‘ইফতেখারকে বাঁচাতে পাগলের মতো অক্সিজেন মাস্ক খুঁজছিলাম’

নুরুজ্জামান লাবু
২৫ আগস্ট ২০১৮, ২৩:৩৯আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০১৮, ১৯:১১

 

 ইফতেখার উল আলম আবীর ‘ওর রক্তচাপ স্বাভাবিক ছিল কিন্তু হৃদস্পন্দন কমে যাচ্ছিল দ্রুত। কর্তব্যরত চিকিৎসক ওকে একটি ইঞ্জেকশন দেয় এবং একটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র যুক্ত করে। আমাদের বলে আমরা যেন ওর সঙ্গে কথা চালিয়ে যাই এবং ওকে শ্বাস নিতে বলি। একটি সদর হাসপাতালে কোনও অক্সিজেন মাস্ক ছিল না। আইসিইউতে কোনও জায়গাও ছিল না। আমাদের বন্ধু শুভ্র পাশের ওষুধের দোকানগুলোতে মাস্ক খুঁজতে থাকে। কিন্তু কোথাও অক্সিজেন মাস্ক খুঁজে পাওয়া যায়নি। হাসপাতালও একটি মাস্ক দিতে পারেনি। অবশেষে নেবুলাইজারের মাস্ক খুলে অক্সিজেন মাস্কের পরিবর্তে ব্যবহার করা হলো। তখনও বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করে যাচ্ছিল ইফতেখার। এক ঘণ্টা দশ মিনিট লড়াই করার পর অচেতন হয়ে পড়ে ইফতেখার। ডাক্তার ইসিজি করে ওকে মৃত ঘোষণা করেন।’ এভাবেই হৃদয়বিদারক ঘটনার বর্ণনা করছিলেন কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে গোসল করতে নেমে ডুবে মারা যাওয়া শিক্ষার্থী ইফতেখার উল আলম আবীরের বন্ধু আব্দুল্লাহ মতিন খান।

১৬ আগস্ট চার বন্ধু একসঙ্গে গিয়েছিলেন কক্সবাজারে। একদিন পর, ১৮ আগস্ট সাগরে গোসল করতে নেমে ডুবে মারা যান ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইফতেখার উল আলম আবীর। ইফতেখারের সঙ্গে বখতিয়ার ও মতিনও ডুবে যেতে বসেছিল। ইফতেখারকে দ্রুত উদ্ধারের পর কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু একটি অক্সিজেন মাস্কের অভাবে এক ঘণ্টা দশ মিনিট পাঞ্জা লড়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি।

হৃদয়বিদারক সেই দিনের ঘটনার শুরুর বর্ণনা দিয়ে তিন বন্ধুর একজন আব্দুল্লাহ মতিন খান বলেন, ‘আমি, ইফতেখার, বখতিয়ার ও শুভ্র সকাল পৌনে ৭টার দিকে গোসলের উদ্দেশ্যে সৈকতে নামি। আমরা কোনও বিপদের আশঙ্কা করিনি। কারণ, সেখানে কোনও লাল পতাকা ছিল না। আমাদের কেউ কোনও সতর্কও করেনি। সকাল ৭টা ২০ থেকে ২৫ মিনিটে ঘটনাটি ঘটে। আমি আর বখতিয়ার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলাম। ইফতেখার আমাদের থেকে ৪-৫ ফুট দূরে। একটু আগেই ক্লান্ত হয়ে শুভ্র বিচের দিকে চলে যায়। ইফতেখার বুক সমান পানিতে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বসে ছিল। কিন্তু হঠাৎ ওর মুখের হাসি মিলিয়ে যায় এবং ভয়ের ছাপ পড়ে তাতে। আমি তখনই বুঝি কিছু একটা ঠিক নেই। ওর দিকে ছুটে যাই আমি এবং বলি আমার হাত ধরতে। ও আমার হাত ধরে। ইতোমধ্যে বখতিয়ারও আমার হাত ধরে। কিন্তু ঢেউয়ের ধাক্কা ছিল প্রচণ্ড এবং আমরা তিনজনই ডুবতে শুরু করি।’

