ভিয়েতনামে শত শত মানুষ পাচারের সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশি দালাল মাসুদ রানার বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্টন থানায় মামলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টম্বর) পল্টন থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ আইনে এই মামলাটি করেন ভিয়েতনামে পাচার হওয়ার পর দেশে ফিরে আসা শরীয়তপুরের এক ভুক্তোভোগী। তার নাম আলমগীর হাসান। জানা গেছে, এ মামলা তদন্ত করবে সিআইডি।
সিআইডির সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার জিসান আহমেদ বাংলা টিবিউনকে মামলা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এবং প্রতারণার শিকার হয়ে ফিরে আসা ভুক্তভোগীরা জানান, ভিয়েতনামে মানবপাচারের মূলহোতা হলো মোস্তফা। সে ভিয়েতনামেই থাকে। তার দেশের বাড়ি চাঁদপুর জেলায়। তার ভাই মাসুদ রানা দালালের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিদেশে গমনেচ্ছু মানুষদের ঢাকায় নিয়ে আসে। ভালো বেতনের কথা বলে বেকার যুবকদের টার্গেট করে তাদের ভিয়েতনামে পাচার করা হয়। জনপ্রতি তিন লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকে এই চক্রটি।
ভুক্তভোগী আলমগীর হাসান বাংলাদেশে থাকা প্রধান পাচারকারী মাসুদ রানাসসহ দুজনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করেছেন। এছাড়াও মামলায় অপর নামীয় আসামি হলো মতিয়ার রহমান (৫০)।
রাজধানীর পুরানা পল্টনের নুরজাহান শরীফ প্লাজার পঞ্চম তলায় এমআরটি ইন্টারন্যাশনাল (আরএল নাম্বার ৩১৯) নামে একটি রিক্রুটিং এজেন্সি রয়েছে। এই এজেন্সিটি মূলত পাচারের সঙ্গে জড়িত।
আলমগীর হাসান মামলায় অভিযোগ করেন, এক ব্যক্তি তাকে মাসুদ রানারর কাছে নিয়ে আসে। মাসুদ রানা ভালো বেতনে ভিয়েতনামে তাকে ইলেকট্রিক কাজে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। তিনি জানান, ভিয়েতনাম যেতে হলে তাকে (মাসুদ রানাকে) চার লাখ টাকা দিতে হবে। প্রতিমাসে আলমগীরকে ৩৫ হাজার টাকা বেতন দেওয়ার কথা বলা হয়।এরপর তাকে ভিয়েতনামে পাঠানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়।
মামলার অভিযোগে আলমগীর উল্লেখ করেন— ২০১৯ সালের অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে পল্টনের অফিসে গিয়ে মাসুদ রানাকে নগদ ৫০ হাজার করে তারা দুজনে মোট এক লাখ টাকা দেন। কিছুদিন পর মাসুদ তাদেরকে ফোন করে জানায় যে, তাদের ভিসা হয়েছে। টাকা নিয়ে ঢাকায় যেতে বলে। মাসুদ রানার কথা শুনে তারা ঢাকায় পল্টনের অফিসে যান। ২০১৯ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দুজনে ফের আড়াই লাখ করে মোট পাঁচ লাখ টাকা দেন। টাকা দেওয়ার পর ফিঙ্গার প্রিন্ট করানোর জন্য তাদেরকে জনশক্তি কর্মসংস্থান অফিসে নিয়ে যায় দালালরা। এরপর চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে মাসুদ রানা তাদের ফোন করে জানায়, ভিয়েতনাম যাওয়ার ফ্লাইট ৯ ফেব্রুয়ারি। এরপর ৯ ফেব্রুয়ারি তারা ঢাকায় মাসুদ রানার অফিসে আসেন। দুজনে একলাখ করে আবারও মোট দুই লাখ টাকা দেন।
৯ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় কলকাতা হয়ে ভিয়েতনামের উদ্দেশে রওনা করেন তারা। ভিয়েতনামে বিমানবন্দরে পৌঁছার পর জব্বার নামে এক লোক তাদের দুই জনকে রিসিভ করে। জব্বার ভিয়েতনামে দালাল মোস্তফার হয়ে কাজ করে।
আলমগীর হাসান ভিয়েতনাম পৌঁছার পর জানতে পারেন যে, ৯০ দিন মেয়াদের ভিসায় তাদের ভিয়েতনামে পাঠানো হয়েছে। ইলেকট্রিকাল কাজ দেওয়ার কথা থাকলেও তাদের দিয়ে বিভিন্ন ধরনের কাজ করায় পাচারকারীরা। এমনকি কাজ করালেও তাদের কোনও বেতন দেওয়া হয়নি। বেতন ও ভিসার আকামা করে দিতে বললে পাচারকারীরা তাদের গালিগালাজ ও মারধর করতো। বিষয়টি ভিয়েতনামের বাংলাদেশ দূতাবাসকে জানালে বিশেষ ফ্লাইটে গত ১৮ আগস্ট তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
দেশে ফিরে এসে উত্তরার দিয়াবাড়িতে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিন শেষ করে আলমগীর হাসান এখন শরীয়তপুরে তার গ্রামের বাড়িতে রয়েছেন।
গত জানুয়ারি থেকে আলমগীর হাসানের মতো এরকম প্রায় ১২০০ যুবককে ভিয়েতনামে পাচার করেছে মোস্তফা। আলমগীর জানান, মোস্তফা ভিয়েতনামে বিয়ে সাদি করে স্থায়ীভাবে বসবাস করে । সে তার ভিয়েতনামী শ্বশুর ও শ্যালকদের নিয়ে সেদেশে মানবপাচারের একটি চক্র তৈরি করেছে। আর বাংলাদেশে মোস্তফার পাচার কাজের প্রধান হোতা হলো তার ভাই মাসুদ রানা।
ভিয়েতনামে পাচার হওয়ার পর বেকার এসব মানুষ বুঝতে পারেন যে, তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। পরবর্তীতে দূতাবাসে গিয়ে তারা অভিযোগ করেন। অনেকে দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভও করেছেন। সরকার অন্তত ১২০ জনকে গত ১৮ আগস্ট বিশেষ ফ্লাইটে করে দেশে ফিরিয়ে আনে। তাদের সবাইকে এরপর উত্তরার দিয়াবাড়িতে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়। গত মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) এদের মধ্যে ভিয়েতনাম থেকে আসা ৮১ জন ও কাতারফেরত ২ জন— মোট ৮৩ জনকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। তার আগে এ বিষয়ে তুরাগ থানায় একটি জিডি করা হয়েছে।
ডিএমপির উত্তরা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার নাবিদ কামাল শৈবাল জানান, গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টির তদন্ত চলছে।
তবে ভিয়েতনামফেরত এই প্রবাসীদের অভিযোগ— ভিয়েতনামে বাংলাদেশ দূতাবাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও বিক্ষোভ করায় তাদের অনেককে জেলে দেওয়া হয়েছে।






