প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আতিয়া মহলে কমান্ডো অভিযান

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
২৮ মার্চ ২০১৭, ২১:৫১আপডেট : ২৮ মার্চ ২০১৭, ২২:৩৪

সিলেট মহানগরের শিববাড়ির ‘জঙ্গি আস্তানা’ আতিয়া মহলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে কমান্ডোরা অভিযান চালায়, বলে জানিয়েছেন বিগ্রেডিয়ার জেনারেল ফখরুল আহসান। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সিলেটের জালালাবাদ সেনানিবাসে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা জানান।

সেনাবাহিনীর প্রেস ব্রিফিং বিগ্রেডিয়ার জেনারেল ফখরুল আহসান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুনির্দিষ্ট দিক-নির্দেশনার আলোকে সেনাবাহিনী অপারেশন পরিকল্পনা করে। অপারেশনে মূলত দু’টি বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়। প্রথমত ভবনের বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া ও জঙ্গিদের নির্মূল করা।’

অভিযানে সেনাবাহিনীর মুখপাত্র থাকা এই বিগ্রেডিয়ার জেনারেল সংবাদ সম্মেলনে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে চালানো অভিযান অপারেশন টোয়াইলাইট সমাপ্তও ঘোষণা করেন। এসময় তিনি অপারেশনের বিভিন্ন দিক বিস্তারিতভাবে সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন।

তিনি জানান, গত ২৪ মার্চ রাত দেড়টার দিকে পুলিশ সদস্যরা সিলেটের শিববাড়ির পাঠানপাড়া সড়কের পাশের আতিয়া মহলটি ঘিরে ফেলে। রাত সাড়ে ৪টার দিকে তারা নিশ্চিত হন আতিয়া মহলের নিচতলায় জঙ্গিরা অবস্থান করছে। পুলিশ সদস্যরা তখন আতিয়া মহলের নিচতলার ছয়টি কক্ষ বাইরে থেকে বন্ধ করে দেয় এবং ভবনের মূল প্রবেশ পথের কলাপসিবল গেইটে তালা লাগিয়ে বাড়িটি ঘিরে ফেলে। এসময় পুলিশ বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে জঙ্গিরা তাদের লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুঁড়ে মারে। তখন জঙ্গিদের দক্ষতা ও আটাশটি পরিবারের নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনা করে বিশেষায়িত বাহিনী সোয়াতের সহায়তা কামনা করে সিলেট পুলিশ।
এর মধ্যে জঙ্গিরা তাদের ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে বের হয়ে ভবনের মূল ফটকে বিশাল আকৃতির বিস্ফোরক স্থাপন করে। এমনকি একটি ফ্রিজ ও মোটরসাইকেলে বিস্ফোরক লাগিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এছাড়া ভবনের বিভিন্ন জায়গায় বিস্ফোরক স্থাপন করে পুরো ভবনটিকে অতিমাত্রায় বিপদজনক করে ফেলে, বলেও জানান তিনি।

২৪ মার্চ বিকাল চারটার দিকে ঢাকা থেকে সোয়াতের সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘সোয়াতের সদস্যরা তাদের পর্যবেক্ষণ পরিকল্পনা ও বিচার বিশ্লেষণ শেষে বাসিন্দাদের নিরাপত্তা, বিস্ফোরক ঝুঁকি ইত্যাদি বিবেচনা করে সেনাবাহিনীর সহায়তা কামনা করেন। পুলিশ প্রশাসনের অনুরোধে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে সেনাবাহিনী অপারেশনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করে। ১৭ পদাতিক ডিভিশন ও বিশেষায়িত কমান্ডো দল পরদিন অভিযান শুরু করে। একই সময়ে ঢাকা থেকে বিশেষায়িত একটি দলকে হেলিকপ্টারে সিলেটে আনা হয়।’
অভিযানের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘অপারেশনের প্রথম পর্বটি ছিল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। কমান্ডোরা তাদের জীবন বাজি রেখে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে অভিনব কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে ২৫ মার্চ আনুমানিক দুপুর একটার মধ্যে ভবন থেকে ৩০জন পুরুষ, ২৭ জন মহিলা ও ২১জন শিশুসহ মোট ৭৮জনকে নিরাপদে উদ্ধার করে। এ সময়ের বৈরি আবহাওয়া অপারেশন সফলভাবে শেষ করার জন্য নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। পুরো ভবনের পাঁচতলা থেকে দোতলা পর্যন্ত উদ্ধার কাজ অত্যন্ত সন্তর্পণে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। নিচতলার উদ্ধার অভিযান ছিল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। কমান্ডো সদস্যরা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অভিনব পন্থা অবলম্বন করে সব বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে আনে।’
এরপর অভিযান দল তাদের দ্বিতীয় পর্বের তথা জঙ্গিদের নির্মূলে কাজ শুরু করে জানিয়ে ফখরুল আহসান বলেন, ‘এ পর্বে সেনাবাহিনীর কমান্ডোদের পাশাপাশি স্নাইপার দল এপিপিসহ বিশেষায়িত অনেক সদস্য নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেন। তিন দিন একটানা বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে ২৭ মার্চ বিকেলের মধ্যে চারজন জঙ্গিকে নির্মূল করা হয়। মূলত গতকালই অভিযান শেষ হয়। তবে আরও বিশদ তল্লাশি ও নিশ্চিত হওয়ার জন্য আজকের দিনটি ব্যবহার করা হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, গতকাল দু’টি মৃতদেহ বের করে পুলিশ প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বাকি যে দুটি মৃতদেহ ছিল সেগুলো সুইসাইডাল ভেস্টসহ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। নিরাপত্তা বিবেচনায় ও পুলিশ প্রশাসনের পরামর্শে ঘটনাস্থলেই এগুলো হস্তান্তর করা হয়। বিস্ফোরণের আগে প্রয়োজনীয় ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করা হয়। সব কার্যক্রম শেষে আতিয়া মহল পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং অপারেশন টোয়াইলাইট সমপ্তি ঘোষণা করা হয়।

এই পুরো অপারেশন পরিচালনায় পুলিশ, র‌্যাব, সোয়াত, ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসনসহ এলাকাবাসী যে সহায়তা করেছে তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। অপারেশন টোয়াইলাইট যে কোনও ক্রাইসিস মোকাবেলায় সামারিক ও বেসামরিক প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টা একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে সেনাবাহিনী বিশ্বাস করে, বলেও উল্লেখ করে সেনাবাহিনীর এই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল।
জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্টে আয়োজিত এই সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরের (আইএসপিআর) পরিচালক লে. কর্নেল রাশেদুল হাসান, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার গোলাম কিবরিয়া, র‌্যাব-৯ এর কমান্ডিং অফিসার (সিও) লে. জেনারেল আজাদ ও ফায়ার সার্ভিসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার (২৩ মার্চ) মধ্যরাতে আতিয়া মহলের নিচতলায় জঙ্গিদের অবস্থানের সংবাদ পেয়ে অভিযান শুরু করে পুলিশ। পরে সোয়াত ও সেনাবাহিনী অভিযানের দায়িত্ব নেয়। অভিযান চলাকালে দুই দফা বিস্ফোরণে দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ ছয়জন নিহত হন। আহত হয়েছেন র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধানসহ অন্তত ৫০ জন।


/জেইউ/এনএল/এমও/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
সীমান্তে কঠোর বিজিবি, ১০ পুশ-ইন চেষ্টা প্রতিহত
সীমান্তে কঠোর বিজিবি, ১০ পুশ-ইন চেষ্টা প্রতিহত
যুবদলের ১৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন
যুবদলের ১৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি: সবচেয়ে বেশি চাপে মধ্যবিত্ত
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি: সবচেয়ে বেশি চাপে মধ্যবিত্ত
দেশে ফিরেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান
দেশে ফিরেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম