পাহাড়ি কন্যা বান্দরবানে পর্যটন কেন্দ্রগুলো একসময় ভ্রমণপ্রেমীদের সমাগমে মুখর থাকলেও দুই-তিন বছর ধরে সেই সংখ্যা কমে এসেছে। এ কারণে পর্যটন সংশ্লিষ্ট নতুন-পুরনো হোটেল-মোটেল ও কটেজগুলো প্রায়ই খালি পড়ে থাকে। তাই কর্মচারী ছাটাই করতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকরা। পর্যটকবাহী গাড়ির চালক ও হেলপাররা বেতন পাচ্ছেন না নিয়মিত।
বান্দরবানে মেঘলা, নীলাচল, নীলগিরি, চিম্বুক, নাফাখুম, শৈলপ্রপাতসহ নানান পর্যটন স্পট রয়েছে। এসব দেখতে ঈদের ছুটি ও শীত মৌসুমে ভ্রমণপ্রেমীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তখন জেলার হোটেল-মোটেল এমনকি পাহাড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কটেজগুলোতে কোনও রুম ফাঁকা থাকতো না। পর্যটকদের যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত চাঁদের গাড়ি খালি পাওয়া মুশকিল হয়ে যেতো।
বান্দরবান মাইক্রোবাস চালক সমিতির সভাপতি মো. হারুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতিবছর বিভিন্ন ছুটির দিন ছাড়াও ঈদের টানা ছুটিতে পর্যটকদের ভিড় দেখা যেতো। কিন্তু কয়েক বছর ধরে তা কমে গেছে। গত ঈদের ছুটিতে আশানুরূপ ভ্রমণপ্রেমীর দেখা মেলেনি। এ কারণে পর্যটকবাহী গাড়ির চালক ও হেলপারদের বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছেন মালিকরা।’
পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্যময় বেড়ানো ও থাকার জায়গার সুবিধার্থে বান্দরবানে হোটেল হিলটন, হিলভিউ, রিভার ভিউ, হিল কুইন, বন নিবাস, সাইরুসহ নতুন নতুন হোটেল-মোটেল ও কটেজ তৈরি হয়েছে। যাতায়াতের জন্য নতুন চাঁদের গাড়ি যোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া নীল দিগন্ত, চিম্বুক, প্রান্তিক লেকসহ বেশকিছু পর্যটন কেন্দ্রের আধুনিকায়ন করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, পুরনো পর্যটন নীলাচলে ১৬ জন, মেঘলায় ১৬ জন ও নতুন স্পট চিম্বুকে তিন জন, প্রান্তিক লেকে দুই জন ও নীল দিগন্তে একজনের কর্মসংস্থান হয়েছে। পর্যটন খাতের সুবাদে জেলার আরও অনেকে চাকরির আশায় দিন গোনেন। তবে পর্যটক সমাগম না বাড়লে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়বে না।
ভ্রমণপ্রেমীদের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণকে দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এগুলো হলো– নির্বাচনের আগে সারাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পাহাড় ধসে প্রাণহানি, পাহাড়ে অপহরণ ও হত্যা, পাহাড়ি ঝিরিতে পর্যটকের মৃত্যু। এসব ঘটনা পর্যটকদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে বলে ধারণা করা হয়।
বান্দরবান হোটেল মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সিরাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জেলায় আগের মতো পর্যটক আসে না। এ কারণে হোটেল কর্মচারীদের বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছেন আমার মতো ব্যবসায়ীরা। অনেক হোটেল কর্তৃপক্ষ কর্মচারী ছাটাই করতে বাধ্য হচ্ছে।’
বান্দরবানের পর্যটন স্পটগুলোতে ভ্রমণপ্রেমীদের আসার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে প্রচারণা চালানোর প্রয়োজনীয়তা দেখছেন এই ব্যবসায়ী। এছাড়া পাহাড়ি ঝিরি ও ঝরনাগুলোতে নিরাপত্তাবেষ্টনী দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
যদিও জেলা প্রশাসন মনে করে, পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনের রাজনৈতিক দাঙ্গা দুর্গম এলাকায় হয়ে থাকে। এসব অস্থিরতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের নেতিবাচক প্রভাব পর্যটন খাতে পড়েনি। আগের মতোই নিরাপদে মেঘলা, নীলাচল, নীলগিরি, শৈলপ্রপাতসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পটে বেড়ানোর পরিবেশ রয়েছে বলে অভিমত তাদের।
বান্দরবান পুলিশ সুপার মো. জাকির হোসেন মজুমদারের দাবি, জেলার পর্যটন স্পটগুলোতে নিরাপত্তাজনিত কোনও সমস্যা নেই। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বর্ষায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পর্যটন স্পটগুলোতে ভ্রমণপ্রেমীদের কোনও সমস্যা হয় না। এছাড়া পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের আনাগোনার ভয় নেই। তারপরও এসব স্থানে পুলিশের সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকছে। পর্যটকরা যেকোনও সময় এসব পর্যটন স্পটে নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে বেড়াতে পারে।’