তিন বন্ধুর সঙ্গে  ইফতেখার উল আলম আবীর

আব্দুল্লাহ আল মতিন বলেন, ‘আমরা দেখি যে আমাদের নিচ থেকে বালি সরে যাচ্ছে। আমরা গর্তের মতো একটি জায়গায় পড়ে যাই। আমাদের হাত পিছলে যায়। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই আমরা। সর্বশক্তি দিয়ে সাঁতরাতে চেষ্টা করে তীরে উঠে আসি আমি আর বখতিয়ার। শুভ্র আমাদের দিকে দৌড়ে আসে। আমাকে আর বখতিয়ারকে পানি থেকে টেনে তোলে সে। আমরা ইফতেখারকে খুঁজতে থাকি। ওর পিঠ দেখতে পাই। ওর হাত-পা, মুখ ছিল পানির নিচে। আমরা কেউই ওকে নড়তে দেখিনি। বখতিয়ার সাঁতরে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করতেই শুভ্র ওকে থামায়। কারণ এটা ছিল আমাদের যে কারোরই সাধ্যের বাইরে। আমরা লাইফগার্ডদের সাহায্য চাই।’

সিলেট ক্যাডেট কলেজের সাবেক চার বন্ধুর আরেক জন বখতিয়ার বলেন, ‘ঘটনাটি দেখে দু’জন লাইফগার্ড দৌড়ে আসেন। ইফতেখারকে আর দেখা যাচ্ছিল না। আমরা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ একজন খবর দেয় যে, তীরে একটি দেহ ভেসে এসেছে। আমরা দৌড়ে সেখানে যাই। লাইফগার্ড ও বখতিয়ার মিলে ইফতেখারকে তুলে নেয়। তখনও শ্বাস নিচ্ছিল ইফতেখার। আমরা তাকে একটু দূরে নিয়ে শুইয়ে দেই। আমাদের মনে হয়নি, সে পানি খেয়েছিল। তার পেট একটুও ফোলা ছিল না। তার নাকে রক্তফেনা জমছিল। লাইফগার্ডরা আমাদের বলেন, ওকে যথসম্ভব দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। আমরা দুই জন লাইফগার্ডসহ সকাল পৌনে ৮টায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পৌঁছাই।’

চোখের সামনে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর নির্মম মৃত্যু দেখার বর্ণনা করতে গিয়ে আব্দুল্লাহ আল মতিন বলেন, ‘আমরা ওকে জরুরি বিভাগে নিয়ে যাই। ডাক্তার এসে আমাদের বলেন, ওকে সাধারণ বিভাগে সরিয়ে নিতে। তখনও ইফতেখার শ্বাস নিচ্ছিল। ৭টা ৫০ মিনিটে ভর্তি করা হয় ওকে। আমরা ওকে সাধারণ বিভাগে নিয়ে আসি কিন্তু কোনও বিছানাই খালি ছিল না। মেঝেতে নোংরা একটি তোষকে ওকে শোয়ানো হয়। রুটিন চেক শুরু হয় ওর। ওর রক্তচাপ স্বাভাবিক কিন্তু হৃদস্পন্দন পড়ে যাচ্ছিল দ্রুত। কর্তব্যরত চিকিৎসক ও ইন্টার্ন ওকে গ্যাস্ট্রিকের একটি ইঞ্জেকশন দেন এবং হৃদস্পন্দন পড়ার জন্য একটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র যুক্ত করেন। আমাদের বলেন, আমরা যেন ওর সঙ্গে কথা চালিয়ে যাই এবং ওকে শ্বাস নিতে বলি। নাকে তখনও রক্তফেনার সৃষ্টি হচ্ছিল ওর। কিছুক্ষণ পরে তারা একটি অক্সিজেনের সিলিন্ডার নিয়ে আসেন কিন্তু তাতে কোনও অক্সিজেন মাস্ক ছিল না।’

আব্দুল্লাহ আল মতিন বলেন, ‘একটি সদর হাসপাতালে কোনও অক্সিজেন মাস্ক ছিল না আর আইসিইউতে কোনও জায়গাও ছিল না। আমি হোটেলে ছুটে যাই মোবাইলফোন ও টাকা আনার জন্য। আর শুভ্র নিকটস্থ ওষুধের দোকানগুলোতে মাস্ক খুঁজতে থাকে। কিন্তু ভাগ্য আমাদের সহায় ছিল না। কিছুক্ষণ পরে আমি মাস্ক খুঁজতে থাকি আর বখতিয়ার ও শুভ্র ইফতেখারের সঙ্গে কথা বলতে থাকে। ওর হাত আর পায়ের তালু ঘষতে থাকে। দুর্ভাগ্যবশত আমরা অক্সিজেন মাস্ক খুঁজে পাইনি। হাসপাতালও একটি মাস্ক দিতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়। অবশেষে নেবুলাইজারের খুলে অক্সিজেন মাস্কের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়। তখনও এত অল্প কিছু নিয়েই ইফতেখার লড়াই করে যাচ্ছিল। ওর স্পন্দন সর্বোচ্চ ৬৭-তে গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু খুব দ্রুতই আবার তা পড়ে যেতে থাকে। একঘণ্টা দশ মিনিট লড়াই করার পড় অচেতন হয়ে পড়ে ইফতেখার। ডাক্তার ইসিজি করে ওকে মৃত ঘোষণা করেন।’

ইফতেখারের বন্ধুরা বলছেন, ইফতেখারের মৃত্যু হয়তো একটি দুর্ঘটনা। কিন্তু যদি সৈকতে সতর্কতা সংকেত থাকতো, কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আন্তরিকতার অভাব ও অক্সিজেন মাস্কের মতো প্রায়োজনীয় যন্ত্রের অভাব না থাকতো, তাহলে হয়তো ইফতেখারকে বাঁচানো যেতো। ইফতেখারের মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হয়েছে ডুবে মরা।

চার বোনের সঙ্গে  ইফতেখার উল আলম আবীর

ইফতেখারের বোন তামিমা সুলতানা বলেন, ‘ইফতেখার ক্লাস ফোর পর্যন্ত শাহীন একাডেমি স্কুলে পড়েছিল, পঞ্চম শ্রেণি পড়েছে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে। ষষ্ট শ্রেণিতে মতিঝিল আইডিয়ালে চান্স পায়। সপ্তম শ্রেণিতে চান্স পেয়ে ভর্তি হয় সিলেট ক্যাডেট কলেজে। ইফতেখার ক্লাসে কখনও দ্বিতীয় হয়নি। নিজের ইচ্ছেতেই ভর্তি হয়েছিল ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফুটবল খেলতে ভালোবাসতো। ইচ্ছে ছিল জিআরই দেবে, ফুল ব্রাইট স্কলারশিপের জন্য ট্রাই করবে। পিএইচডি করবে। গবেষণায় থাকতে চেয়েছিল। কথা বলতো কম, যতটা বলতো, ওর বুদ্ধিদীপ্ত চাহনি আর দৃঢ় উচ্চারণে ওর স্বপ্নের কথা শুনতে খুব ভালো লাগতো।’

তামিমা সুলতানা বলেন, ‘আমার ভাই তার বন্ধুকে প্রমিস করায় ব্যারিস্টারি পড়া শেষ করে দেশে ফিরে আসতে। সে শুধু টেলিটক সিম ব্যবহার করতো। কারণ, এটি একমাত্র দেশি সিম। সে কোনও দিন কোনও কিছুই চায়নি আমাদের কাছে। আমার ভাই তার দেশপ্রেম, তার সত্যবাদিতা, তার মেধা, তার পরিশ্রম, সবকিছু মিলিয়ে সে তার দেশ ও সমাজকে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আর তাকেই কিনা অক্সিজেন মাস্কের অভাবে জীবন দিতে হলো? এজন্য আমি কাউকে দোষ দেই না। মাত্র ২৫ বছর বয়সী আমার একমাত্র ভাইকে হারিয়েছি বলে শোকাহত নই, আমি শোকাহত এই দুর্ভাগা দেশের জন্য, যে দেশ আমার ভাইকে হারিয়েছে।’

এদিকে চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে স্বজনরা জানান, ইফতেখারের ফুসফুস ভরা বালি ছিল। এ কারণে তার দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। একপর্যায়ে হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

স্বজনরা জানান, ইফতেখাররা চার বোন এক ভাই। তাদের বাবার নাম মো. ইউনূস। ইফতেখার ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বিবিএ শেষ সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাদের গ্রামের বাড়ি ফেনী শহরের শাহীন একাডেমি সড়কে। ঘটনার পরদিন ১৯ আগস্ট পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

/এমএনএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
বিশ্বতারকাদের সঙ্গে ফিফা অ্যালবামে সানজয়, নোরা ফাতেহি-ভেজড্রিমের সঙ্গে ‘সির সির’
বিশ্বতারকাদের সঙ্গে ফিফা অ্যালবামে সানজয়, নোরা ফাতেহি-ভেজড্রিমের সঙ্গে ‘সির সির’
সৌদি থেকে ফিরেছেন ২৫৩৭৭ হাজি, মৃত্যু বেড়ে ৪৫
সৌদি থেকে ফিরেছেন ২৫৩৭৭ হাজি, মৃত্যু বেড়ে ৪৫
পশ্চিমবঙ্গে যেকারণে তৃণমূলের ‘অপ্রত্যাশিত রক্ষাকর্তা’ খোদ বিজেপি
কী, কেন, কীভাবেপশ্চিমবঙ্গে যেকারণে তৃণমূলের ‘অপ্রত্যাশিত রক্ষাকর্তা’ খোদ বিজেপি
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম