফিস থালি অর্ডার করা হয়েছিল। ভাত পেটচুক্তি। কেউ কারও দিকে না তাকিয়ে দ্রুত খাওয়া সেরে নিলাম। ভালো খাওয়ার পরে পান-মসলা হলে মন্দ হয় না! তাই একেকজন একেকটা স্থানীয় পান-মসলার প্যাকেট ছিড়ে খেতে নিতেই বাঁধলো বিপত্তি। একে তো ঝালে জিভ পুড়ে যাচ্ছিল, তার ওপর একেক প্যাকেটের দাম শুনে ভ্রু কপালে ওঠার দশা। আমরা জানালাম, এত দাম দিয়ে নেবো না!
খাসিয়া তরুণীর মা এবার এন্ট্রি নিলো, ‘প্যাকেট ছিড়েছো! না নিয়ে যাবে কই!’
আমরা কথা না বাড়িয়ে ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি খেয়েছো?
ড্রাইভার বললো, ‘পরে খাবো। তোমরা ঝরনা দেখে আসো।’

আমরা ট্যাক্সিচালকের হাতে পান-মসলার প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে ক্রাংসুরি ঝরনা দেখতে গেলাম। পার্কিং এরিয়ায় গাড়ি থেকে নেমে প্রায় ৪০০ মিটারের মতো নিচে গেলে উপভোগ করা যায় অপরূপ ঝরনার নীল জল। পেট পুরে খাওয়ার কারণে সবারই একটু তন্দ্রার মতো লাগছিল। মনে হচ্ছিল, ঝরনার পাশে একটু ঘুমিয়ে নিলে বেশ হতো। এখানে জিপ লাইনিংয়ের ব্যবস্থা আছে। সাজিন ও পঙ্কহের ইচ্ছা থাকলেও লম্বা সিরিয়ালের কারণে তা পারলো না। কীভাবে ঘণ্টাখানেক সময় পেরিয়ে গেলো বুঝে ওঠার আগেই যাওয়ার তাড়া। বৃষ্টির পূর্বাভাস পাচ্ছি। দেরি না করে গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। আমাদের এবারের গন্তব্য স্নোনেংপেডেং। পথে ট্যাক্সিচালকের সঙ্গে আমরা আলাপ জমিয়ে ফেললাম। সে কথা দিলো, কালও আমাদের সঙ্গে ডিউটি দেবে।

স্নোনেংপেডেং গ্রামে উমগট নদীর ঝুলন্ত ব্রিজে লেখককাকচক্ষু নদীর গ্রাম স্নোনেংপেডেং

যে নদীটি স্বপ্নে দেখেছি, সেটা চোখের সামনে দেখলে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। সারারাত জার্নি করে ঢাকা থেকে তামাবিল বন্দর হয়ে পরদিন সারাদিন ঘোরাঘুরি করে আমরা যখন উমগট নদীর পাড়ে এসে পৌঁছালাম তখন শেষ বিকাল। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। থাকার কোনও জায়গা বুকিং দেওয়া ছিল না। ভেবেছিলাম, পেয়ে যাবো। কিন্তু এসে দেখি জায়গা নেই। আমাদের ট্যাক্সিচালক বললো, ‘তোমরা ঠ্যালা সামলাও। আমাকে বিদায় করো।’

মানুষ চোখে সর্ষে ফুল দেখে। আমরা দেখছিলাম সূর্যমুখী, রক্তজবাসহ রঙিন ফুলের সাদাকালো সংস্করণ! তবে মুখে কেউই স্বীকার করিনি। ভাবটা এমন, এই ঝিঁঝিঁ ডাকা গ্রামে উঁচু পাথরের ঢিবিতে হেলান দিয়ে দিব্যি রাত কাটিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু কথায় আছে– যদি থাকে নসিবে, আপনাআপনি আসিবে। আমাদের কাছে দারুণ একটি কাঠের বাংলো ধরনের হোম স্টে’র অফার নিয়ে এলো মন মোহো। খাসিয়া তরুণ। আজ রাতের মতো এখানেই আমরা থাকবো বলে ঠিক করলাম। ট্যাক্সিচালক কাল ভোরে আসবে বলে বিদায় নিলো।
বোরহিল ঝরনাবাংলোর ঘরের জানালা খুললে পাহাড়ঘেঁষা উমগট নদী দেখা যায়। আমরা ফ্রেশ হয়ে চারপাশ ঘুরে দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। রাতের বেলা পাহাড়ঘেরা নির্জন নদীটাকে কেমন রূপকথার গল্পের মতো মনে হচ্ছিল। একটা ভুতুড়ে পরিবেশ। অন্য কোনও জগতে এসে পড়েছি যেন! ঝুলন্ত ব্রিজ বেয়ে দুব্র এদিক-ওদিক করতেই খিদে পেয়ে গেলো। একটা রেস্তোরাঁয় গিয়ে আরাম করে বসতেই ওরা জানালো, খাবার নাই!

কেন নাই? এখনও তো রাত ৯টাও বাজেনি।

ওরা জানালো, এখানে রাতে খেতে হলে আগে থেকে অর্ডার দিয়ে রাখতে হয়। সেই হিসেবে রান্না হয়। আমরা আগে অর্ডার দেইনি বলে খাবার পাবো না! মানুষের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। আমাদের মাথায় হাতুড়ি পড়লো! সারারাত কি তাহলে না খেয়ে থাকতে হবে? এক দোকান থেকে কলা-বিস্কুট খেয়ে মেজাজ ঠান্ডা করলাম। এখন খিদে মেটাবো কীভাবে ভাবতেই বাংলোর মালিকের কথা মনে পড়লো। তাকে ফোন করে এখনই আসতে বললাম। খুব জরুরি।
সে ছুটে এলো একটু পরে। তাকে বললাম, আমাদের রাতের খাবার চাই। ভাত আর নদীর মাছ খাবো।
সে হেসে বললো, ‘এখন সম্ভব না!’

আমরা টেবিলে বাড়ি মেরে বললাম, আমরা তোমার বাংলো ভাড়া নিয়েছি। তোমার মেহমান। আমাদের ভালোমন্দ দেখার দায়িত্ব তোমার না? আজ রাতে না খেয়ে আমাদের কেউ যদি মারা যায়, সেই দায় কে নেবে?
সাজিন বলল, ‘তার ওপর আমরা তিনজন বিয়েও করিনি! তুমি বুঝতে পারছো, ব্যাপারটা কতটা অমানবিক হবে?’
আমাদের কথায় বাংলোর মালিকের মনে হয় এবার একটু মন গললো। সে বললো, ‘ব্যবস্থা হবে। তবে সময় লাগবে দুই ঘণ্টা।’

কেন? নদী থেকে মাছ ধরে রান্না করতে হবে?
বাংলো মালিক হেসে চলে গেলো। আমরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুই ঘণ্টা কখন শেষ হবে সেই চিন্তায় পড়ে গেলাম। রাতের খাবারটা দেরিতে হলেও খুব তৃপ্তি নিয়ে খেতে পেরেছি। ভাত, নদীর তাজা মাছের সঙ্গে আলু ভাজা আর ডাল। প্রতিটি আইটেম যেন অমৃত। রান্না করেছে বাংলো মালিকের মেয়ে। সাজিনকে বললাম– ভাই, এই অঞ্চলে বিয়ে করে ফেলো।

উমক্রেম ঝরনামোরগের ডাকে সকাল আসে– এমন লাইন গল্প উপন্যাসে অনেক পড়েছি। কিন্তু বাস্তবে এমন স্নিগ্ধ সকাল আর দেখিনি! আহা! পরদিন ঠিক এভাবেই ঘুম ভাঙলো। মাথার পাশের জানালাটা খুলে দিয়ে মনে হলো, এখানে এভাবে টানা কয়েক বছর কাটিয়ে দিলেও ক্লান্তি আসবে না। রোদ ঝলমলে মন ভালো করা সকালটা এলোমেলো করে দিলো ট্যাক্সিচালক। সে এলো না। আমরা কয়েকবার তার নম্বরে ফোন দিলাম। ধরলো না! এখন কী করা!
গ্রামে কয়েকটি গাড়ি পেলেও চালকরা আকাশচুম্বি ভাড়া চাইলো। অবশেষে ঠিক হলো, আমরা একটা গাড়ি নিয়ে আপাতত ডাউকি বাজারে যাবো। ওখান থেকে আরেকটা গাড়ি ভাড়া করে দ্বিতীয় দিনের পরিকল্পনামাফিক যাত্রা শুরু করবো।

আমাদের আজকের লক্ষ্য ডাউকি থেকে চেরাপুঞ্জি যাওয়া। পথে মাওলিনং গ্রাম, নোহওয়েট লিভিং রুট ব্রিজ, সেভেন সিস্টার্স ঝরনা দেখবো।

মেঘালয়ের মাওলিনং গ্রাম
মাওলিনং গ্রামে থাইলং নদীর ওপরে এই লিভিং রুট ব্রিজ। গ্রামটির আলাদা খ্যাতি আছে। এটি এশিয়ার পরিচ্ছন্নতম গ্রাম হিসেবে সুপরিচিত। এখানে ফাইকাস ইলাস্টিকা নামে বিশেষ প্রজাতির রাবার গাছ দেখা যায়। এসব রাবার গাছের বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে মূল শেকড় থেকে বের হওয়া শাখা-প্রশাখা মাটির ওপরে উঠে আসে এবং ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। আদিবাসীরা ফাইকাস ইলাস্টিকা বৃক্ষের এই বৈশিষ্ট্যকে পুঁজি করে একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় তৈরি করে এসব জীবন্ত সেতু। নদীর দু’প্রান্তের দুটি গাছের সেতুকে পরস্পরের দিকে জুড়ে দেওয়া হয়। এটি প্রায় ১৫ বছর ধরে চলতে থাকা একটি বিশেষ প্রক্রিয়া। কংক্রিটের আধুনিক সময়ে এসেও এই সেতুগুলো বয়সের সঙ্গে আরও বেশি টেকসই এবং মজবুত হতে থাকে। গোটা প্রক্রিয়ায় ছোটবড় নানান জীবন্ত শেকড়ের বন্ধনে এটি আশ্চর্য রকমের সেতু। প্রকৃতির চলনকে স্বাভাবিক রেখেই মানুষ নিজের প্রয়োজনে তাকে ব্যবহার করে গেছে। সেদিন একজন বলেছিল, অপব্যবহার কী তা তো হরহামেশাই দেখতে পাই। কিন্তু সদ্ব্যবহার কী? এই লিভিং রুট ব্রিজ হতে পারে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

সেভেন সিস্টার্স ঝরনাগ্রামে দুপুরের খাবার সেরে আমরা রওনা হলাম চেরাপুঞ্জির পথে। আমরা চেয়েছিলাম, নোহকালিকাই ঝরনা দেখে যেতে। কিন্তু ড্রাইভার বললো, এখন সেখানে কুয়াশা থাকবে। তার চেয়ে কাল ভোরে গেলে ভালো দেখা যাবে। ড্রাইভার ওদিকে যেতে চাইছে না বুঝে সেভেন সিস্টার্স ঝরনার উদ্দেশে গেলাম। চারপাশে উঁচু-উঁচু সবুজ পাহাড়। সেগুলোর মাথায় উড়ছে সাদা মেঘ। যেন ইচ্ছে হলেই সেই মেঘ ধরা যাবে! পাহাড়ের চূড়ায় মজমাইনং থাইমা ইকো-পার্ক মূলত সেভেন সিস্টার্স ঝরনারই পাহাড়। পাহাড়ের মাঝ দিয়েই সেভেন সিস্টার্স ঝরনার পানি গড়িয়ে নিচে পড়ছে। সেজন্য এই ঝরনা দেখতে হয় অন্য পাহাড় থেকে। তবে পার্কের কোণে দাঁড়িয়ে আশেপাশের পাহাড়, পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা তুলোর মতো সাদা মেঘ আর নিচে দুই পাহাড়ের মাঝের ভাঁজ দেখার অনুভূতি অন্যরকম। দেখতে দেখতে কখন যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে টেরই পাইনি। ড্রাইভার আমাদের চেরাপুঞ্জি শহর এলাকায় নামিয়ে দিয়ে চলে যাবে।

সেই কৈশোরে বইতে পড়েছিলাম, পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের এলাকা চেরাপুঞ্জি। পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে গাড়ি ওপরের দিকে উঠেই চলেছে। চেরাপুঞ্জি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পূর্ব খাসি পাহাড় জেলার একটি শহর। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪ হাজার ৮৬৯ ফুট উঁচু। কিছুদূর যাওয়ার পর একটু শীত-শীত করতে লাগলো। রাতের অন্ধকার গাঢ় হওয়ার আগেই আমরা পৌঁছে গেলাম ছিমছাম শহরটাতে। প্রথম দেখায় প্রেমে পড়া বলতে একটা কথা আছে। চেরাপুঞ্জি প্রথম দেখেই আমার তেমন মনে হলো। এখানে বেশিরভাগ বাড়িতেই ‘হোম স্টে’র ব্যবস্থা রয়েছে। দুটি বাড়ি দেখে আমরা একটি খাসিয়া বাড়িতে থাকার বন্দোবস্ত করে ফেললাম। হোটেলে থাকার চেয়ে এটাই আমাদের কাছে বেশি আরামদায়ক মনে হয়েছে। চেরাপুঞ্জিকে বাংলায় বলা যায় কমলা দ্বীপ, এর নামের অর্থ অনুসরণ করেই। কমলা ছাড়া এখানে আরও আছে প্রচুর পান-সুপারির গাছ। বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে চেরাপুঞ্জি সোজাসুজি কুড়ি কিলোমিটারেরও কম। অথচ রাতের নির্জন রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, রূপকথার এক স্বর্গরাজ্যে হারিয়ে গেছি।
পরদিনের জন্য গাড়ি ঠিক করে ফেললাম। এখানে বেশিরভাগ রেস্তোরাাঁয় শুকর রান্না হয় বলে আমাদের দলের লোকজন কেউ ভাত খেতে চাইলো না। স্থানীয় বাজার থেকে কলা, গাজর, কেক কিনে আনা হলো রাতের খাবারের জন্য। আমি একটা চিকেন মোমো খেয়ে আরেকটা অর্ডার দিলাম।

পরদিন ভোরের আলো ফুটতেই আমাদের গাড়ি প্রস্তুত। গত দুই দিনের ড্রাইভারদের চেয়ে এই ড্রাইভারকে আমাদের বেশ পছন্দ হয়ে গেলো। তার নাম ববি। সে আজ আমাদের নুকায়কালী ফলস, উই সাডং, ডাইন্থলেন ফলস, এলিফেন্ট ফলস দেখিয়ে শিলং পুলিশ বাজারে নামিয়ে দেবে, এমনটা ঠিক হলো।

নোহকালিকাই ঝরনাশিলং-চেরাপুঞ্জির অন্যতম দর্শনীয় স্থান হলো নোহকালিকাই ঝরনা। এর উচ্চতা ১ হাজার ১৭০ ফুট। এটি ভারতের বৃহত্তম ঝরনাগুলোর অন্যতম। খাঁড়া পাহাড় থেকে সোজাসুজি পড়ছে ঝরনার পানি। তাই পানি পড়ার স্থানটি দেখতে নীল রঙের পুকুরের মতো।

এলিফ্যান্ট ফলস বা হাতি ঝরনা। এই ঝরনার পানি প্রবাহিত হয় তিনটি স্তরে। দূর থেকে দেখতে অনেকটা হাতির শুঁড়ের মতো বাঁকানো মনে হয়। সেজন্যই হয়তো এর নাম এলিফ্যান্ট ফলস। এই ঝরনার নাম এত শুনেছি, কিন্তু দেখার পরে আমাদের কাছে একেবারেই ভালো লাগেনি! ব্যাপারটা অনেকটা কাচ্চি বিরিয়ানি দেখিয়ে শুকনা ভাত খাওয়ানোর মতো। অন্য ঝরনাগুলো এত নৈসর্গিক যে, এটি সেগুলোর ধারেকাছেও নেই!

এলিফ্যান্ট ফলসশিলং পুলিশ বাজারে পৌঁছাতে দুপুর হলো। উত্তরপূর্ব ভারতীয় রাজ্য মেঘালয়ের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর শিলং। একসময় এটি ‘প্রাচ্যের স্কটল্যান্ড’ নামে পরিচিত ছিল। ১৮৯৭ সালে ভূমিকম্পে শহরটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এরপর এটি পুনরায় গড়ে তোলা হয়। ভারতের স্বাধীনতার আগে ব্রিটিশ পরিবারদের জন্য এটি একটি জনপ্রিয় পাহাড়ি বিনোদন কেন্দ্র ছিল। এখানে এখনও প্রচুর ব্রিটিশ ধাঁচে নির্মিত কান্ট্রি হাউস দেখতে পাওয়া যায়। প্রায় ৬ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত শিলংয়ের আশেপাশে দর্শনীয় অনেক জায়গা রয়েছে।
আমাদের আজকেই শেষ রাত। কাল সকালে দেশে ফিরবো। তাই ঠিক করা হলো, কোথাও ঘুরতে না গিয়ে পরিবারের জন্য কেনাকাটা করা হবে। আমরা যা দেখেছি তাতে আমাদের পয়সা উসুল। কিন্তু পরিবারের মানুষগুলো তো এই অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে পেলো না! তাই তাদের জন্য কিছু কেনা কর্তব্য। এখানে একদম গুলিস্তানের মতো রাস্তার ওপর জামা-কাপড় থেকে শুরু করে কাঁচাবাজার সবই বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু পরিবেশটা মেলার মতো।
কিনতে কিনতে খিদে পেলে দাঁড়িয়ে একটু মাংস ভাজা খেয়ে নেওয়া যায়। রাতে যখন হোটেলে ফিরলাম, আক্ষরিক অর্থে আমরা ফকির। ভাগ্যিস, হোটেল বিল পরিশোধ করা ছিল। পরদিন ভোরে ডাউকি বর্ডার পৌঁছাতে যে গাড়ি ভাড়া করলাম, তার চালককে আগে লাইটলুম গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন দেখিয়ে নেওয়ার জন্য বলা হলো। আকাশ আর মাটি যেন এক জায়গায় এসে মিশেছে ভোরের কুয়াশা ঢাকা লাইটলুম গ্রামে।

লাইটলুম গ্র্যান্ড ক্যানিয়নফিরতি পথে মনটা বারবার উদাস হয়ে যাচ্ছিল। প্রকৃতি বারবার আমাদের শ্রেণি-বৈষম্যহীন ভালোবাসার চাদরে গ্রহণ করে আর আমরা আমাদের প্রয়োজনে সভ্যতা বিকাশের নামে প্রকৃতিকে নষ্ট করে চলেছি। একবারও কি ভাবছি, এর ফল কতটা ভয়াবহ?

প্রয়োজনীয় তথ্য ও যেভাবে যাওয়া
শিলং যেতে চাইলে ভিসার আবেদনে ডাউকি বর্ডার উল্লেখ করতে হবে। যাওয়ার আগে সোনালী ব্যাংকে ৫০০ টাকা ভ্রমণ কর দিয়ে নিন। পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, প্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র, এনওসি লেটারসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের একাধিক ফটোকপি সঙ্গে রাখুন। কারণ তামাবিল সীমান্তে কর্তৃপক্ষ কাগজপত্র দেখতে চাইবে। এছাড়া হোটেল ভাড়াসহ বিভিন্ন কাজেও লাগতে পারে। দেশ থেকে যাওয়ার সময় টাকা বা ভারতীয় রুপি না নিয়ে ডলার নিন।

ঢাকা থেকে এসি বা নন-এসি বাসে চড়ে সিলেট যাওয়া যায়। সিলেট শহরের কদমতলী থেকে সিএনজি কিংবা প্রাইভেট কারে তামাবিল যেতে সময় লাগবে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। ইমিগ্রেশন পার হয়ে শেয়ারে ও রিজার্ভ ট্যাক্সি অথবা গাড়ি পাওয়া যায়। প্রতিদিন ভাড়া ২২০০ থেকে ২৮০০ রুপি।
শিলং-চেরাপুঞ্জির বেশিরভাগ দর্শনীয় স্থানে প্রবেশমূল্য দিতে হবে ১০-২০ রুপি। এছাড়া স্টিল ক্যামেরা নিয়ে প্রবেশ করলে তার জন্যও দিতে হবে ২০-৫০ রুপি।

থাকার জন্য পর্যাপ্ত হোটেল, গেস্ট হাউস বা কটেজ আছে। রুম ভাড়া ১০০০ রুপি থেকে বিভিন্ন দামের।
ক্রাং সুরি ঝরনা দেখতে যাওয়ার পথে লেখকলেখক: নাট্যকার



/জেএইচ/
টপ